একদিকে চাকরির অনিশ্চয়তা অন্যদিকে করোনার ঝুঁকি: উভয়সংকটে পোশাক শ্রমিকরা
করোনার ঝুঁকি আর চাকুরি ও বেতনের অনিশ্চয়তার মাঝে উভয় সংকটে পড়েছে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত লাখ লাখ শ্রমিক।
সরকারের 'সবুজ সংকেত' পেয়ে বেশিরভাগ কারখানা উৎপাদন শুরু করলেও যথাযথ স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার পরিবেশ তৈরি করা হয়নি বেশিরভাগ কারখানায়।
অপরদিকে কারখানা লে-অফ ঘোষণা, শ্রমিক ছাঁটাই এবং বেতন না পাবার হতাশা থেকে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল। আজকেও (শনিবার) গাজীপুর এবং আশুলিয়ার অন্তত: তিনটি কারখানায় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এদিকে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আজ সকালে এক ভিডিও ব্রিফিংয়ে আশা প্রকাশ করছেন, পোশাকশিল্পের মালিকরা শ্রমিকদের পাশে থাকবে। করোনা সংকটকে একটি বৈশ্বিক সংকট উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘পোশাকশিল্পের মালিকদের পাশে সরকার রয়েছে। মালিকরা আশা করি, শ্রমিকদের পাশে থাকবে।
এর আগে সরকারের শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সাথে বৈঠক করে আশ্বাস দিয়েছিলেন, আসন্ন ঈদ-উল ফিতরের আগে কোন কারখানা লে-অফ করা যাবেনা বা শ্রমিক ছাটাই করা যাবে না। তাছাড়া, করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউনের কারনে যে সব শ্রমিক এপ্রিল মাসে কাজ করতে পারে নি তাদেরকে মোট বেতন-ভাতার ৬০ ভাগ পরিশোধ করা হবে।
তবে অনেক কারখানা মালিকই সরকারের এসব আশ্বাস কান দিচ্ছে না। এমনটিই অভিযোগ করছেন শ্রমিক নেতারা।
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতি কাজী রুহুল আমিন রেডিও তেহরানকে জানান, আজ সকাল থেকে তার তাদের উত্তরা অফিস ছয় সাতটি কারখানার শ্রমিকরা জড়ো হয়েছেন, তাদের মার্চ মাসের বেতন দেয়া হয়নি। এরকম অবস্থায় বেতন ছাড়া শ্রমিককে না খেয়ে মরতে হবে অথবা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে আন্দোললন করতে হবে। একদিকে ক্ষুধার ঝুঁকি অপর দিকে করোনার।
কাজী রুহুল আমিন জানান, শ্রমঘন এ শিল্পে কারখারার সংকীর্ণ গেট দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে একসাথে গা ঘিষে প্রবেশ ও বাহির হওয়া, হুড়োহুড়ি করে একটি মেসিনে হাজিরার ফিংগারপ্রিন্ট দেয়া এবং কর্মক্ষেত্র একজনের কাছ থেকে অন্যজনের কাছে কাপড়, সুতা, কাঁচি- এসব হস্তান্তরের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
যেসব কারখানা শ্রমিকের বেতন পরিশোধ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা পরামর্শ কার্যকর করতে ব্যর্থ হচ্ছে সেসব কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করছেন এ শ্রমিক নেতা।
এ প্রসঙ্গে সরকার সমর্থক বাংলাদেশ জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক-কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি রেডিও তেহরানকে বলেন, সরকার, কারখানা মালিক ও শ্রমিক নেতাদের মধ্যকার তৃপক্ষীয় বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত কার্যকর করছে না মালিক পক্ষ। শতাধিক কারখানা শ্রমিকদের মার্চ মাসের বেতনও পরিশোধ করে নি। তাছাড়া বেশীরভাগ কারখানায় পর্যাপ্ত সুরক্ষা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কাজের পরিবেশও তৈইর করা হয় নি।
ওদিকে আন্তর্জাতিক ইংরেজি ম্যাগাজিন ইকোনমিস্টে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক কারণেই বাংলাদেশ তার পোশাক কারখানা বন্ধ রাখতে পারে না। আবার খোলা রাখাও এক ভয়াবহ ব্যাপার বলে মনে হয়।
বাংলাদেশে গার্মেন্ট কারখানায় কাজ করেন প্রায় ৪১ লাখ শ্রমিক। তারা গাদাগাদি, ঠাসাঠাসি করে যেমন বসবাস করেন, কারখানায়ও তাদের সেই একই পরিস্থিতি। কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার জন্য এসব পরিবেশ বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
ইকোনোমিস্ট উল্লেখ করেছে এই গার্মেন্ট কারখানা হলো বর্তমানে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল। এখন কাজ না থাকায় এবং ক্ষুধায় আক্রান্ত হাজার হাজার শ্রমিক পুলিশের লাঠিচার্জকে উপেক্ষা করে তাদের বকেয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করছেন।
পোশাক কারখানাগুলো যাতে শ্রমিকদের মজুরি দিতে পারে এ জন্য সরকার কম সূদে সুদে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি প্রণোদনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ওই অর্থ পাওয়ার জন্য এখনও অপেক্ষায় রয়েছে মালিকরা।
করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্বে পোশাকের চাহিদা কমে গেছে। তবু অনেক কারখানা মালিক মনে করছেন, তাদের পক্ষে কারখানা আর বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। এরই মধ্যে প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে। অনেক কারখানা অর্ডার বাতিল হওয়ার কারণে আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে।
গত বছর তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প দেশে এনেছে ৩৪০০ কোটি ডলার, যা জাতীয় প্রবৃদ্ধির ১৩ শতাংশ। কয়েক দশকে দেশের প্রবৃদ্ধিতে এই খাতটি ঊল্লেখযোগ্য অবদান রেখে যাচ্ছে।
এদিকে, শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গাইডলাইন্স ইস্যু করেছে বিজিএমইএ। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে ফ্যাক্টরিতে ঢোকার সময় হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, ব্লিচিং মিশ্রিত পানিতে জুতা ভিজিয়ে প্রবেশ করা, থার্মাল স্ক্যান দিয়ে তাপমাত্রা চেক করা, মাস্ক ব্যবহার করা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কর্ম পরিচালনা করতে বলা হয়েছে সকল মালিকদের।’
এসব পরামর্শ মানা হচ্ছে কী না তা দেখার জন্য বিজিএমইএ’র ছয়টি পরিদর্শক দল।
এরই মধ্যে গত চারদিনে পরিদর্শক টিম ১৪৭টি কারখানা পরিদর্শন করে ১৪৪টি কারখানার স্বাস্থ্য সুরক্ষা পরিস্থিতি সন্তোষজনক বলে জানিয়েছে। বাকি তিনটি কারখানার সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি প্রয়োজন বলে মতামত দিয়ে সংশোধনমূলক পরিকল্পনা নিয়ে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করার পরামর্শ দিয়েছে টিম। তা না করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে পরিদর্শক টিম।
এ বিষয়ে সংগঠনটির সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আমরা মালিকদের নির্দেশনা দিয়েছি যাতে তারা স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে পরিপালন করেন। জীবন-জীবিকার সন্ধানে আমাদের নামতে হবে। করোনাভাইরাসের কারণে স্থবির হয়ে যাওয়া অর্থনীতির চাকা আবারও সচল করতে হবে। এমনই অবস্থার প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে গত সপ্তাহ থেকে কারখানাগুলো খুলে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/আবদুর রহমান খান/২
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।