উদ্বিগ্ন ওবায়দুল কাদের
করোনা মোকাবিলায় সামর্থ্যের ঘাটতির কথা স্বীকার করল আওয়ামী লীগ
বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ আজ বলেছেন, ব্যাপক উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠার মধ্যেই দেশের সব প্রান্তে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। করোনাভাইরাসের প্রকোপ যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাও ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকাশ পেয়েছে আমাদের সামর্থ্যের ঘাটতি এবং সমন্বয়ের অভাব।
আজ (সোমবার) দুপুরে প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় সরকারি দলের এই গুরুত্বপূর্ণ নেতার স্বীকারোক্তিতে ফুটে উঠেছে সরকারের এমন অসহায় অবস্থা।
করোনা মোকাবেলার ব্যাপারে সরকারের ‘সামর্থ্যের ঘাটতি এবং সমন্বয়ের অভাব’ প্রসঙ্গে সরকারি দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার স্বীকারোক্তি প্রকাশ পেয়েছে এমন দিনে যেদিন করোনা শনাক্ত রোগীর সংখ্যা সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টি করে একলাফে চার অংকে পৌঁছে গেছে: যেদিন সরকারি হিসেবে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৬৯১ এবং মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩৯ জনে।
করোনা যুদ্ধে সম্মুখ সারির যোদ্ধা চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের মধ্যে আজ সকাল ১১ টা পর্যন্ত ১,১২৮ জন সংক্রমিত হয়েছে। ইতোমধ্যে মারা গেছেন দু’জন চিকিৎসক।
করোনা যোদ্ধাদের আর একট দল পুলিশের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১৬২ জন আক্রান্ত হয়েছেন। সব মিলিয়ে পুলিশে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৭৫৬ জনে। কোয়ারেন্টাইনে নেয়া হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার পুলিশ সদস্য। করোনাযুদ্ধে এ পর্যন্ত মারা গেছেন সাতজন পুলিশ সদস্য।
করোনা উপসর্গ নিয়ে বা উপসর্গ ছাড়া কারা কোথায় বেঘোরে মারা পড়ছে বা কতজন এ সময় সেবা না পেয়ে অন্য রোগে মারা যাচ্ছে তার খবর ক’টাই বা সংবাদ মাধ্যমে আসে?
বাংলাদেশের অপ্রতুল স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে ডক্টর’স ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট-এর সাধারণ সম্পাদক ড. কাজী রকিবুল ইসলাম রেডিও তেহরানকে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো গড় হিসেবে জনসংখ্যার অনুপাতে যে পরিমান হাসপাতাল বেড, চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য সেবাকর্মী প্রয়োজন তা আমাদের নেই। যার ফলে হঠাৎ সৃষ্ট একটি মহামারী পরিস্থিতি কার্যকরভাবে সামাল দিতে পারছি না।
দুদিন আগে (৯ মে) কিডনির জটিলতায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে মারা যান খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব গৌতম আইচ সরকার। তার মেয়ে ডা. সুস্মিতা আইচ সরকারি ‘টেলিসেবা ৩৩৩’র একজন চিকিৎসক। বাবার মৃত্যুর দিনই তিনি অভিযোগ করেন, সুচিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন গৌতম আইচ সরকার। তাকে নিয়ে একের পর এক হাসপাতাল ঘুরেও কোনো সহায়তা পাননি।
এ ঘটনাটি সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুরবস্থা। ঘটনাটি নানা মাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করার প্রেক্ষিতে গতকাল ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ প্রধান ডাক্তার শাহজাদ হোসেন মাসুম।
তিনি লিখেছেন, “প্রতিটি মৃত্যুই চিকিৎসকের পরাজয়, একটি পারিবারিক, মানবিক বিপর্যয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে বর্তমান সময়ে গভীরভাবে বিপর্যস্ত। আমার কাছে মনে হয় চলমান এই বিপর্যয়কে ঠেকানোর জন্য আমাদের একটা জিনিসেরই প্রয়োজন ছিল, একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা; যা তৈরির দায়িত্ব ডাক্তারদের হাতে কখনোই ছিল না। এই বিষয়ে আর কিছু বলব না।”
তিনি আরো লিখেছেন, “জেনে রাখুন কোভিড হাসপাতালগুলো লড়াইয়ের শেষ সীমায় আছে। আমাদের চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়রা নিজেদের ইনফেক্টেড হওয়া থামাতে পারছেন না। প্রতিটা হাসপাতাল রোগীর ভারের শেষ সীমায়। গতকালের নতুন ইনফেকশানের সংখ্যা দেখেছেন। আপনারাই বলেন এই সংখ্যাটা শুধু একটা ফ্র্যাকশান। এরপর আর গালিতে হবে না। লাঠি নিয়ে এসে ডাক্তার-নার্স পিটিয়ে যাবেন। তবু যদি আর দশ দিন পর হাসপাতালগুলো আপনাদের চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতায় থাকে।“
একটি কোভিড-১৯ হাসপাতালের চিত্র
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অবস্থার একটি চিত্র ফুটে উঠেছে দেশের প্রধান সরকারি হাপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজে এ মাসে স্থাপিত নতুন কোভিড-১৯ হাসপাতাল ব্যবস্থানার মধ্য দিয়ে।
গত ২ মে থেকে চানখাঁরপুলে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের নতুন ভবনে কোভিড-১৯ হাসপাতালে রোগী ভর্তি শুরু হয়। প্রথম দিনেই মারা যায় একজন। এর পর গতকাল ১০ মে রাত ১১টা পর্যন্ত নতুন মারা গেছে ৯১ জন। এর মধ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিল ৭ জন। বাকিরা সাসপেক্টেড। বর্তমানে হাসপাতালে রোগী ভর্তি আছে ১৯৫ জন। এর মধ্যে আইসিউতে আছে ১০ জন। গত ২ মে থেকে ১০ মে পর্যন্ত রোগী ভর্তি হয়েছিল প্রায় ৬০০ জন। অনেকেই চিকিৎসা নিয়ে বাসায় গেছেন। আবার অনেকেই হাসপাতালের কাউকে কিছু না বলে পালিয়ে গেছে।
করোনাভাইরাস মোকাবিলায় হাসপাতালের আগাম প্রস্তুতি থাকলেও এমন অবস্থা কেন- জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেছেন, দেশে করোনা প্রাদুর্ভাব শুরুর পরেই আমাদের হাসপাতালে অনেক রোগী এসেছিলেন। প্রথম দিকে রোগীরা তথ্য গোপন করার কারণে তাদের সংস্পর্শে এসেই আমাদের হাসপাতালে ডাক্তার, নার্সসহ অনেকেই আক্রান্ত হয়েছে। আমাদের হাসপাতালে এখন পর্যন্ত করোনায় আনুমানিক ২০ জন চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছে।
তিনি আরও জানান, হাসপাতালে জেনারেল আইসিইউতে শনিবার দুইজন নার্স, একজন ওয়ার্ড বয় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। যারা আক্রান্ত হয়েছে তারা সম্পূর্ণ পরিপূর্ণ সুরক্ষা সামগ্রী পরে ডিউটি করছিলেন। তারপরও তারা আক্রান্ত হয়েছেন। নতুন করে যারা আইসিউতে ছিলেন তাদেরকে হোম আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালে আগে থেকেই কর্মচারীর সংখ্যা কম। ডেইলি বেসিকে অনেক কর্মচারী নেওয়া হয়েছিল। বার্ন ইউনিট কোভিড-১৯ ঘোষণা হওয়ার পর ডেইলি বেসিসে নিযুক্ত অনেকেই কাজে আসছে না।
হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির সভাপতি আবু সাঈদ জানান, করোনাভাইরাস শুরুর পর থেকে এই পর্যন্ত ১৫ জনের বেশি কর্মচারী আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার (৭মে) সুফিয়া আক্তার (৪৫) নামের এক কর্মচারী করোনাভাইরাসে মারা গেছেন।
তিনি আরও জানান, হাসপাতাল থেকে যে সুরক্ষা সামগ্রী আমাদের দেওয়া হচ্ছে সেগুলো পর্যাপ্ত নয়। এ কারণে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
ঢামেকের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুর রব জানান, করোনা প্রাদুর্ভাব শুরু থেকে রোববার পর্যন্ত ছয়জন টেকনোলজিস্ট করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। এদের মধ্যে একজন এক্স-রে বিভাগে ডিউটি করতেন ও বাকিরা প্যাথলজি বিভাগের। তারা হোম আইসোলেশনে আছেন।
উদ্বিগ্ন ওবায়দুল কাদের
ওদিকে সরকারের লকডাউন কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিথিল করার পর সামাজিক দুরত্ব না মেনে চলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
সোমবার (১১ মে) রাজধানীর সংসদ ভবন এলাকায় নিজের সরকারি বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘গরিব-অসহায় মানুষের জীবিকার স্বার্থে সরকার সাধারণ ছুটি কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিথিল করেছে। দুর্ভাগ্যজনক প্রথম দিনেই ঢাকাসহ সারাদেশে শারীরিক ও সামাজিক দুরত্ব অনেকেই উপেক্ষা করছেন। দোকানপাট ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি অনেক জায়গায় মেনে চলা হচ্ছে না। ফেরিঘাটে ঢাকামুখী মানুষের ঢল লক্ষ্য করা যায়। এই উপেক্ষা প্রকারান্তে নিজেদের এবং আশপাশের জন্য বিপদ ডেকে আনবে। করোনা বিস্তারকে উৎসাহিত করবে।‘#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/১১
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।