কলকাতা বিমানবন্দরের ১৩৬ বছরের পুরোনো মসজিদে নামাজ বন্ধ: মিশ্র প্রতিক্রিয়া
https://parstoday.ir/bn/news/event-i161274-কলকাতা_বিমানবন্দরের_১৩৬_বছরের_পুরোনো_মসজিদে_নামাজ_বন্ধ_মিশ্র_প্রতিক্রিয়া
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন ১৩৬ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ‘বাঁকড়া এয়ারপোর্ট মসজিদ’ (সাবেক গৌরীপুর জামে মসজিদ)-এ নামাজ আদায় সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
(last modified 2026-07-13T12:37:36+00:00 )
জুলাই ১৩, ২০২৬ ১৭:৪৬ Asia/Dhaka
  •  ‘বাঁকড়া এয়ারপোর্ট মসজিদ’
    ‘বাঁকড়া এয়ারপোর্ট মসজিদ’

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন ১৩৬ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ‘বাঁকড়া এয়ারপোর্ট মসজিদ’ (সাবেক গৌরীপুর জামে মসজিদ)-এ নামাজ আদায় সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

গত শুক্রবারও এই মসজিদে স্বাভাবিকভাবে নামাজ পড়া হলেও, শনিবার থেকে মুসল্লিদের প্রবেশের প্রধান পথ অর্থাৎ বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ জমিরউদ্দিন।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে তীব্র উত্তেজনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) এবং মুসলিম সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকারের বক্তব্য:

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা বিধি অনুযায়ী, বিমান ওঠানামার পথ বা রানওয়ে থেকে যেকোনো অবকাঠামোর দূরত্ব ন্যূনতম ২৪০ মিটার থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই ঐতিহাসিক মসজিদটি রানওয়ে থেকে মাত্র ১৬৫ মিটার দূরে অবস্থিত। ফলে এটি বিমান পরিচালনায় সমস্যা সৃষ্টি করছে, রানওয়ে সম্প্রসারণে বাধা দিচ্ছে এবং উন্নত ‘ইন্সট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম’ (ILS) স্থাপনে বিলম্ব ঘটাচ্ছে। তা ছাড়া, অঞ্চলটি সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স (সিআইএসএফ)-এর কড়া নিরাপত্তা জোনের আওতাভুক্ত। সিআইএসএফ-ও অতীতে এই স্থাপনা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল।

আজ (সোমবার) এই বিষয়ে মুখ খুলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সাফ জানান, অন্য সব কিছুর চেয়ে জাতীয় নিরাপত্তাই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাবে। তিনি বলেন, "কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অবস্থান ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ চীন এবং বাংলাদেশ—উভয় দেশই এখান থেকে কাছাকাছি। এর প্রবেশদ্বার বহিরাগতদের জন্য খোলা রাখা সম্ভব নয়।"

বিরোধীদের অভিযোগ উড়িয়ে তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগতভাবে ধর্ম পালনে বাধা দেওয়া না হলেও, আইন সবাইকে মেনে চলতে হবে।

একই সুরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেন, "আমি ছাত্রাবস্থা থেকেই খবরের কাগজে পড়তাম যে, এই মসজিদের কারণে রানওয়ে সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না। আগের সরকারগুলো তোষণের রাজনীতির কারণে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আমাদের সরকার তোষণে বিশ্বাসী নয়, মসজিদটি স্থানান্তর করা হবে।"

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানিয়েছে, মসজিদটি স্থানান্তরের জন্য মসজিদ কমিটির সাথে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে এবং মসজিদটির জন্য আরও প্রশস্ত জায়গা দেওয়া হবে।

মসজিদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বিরোধীদের অবস্থান:

স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি স্থাপিত হয়েছিল ১৯২৪ সালে, অথচ এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছে তারও ৩৪ বছর আগে, ১৮৯০ সালে। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার গ্রামীণ মানুষের নিজস্ব অর্থায়নে এটি তৈরি হয়। একসময় বাংলাদেশের সাতক্ষীরা এবং পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুর মহকুমার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ এসে এই ঐতিহাসিক মসজিদে নামাজ আদায় করতেন। বর্তমানেও উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বহু মানুষ এখানে নামাজ পড়েন।

তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) সংসদ সদস্য সৌগত রায় এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলেছেন, "সেখানকার মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্মতি ও আলোচনার মাধ্যমেই কেবল মসজিদটির ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, জোর করে নয়।"

শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা উত্তেজনা না ছড়ায়, সে জন্য মসজিদ কমিটি ও স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রতি আবেদন জানিয়েছেন ভারতের বৃহত্তম মুসলিম সংগঠন জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের রাজ্য সভাপতি তথা পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী।

তিনি বলেন, "বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক, কিন্তু এই নিয়ে কেউ রাস্তায় নেমে আইন হাতে তুলে নেবেন না। আমরা সরকারের সাথে কোনো সংঘাত চাই না। আমরা চাই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আলোচনার মাধ্যমে যেন মসজিদে নামাজ পড়ার বিকল্প ব্যবস্থা করে। জোর করে দরজা বন্ধ করা ঠিক হয়নি।" বিষয়টি নিয়ে দারুল উলুম দেওবন্দ, মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড এবং জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গেও আলোচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।#

পার্সটুডে/এমএআর/১৩