ইরাকি প্রতিরোধ শক্তিকে নিরস্ত্রীকরণে আমেরিকার মনোযোগ
ইরাকি সংসদের প্রতি মার্কিন শর্ত; গণতন্ত্রে হস্তক্ষেপ
-
ইরাকের প্রতিরোধ আন্দোলন
পার্সটুডে: দেখা যাচ্ছে, আমেরিকানদের ইরাক দখলের যুগ যেন শেষ হয়েছে। কিন্তু বাগদাদ থেকে আসা প্রতিবেদনে বোঝা যাচ্ছে, ওয়াশিংটন নতুন ইরাকি সরকারের প্রতি পার্লামেন্টের আস্থা ভোটের প্রক্রিয়ায় গভীরভাবে হস্তক্ষেপ করতে চাইছে, যাতে ইরাকি সংসদের মাধ্যমে সরকারি বৈধতা পাওয়া স্বেচ্ছাসেবী সামরিক দল তথা জনপ্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলন পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্স বা 'হাশদ আল-শাবি'র ক্ষমতা সীমিত করা যায়।
ইরাকের রাজনৈতিক সূত্র ওশাসক জোট “শিয়া সমন্বয় কাঠামো”-এর সদস্যরা জানিয়েছেন যে, নতুন প্রধানমন্ত্রী “আলি আল-জাইদি”-এর নেতৃত্বে সরকার গঠনের প্রাক্কালে বাগদাদের ওপর আমেরিকার সরাসরি চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই চাপের সঙ্গে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞার হুমকিও রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানায়।
এ প্রসঙ্গে “আল-আরাবি আল-জাদিদ” পত্রিকা জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ভবিষ্যৎ ইরাকি সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য কিছু শর্ত ও “লাল-রেখা” নির্ধারণ করেছে এবং জোর দিয়ে বলেছে যে, বাগদাদ এসব দাবি মেনে না চললে ইরাকের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে।
২০০৩ সালে ইরাক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলে যায় এবং ২০১১ সাল পর্যন্ত দেশটি থেকে মার্কিন সেনাদের বড় অংশের প্রত্যাহার প্রায় সম্পন্ন হয়। কিন্তু দখলের সময় থেকে এখন পর্যন্ত, যখনই ইরাক নির্বাচন বা সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়, ওয়াশিংটনের হস্তক্ষেপ আবারও এক দখলদার শক্তির চেহারা মনে করিয়ে দেয়।
ইরাকের নির্বাচনে আমেরিকার হস্তক্ষেপের ইতিহাস
গত সব পর্যায়েই ইরাকি পার্লামেন্ট নির্বাচন—যা ছিল দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন এবং যেখানে পার্লামেন্টই প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে—সেখানে আমেরিকার ধ্বংসাত্মক ভূমিকা স্পষ্ট হয়েছে।
সাধারণত আমেরিকা কিছু সুন্নি বা কুর্দি দলকে সমর্থন দিয়ে শিয়া জোটকে দুর্বল করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র শুধু অ-শিয়া দলগুলোকে সমর্থনই করেনি, বরং শিয়াদের মধ্যেও বিনিয়োগ করে প্রতিরোধপন্থী ধারাকে ভেতর থেকে দুর্বল করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
যদিও গত বছরের নভেম্বর মাসে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর অধিকাংশ আসন শিয়া জোট ও গোষ্ঠীগুলোর হাতে যায় এবং এই পর্যায়ে আমেরিকা ব্যর্থতার মুখে পড়ে, কিন্তু সেখানেই বিষয়টি শেষ হয়নি। পার্লামেন্টের আসন নির্ধারণের পরপরই ওয়াশিংটন তাদের হস্তক্ষেপের পরবর্তী পরিকল্পনা শুরু করে, যার লক্ষ্য ছিল ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করা।
শিয়া নেতাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা
গত শীতকালে যখন ইরাকের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকির মতো কয়েকজন পরিচিত শিয়া নেতার নাম বিভিন্ন দল ও জোটের প্রস্তাবিত প্রার্থীদের তালিকায় দেখা যাচ্ছিল, তখন আমেরিকা মালিকিকে প্রধানমন্ত্রী পদের দৌড় থেকে সরাতে ব্যাপক প্রচেষ্টা শুরু করে।
১৪০৪ হিজরি শামসির বাহমান তথা গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে ইরাকি গণমাধ্যম জানায়, ওয়াশিংটন হুমকি দিয়েছে যে, যদি ইরাকের বৃহত্তম ফ্র্যাকশন (শিয়া সমন্বয় কাঠামো জোট) নুরি আল-মালিকির প্রার্থিতার ওপর জোর দেয়, তাহলে ইরাকের কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।
নুরি আল-মালিকির নাম বাদ দেয়ার জন্য ওয়াশিংটনের চাপ এতটাই ছিল যে জার্মানির ডয়চে ভেলে রিপোর্ট করে, যদি মালিকির নাম প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীদের তালিকায় থেকে যায়, তবে আমেরিকা ইরাকের প্রতি তাদের সমর্থন “পুরোপুরি” বন্ধ করে দেবে।
যদিও নুরি আল-মালিকি এবং তার দল “আদ-দাওয়া পার্টি” গত মার্চ এবং এপ্রিল মাসজুড়ে তার প্রার্থিতার পক্ষে অনড় ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুকাল আগে ঘোষণা করা হয় যে ইরাকি পার্লামেন্ট “আলি আল-জাইদি”-কে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেছে।
ইরাকি প্রতিরোধ শক্তিকে নিরস্ত্রীকরণে আমেরিকার মনোযোগ
গত কয়েক দিনে, ইরাকের প্রেসিডেন্ট নেজার ওমিদি পার্লামেন্ট-নির্বাচিত আলি আল-জাইদিকে মন্ত্রীসভা গঠনের দায়িত্ব দেয়ার পর, মন্ত্রীসভার সদস্যদের প্রতি আস্থা ভোটের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে ইরাকের ওপর আমেরিকার চাপের তৃতীয় ধাপ শুরু হয়েছে।
ইরাকি সূত্রগুলোর মতে, আমেরিকা চায় ইরাকের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোতে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব সীমিত করা হোক, কিছু সশস্ত্র সংগঠন ভেঙে দেয়া বা পুনর্গঠন করা হোক, ভারী অস্ত্র সংগ্রহ করা হোক, বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে হামলার দায়ীদের বিচার করা হোক এবং প্রতিরোধপন্থী ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সরকার কাঠামো থেকে সরিয়ে দেয়া হোক।
শিয়া সমন্বয় কাঠামোর এক সদস্য আল-আরাবি আল-জাদিদকে বলেছেন, ওয়াশিংটন এসব দাবি ইরাক সরকারকে সমর্থনের ভাষায় নয়, বরং নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে উপস্থাপন করেছে এবং ২০০৩ সালে ইরাক দখলের পর থেকে এমন মাত্রার চাপ নজিরবিহীন।
অন্যদিকে, প্রতিরোধপন্থী গোষ্ঠীগুলো মনে করে যে প্রতিরোধ বাহিনীকে নিরস্ত্র করার এই পরিকল্পনা ইরাককে অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও ব্যাপক নিরাপত্তা সংকটে ঠেলে দিতে পারে। কারণ অনেক শিয়া দল বিশ্বাস করে যে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা “রক্তস্নান” ডেকে আনবে।
লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইরাকে হাশদ আল-শাবি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরাক দুই দফায় মার্কিন সেনাদের প্রবেশ ও প্রস্থান দেখেছে। প্রথমটি ছিল ২০০৩ সালের দখলদারির সময় এবং দ্বিতীয়টি আইএসআইএসের হামলার সময়। কিন্তু প্রতিবার মার্কিন সেনারা চলে যাওয়ার পরও, ওয়াশিংটন বাগদাদকে ছেড়ে দেয়নি এবং ব্যাপকভাবে ইরাকের ঘরোয়া বিষয়ে হস্তক্ষেপ চালিয়ে গেছে।
“তুফান আল-আকসা” অভিযানের পর, ইহুদিবাদী ইসরায়েল নিজেদের চারপাশে নিরাপত্তা বলয় গড়ার কৌশলের অংশ হিসেবে তিনটি প্রতিরোধ গোষ্ঠী—গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং ইরাকে হাশদ আল-শাবি বা গণবাহিনী—কে নির্মূল করার দিকে মনোযোগ দেয়।
বিশেষত, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক যুদ্ধে ইরাকি প্রতিরোধ শুধু ইরাকের ভেতরে আমেরিকার স্বার্থ নয়, কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু স্বার্থেও হামলা চালিয়েছিল। গাজা যুদ্ধ ও ২০২৪ সালের ৬৬ দিনের হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল সংঘাতের সময়ও ইরাকি প্রতিরোধ বাহিনী অধিকৃত গোলান এলাকায় অত্যন্ত সফল ড্রোন হামলা পরিচালনা করেছিল।
এখন যখন হাশদ আল-শাবিকে বিলুপ্ত করা ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে, তখন অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে এই অশুভ-সাম্রাজ্যবাদী চক্র বা অক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের খরচ তাদের কাছে আত্মসমর্পণের চেয়ে অনেক কম। #
পার্সটুডে/এমএএইচ/১৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন