কোভিড-১৯: বাংলাদেশে ২৪ ঘণ্টায় ৭ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ৭০৯, সুস্থ ১৯১
-
অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা
বাংলাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়েছেন ৭০৯ জন। এ নিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ১৩ হাজার ১৩৪ জনে। এছাড়া, গত একদিনে মারা গেছেন ৭ জন, ফলে এ পর্যন্ত মোট ২০৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
আজ (শুক্রবার) দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত অনলাইন স্বাস্থ্য বুলেটিনে এসব তথ্য জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা। তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় যে সাত জন মারা গেছেন তাদের মধ্যে পাঁচ জন পুরুষ, দু’জন নারী। তাদের মধ্যে ৫১ থেকে ৬০, ৬১ থেকে ৭০ ও ৭১ থেকে ৮০ বছর বয়সী রয়েছেন দু’জন করে। আরেকজনের বয়স ৯০-এর বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আরও জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৯১ জন সুস্থ হয়েছেন। ফলে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছেন মোট ২,১০১ জন।
ডা. নাসিমা সুলতানা আরও জানান, সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৫ হাজার ৯৪১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। নমুনা পরীক্ষায় ৭০৯টি নমুনায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। আগের দিনের চেয়ে এই সংখ্যা তিনটি বেশি। এ নিয়ে মোট ১৩ হাজার ১৩৪ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলেন।
নমুনা পরীক্ষায় গড়মিল
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে ঝিনাইদহের শৈলকুপা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসকসহ নয় স্বাস্থ্য কর্মীর করোনাভাইরাস শনাক্ত হলেও ঢাকা পাঠানো নমুনাতে করোনা নেগেটিভ হয়েছে।
আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাশেদ আল মামুন। তিনি জানান, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে করোনা পরীক্ষায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তারসহ নয় স্বাস্থ্য কর্মীর করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। নিশ্চিত হওয়ার জন্য পুনরায় পরীক্ষার জন্য গত মাসের ২৭ তারিখে ঢাকা আইইডিসিআরে নমুনা পাঠালে ১১ দিন পর আজ শুক্রবার তার ফলাফল পাওয়া যায়। এতে দেখা যায় নয়জনের মধ্যে সাতজনের করোনা নেগেটিভ। বাকী দুইজনের রিপোর্ট এখনো আসেনি বলে তিনি জানান।
সাভারে পোশাক শ্রমিকদের নমুনা সংগ্রহ বন্ধ
পোশাক কারখানা অধ্যুষিত সাভারে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ অবস্থায় তৈরি পোশাক শ্রমিকদের নতুন করে নমুনা সংগ্রহ না করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ।
করোনাভাইরাসের উপসর্গে আক্রান্ত পোশাক শ্রমিকদের অনেকে আজ শুক্রবার সকালে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাজির হলে তাদের জানানো হয়েছে, এখন থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আর নমুনা সংগ্রহ করবে না। এ সময় ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, যারা নিজেদের পেশা গোপন করেছেন তাদের নমুনা ঠিকই নেওয়া হয়েছে। আর যারা নিজেদের সঠিক পেশার পরিচয় দিয়েছেন তাদের নমুনা না নিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষেয় সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ সায়েমুল গণমাধ্যমকে জানান, ‘হাজার হাজার তৈরি পোশাক শ্রমিকের নমুনা সংগ্রহের মতো সক্ষমতা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নেই।’
তিনি বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সাভার শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন পোশাক কারখানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সেখান সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে- যাদের মধ্যে কোনো করোনার উপসর্গ নেই, তাদের নমুনা সংগ্রহ করা হবে না। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, পোশাক শ্রমিকদের নমুনা স্ব-স্ব কারখানা কর্তৃপক্ষ বিজিএমইএ বা বিকেএমইএ’র সঙ্গে সমন্বয় করে নিজস্ব বুথ থেকে নমুনা সংগ্রহ করবে। প্রয়োজনে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করবে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।’
তবে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে করোনা শনাক্তকরণ কার্যক্র কবে চালু হবে সে বিষয়েও এখনো কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এর মধ্যে নমুনা পরীক্ষার বাইরে থাকা সন্দেহভাজন তৈরি পোশাক শ্রমিকরা তৈরি পোশাক কারখানায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রসঙ্গত, সাভার শিল্পাঞ্চলে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে সংক্রমণের মাত্রা বাড়তে থাকায় দ্রুত সময়ের মধ্যে সব তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধের পরামর্শ দিয়েছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। উপজেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ সায়েমুল হুদা স্বাক্ষরিত ওই চিঠি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে পাঠানো হলেও তাতে সাড়া মেলেনি।
নমুনা সংগ্রহ করবে ব্রাকের ৬০০ বুথ
করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহের পরিসর বাড়াতে সারাদেশে ৬০০ বুথ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। এসব বুথে সম্ভাব্য সংক্রমিত রোগীর শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাগারে পাঠানো হবে। একটা নমুনা সংগ্রহ করতে পাঁচ থেকে ছয় মিনিট সময় লাগবে।
ব্র্যাকের পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য কর্মসূচীর সহযোগী পরিচালক মোর্শেদা চৌধুরী গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে এই কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন করছে ডিএফআইডি।
মোর্শেদা চৌধুরী বলেন, প্রাথমিকভাবে ১০০ বুথ তৈরি করা হবে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বেশি সংক্রমিত ১৯টি এলাকায়। এর মধ্যে ৪৫টি বুথ স্থাপন করা হচ্ছে ঢাকায়। ঢাকার দুই মেয়রের অনুমতি সাপেক্ষে বুথ স্থাপনের স্থান নির্বাচন করা হবে।
তিনি জানান বলেন, ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল এবং নারায়ণগঞ্জে কয়েকটি বুথ বসানো হয়েছে। নমুনা সংগ্রহের এসব বুথ স্থাপন করা হবে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে। কিছু হবে এলাকাভিত্তিক। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়েও কিছু বুথ বসানো হবে।
মোর্শেদা চৌধুরী জানান, তাদের নমুনা সংগ্রহ বুথ চালু হলে হাসপাতালের চাপটা কমে যাবে। নমুনা সংগ্রহ করতে হলে প্রশিক্ষিত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন। এজন্য তারা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বাছাই করে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
পুলিশের জন্য আলাদা করোনা হাসপাতাল
বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় তাদের চিকিৎসার জন্য আলাদা একটি হাসপাতাল নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আগামীকাল (শনিবার) থেকে তেজগাঁও এলাকা অবস্থিত বেসরকারি ইমপালস হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসা দেওয়া হবে।
কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের পরিচালক ডিআইজি হাসানুল হায়দার বলেছেন, ‘ইমপালস হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা শুরু হলে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে চাপ কমবে।’
দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩০০ পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৯৩ জন। আর মারা গেছেন ছয়জন।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা মহানগরীতেই ৬৬৬ জন পুলিশ সদস্যের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের বেশিরভাগই ঢাকার রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অনেককে আবাসিক হেআটেলে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এর বাইরে রাজশাহীর বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালেও আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পুলিশ সদস্যদের আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় ২৫০ শয্যার কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া জটিল হয়ে পড়ছিল। এ অবস্থায় হাসপাতালে জায়গা না হওয়ায় হোটেলসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের কোয়ারেন্টিনে রাখতে হচ্ছে।’
চুক্তিবদ্ধ ইমপালস হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক খাদিজা আকতার ঝুমা জানান, তারা দুই মাসের জন্য পুলিশের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতালের নিয়মিত রোগীদের অন্যত্র স্থানান্তর করে শুধু করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য হাসপাতালটি প্রস্তুত করা হয়েছে। চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে ডাক্তার ও নার্স থাকবে ইমপালস হাসপাতালের। আর পিপিইসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে পুলিশের পক্ষ থেকে।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/আবদুর রহমান খান/৮
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।