ইরানে সন্ত্রাসী হামলা ও লেবাননে ইসরায়েলের পেজার হামলার মধ্যে মিল রয়েছে: কলিবফ
-
মোহাম্মদ বাকের কলিবফ
ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সম্প্রতি যে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছে, তা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে লেবাননে ইসরায়েলের চালানো পেজার হামলার সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে। তিনি এই ঘটনাকে 'দায়েশ-ধাঁচের সন্ত্রাসী যুদ্ধ' হিসেবে বর্ণনা করেন।
২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরের পেজার হামলায় লেবাননের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহর সদস্যদের অন্তত ১২ জন শহীদ এবং প্রায় ৩,০০০ জন আহত হন, যাদের অধিকাংশই সাধারণ নাগরিক। ইহুদিবাদী ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার দায় স্বীকার করে।
সে সময় টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইসরায়েল যে পেজার ও অন্যান্য যোগাযোগ যন্ত্রের মাধ্যমে হামলা চালিয়েছে, সে বিষয়ে তাকে আগেই জানানো হয়েছিল এবং এসব হামলা তার তত্ত্বাবধানেই সংঘটিত হয়েছিল।
ট্রাম্পের ভাষায়: “এই সব হামলাই আমার তত্ত্বাবধানে হয়েছে। ইসরায়েল পেজারসহ এসব হামলা চালিয়েছে। তারা আমাকে সবকিছু জানাত। কখনো কখনো আমি না বলতাম, আর তারা সেটাকে সম্মান করত।”
ইরানের স্পিকার কলিবফ স্মরণ করিয়ে দেন, প্রথমে বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরগুলোতে পেজার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে এবং এর পরদিন ওয়াকিটকি বিস্ফোরণ হয়, যার ফলে আরও শত শত মানুষ হতাহত হয়। এসব হামলা ছিল সম্পূর্ণ নির্বিচার এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ফেলে।
আজ (সোমবার) সংসদের অধিবেশনে বক্তৃতাকালে কলিবফ বলেন, "ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সাম্প্রতিক ষড়যন্ত্র ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং সুসংগঠিত। এই পরিকল্পনার মধ্যে ছিল প্রকাশ্য ও সংগঠিত সহিংসতা, সন্ত্রাসী ও সশস্ত্র হামলা, চরম মাত্রার সহিংস অরাজকতা এবং হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, বাসিজ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্য, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করার চেষ্টা।"
কলিবফের ভাষায়, "এই ষড়যন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানি জনগণের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া, তাদের চিন্তা ও বিশ্লেষণক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া এবং রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আস্থা নষ্ট করা। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ভাড়াটে বাহিনীর জন্য ইরানের ওপর সরাসরি হামলা চালানো এবং দেশটিকে বিচ্ছিন্ন করার পথ প্রশস্ত করার চেষ্টা হয়েছিল।"
তিনি আরও বলেন, "বিশ্বের খুব কম দেশই এমন আছে যারা হঠাৎ করে এ ধরনের 'সংগঠিত ও নিষ্ঠুর সন্ত্রাসবাদের' মুখোমুখি হয়ে দ্রুত নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে এবং জনগণকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম হয়—বিশেষ করে যখন এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য ও আনুষ্ঠানিক সমর্থন পায়।"
ইরানের সংসদ স্পিকার জোর দিয়ে বলেন, "এই সাম্প্রতিক ষড়যন্ত্র আসলে জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শাসনের চালানো ১২ দিনের যুদ্ধেরই ধারাবাহিকতা।"
ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ির বক্তব্য উদ্ধৃত করে কলিবফ বলেন, এই ফিতনা বা ষড়যন্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানে অস্থিরতা, নিরাপত্তাহীনতা ও রক্তপাত জিইয়ে রাখতে নিজের অবশিষ্ট বিশ্বাসযোগ্যতাও ব্যয় করেছেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত মাসের শেষ দিকে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের বড় ধরনের পতন এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। শুরুতে এসব প্রতিবাদ ছিল শান্তিপূর্ণ। তবে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে তখনই, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তারা হুমকি দেন যে, ইরান যদি তাদের ভাষায় 'বিদেশি মদদপুষ্ট দাঙ্গা' দমন করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক আগ্রাসনের পথে যাবে।
ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র একাধিকবার জানিয়েছে, তারা জনগণের অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া ও প্রতিবাদের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে। তবে একই সঙ্গে সরকার স্পষ্ট করে বলেছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে অরাজকতা ও সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়ার যেকোনো চেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।#
পার্সটুডে/এমএআর/১৯