সৌদি আরবে বাংলাদেশি সৈন্য মোতায়েনের চুক্তি হয়নি: পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি ও প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশের সৈন্য মোতায়েনসংক্রান্ত কোনো চু্ক্তি হয়নি। দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষাবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এই স্মারকে তৃতীয় কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পদক্ষেপ না নেয়ার দৃঢ় প্রত্যয় রয়েছে।
গতকাল (রোববার) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।
এর আগে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তির বিরোধিতা করে সংসদে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাতীয় পার্টির সদস্য ফখরুল ইমাম। তাঁরা এ এই চুক্তি স্বাক্ষরকে বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন বলে দাবি করেন।
এ প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে মোমেন গতকাল সংসদে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বন্ধুরাষ্ট্র। ধর্মীয় অনুভূতির কারণে বাংলাদেশের জনগণের কাছে সৌদি আরবের গুরুত্ব অত্যধিক। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সৌদি আরবের এক সহযোগী বন্ধু। ছাড়া পবিত্র মক্কা, মদিনার ওপর কোনো ধরনের হুমকি মোকাবিলায় সৌদি আরবের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সহযোগিতার হাত বাড়াতে বাংলাদেশ অঙ্গীকারাবদ্ধ।
সংসদ সদস্যদের আশ্বস্ত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ সৌদি আরবে সৈন্য মোতায়েনসংক্রান্ত কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। বরং বাংলাদেশ-সৌদি আরবের মধ্যে প্রতিরক্ষাবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। যার মাধ্যমে দুই দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী সামরিক প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন, শিক্ষা, সামরিক তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা শিল্প সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ, পরিদর্শন, দক্ষতা বিনিময়, সামরিক চিকিৎসা ও গবেষণা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, বিনোদন, প্রযুক্তিবিষয়ক আলোচনা, সামরিক সদস্যদের পারস্পরিক বিনিময়, সামরিক সুরক্ষা ও জলদস্যুতা প্রতিরোধ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে।’
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে। সৌদি আরবের রিয়াদস্থ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে এই সমঝোতা স্মারক সই হয়। বাংলাদেশের পক্ষে এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপ্যাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল মো. মাহফুজুর রহমান এবং সৌদি আরবের পক্ষে স্বাক্ষর করেন সেদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি চীফ অব স্টাফ লে. জেনারেল মুতলাক বিন সালিম আল উজাইমিয়া। এ সময় সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ উপস্থিত ছিলেন।
এ সমঝোতার আওতায় সৌদি আরব ও বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারবে।
এ আগে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ রিয়াদ সফরে গিয়ে সৌদি যৌথ বাহিনীর প্রধান ফায়াদ আল রুয়ায়লি এবং সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আল-আয়েশের সাথে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জানান, সৌদি ইয়েমেন সীমান্তের যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় মাইন অপসারণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণের লক্ষ্যে আলোচনা হয়েছে। যাতে একটি সমঝোতা চুক্তি তৈরি করা হয়েছে। সমঝোতা চুক্তি সই হলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুটি ব্যাটালিয়নে প্রায় ১৮০০ সেনা সদস্য মাইন অপসারণ কাজে নিয়োজিত হবে।
রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের বরাত দিয়ে এ খবরটি গণমাধ্যমে প্রচারিত হবার পরপরই, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও বিরোধী দলের সদস্য ফখরুল ইমাম সৌদির সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত বাংলাদেশ জাসদের কার্যকরী সভাপতি মইন উদ্দীন খান বাদলও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সংসদে আলোচনার জন্য নোটিশ চেয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির বিরোধিতা করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতিসংঘের অধীনে ছাড়া অন্য কোথাও কোনো বিরোধে জড়ানো যাবে না।
‘ইয়েমেনের পক্ষে না দাঁড়িয়ে সৌদি আরবের পক্ষে দাঁড়ানো দূর্ভাগ্যজনক’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা রেডিও তেহরানকে বলেন, সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমরা আমাদের সেনাবাহিনীকে দেশের বাইরে কোন সামরিক সংঘাতের সাথে জড়িত করতে পারি না।
তিনি আরো বলেন, সৌদি আরব প্রতিবেশী মুসলিম দেশ ইয়েমেনের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। সেখানে আমরা নির্যাতিত ইয়েমেনের পক্ষে না দাঁড়িয়ে অপরাধী সৌদি আরবের পক্ষে দাঁড়িয়েছি- এটা দূর্ভাগ্যজনক।
এর আগে, ফজলে হোসেন বাদশা সংবাদপত্রে লিখিত এক প্রবন্ধে বলেছেন, “বিশ্বরাজনীতিতে সৌদি আরব সব সময়ই পশ্চিমাদের স্বার্থরক্ষায় ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের আড়ালে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের যত রকমের চেষ্টা, সব ক’টিতে সৌদিদের ভূমিকা টের পাওয়া যায়। তাদের নতুন বাদশাহি নিয়ে কিছুদিন নানা রকম উচ্ছ্বাস থাকলেও সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যার ঘটনা বুঝিয়ে দিয়েছে যে, সৌদি আরব তাদের কৌশলগত অবস্থান থেকে এতটুকু নড়েনি।”
সৌদি আরবের সঙ্গে এই সমঝোতা চুক্তি হয়তো চটজলদি আমাদের জন্য ক্ষতির কারণ হবে না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা কি খুব বেশি লাভ বয়ে আনবে– এমন প্রশ্নই করেছেন ফজলে হোসেন বাদশা। #
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/১১