ইরান-যুদ্ধের সময় মার্কিন রণতরীর ৮ নাবিক আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে: মার্কিন নৌবাহিনী
https://parstoday.ir/bn/news/event-i163376-ইরান_যুদ্ধের_সময়_মার্কিন_রণতরীর_৮_নাবিক_আত্মহত্যার_চেষ্টা_করেছে_মার্কিন_নৌবাহিনী
পার্সটুডে: নতুন প্রকাশিত মার্কিন নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপে নিযুক্ত আটজন মার্কিন নৌসদস্য আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন।
(last modified 2026-09-24T14:50:41+00:00 )
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬ ২০:৩৩ Asia/Dhaka
  • মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সরবরাহ করা এই ছবিতে ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন (CVN-72)-এর বিমান লিফটে গোলাবারুদ স্থানান্তর করছেন মার্কিন নৌবাহিনীর নাবিকরা
    মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সরবরাহ করা এই ছবিতে ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন (CVN-72)-এর বিমান লিফটে গোলাবারুদ স্থানান্তর করছেন মার্কিন নৌবাহিনীর নাবিকরা

পার্সটুডে: নতুন প্রকাশিত মার্কিন নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপে নিযুক্ত আটজন মার্কিন নৌসদস্য আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন।

ইরানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক হামলা, সমুদ্রে দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন অবস্থান এবং জীবনযাত্রার অবনতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে এই দীর্ঘ ও কঠিন মোতায়েন চলাকালে এসব ঘটনা ঘটে।

সিএনএনের বুধবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনী সচিব হাং কাও সিনেটর কার্স্টেন গিলিব্র্যান্ডকে লেখা এক চিঠিতে নিশ্চিত করেছেন যে লিংকন স্ট্রাইক গ্রুপের বিভিন্ন ইউনিটে নিযুক্ত আটজন নাবিক মোতায়েনের সময় আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। তবে তাদের কেউই আত্মহত্যা করে মারা যাননি।

এই সংখ্যার মধ্যে বিমানবাহী রণতরিতে থাকা সদস্য, এর এয়ার উইং, স্ট্রাইক গ্রুপ ও ডেস্ট্রয়ার স্কোয়াড্রনের স্টাফ, বহরের সঙ্গে থাকা ডেস্ট্রয়ার এবং মোতায়েন করা বিমান স্কোয়াড্রনের সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

প্রায় ছয়টি জাহাজে ৬,০০০ থেকে ৭,০০০ নাবিক এই স্ট্রাইক গ্রুপে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময় রণতরিটি ছয় মাসেরও বেশি সময় কোনো বন্দরে না গিয়ে সমুদ্রে অবস্থান করে এবং ইরানের বিরুদ্ধে তীব্র সামরিক তৎপরতা চালায়।

কাও চিঠিতে লিখেছেন, “লিংকনের মোতায়েন শুরু হওয়ার পর থেকে পুরো স্ট্রাইক গ্রুপে মোট আটটি আত্মহত্যার চেষ্টা হয়েছে।” তিনি উল্লেখ করেন, এই সংখ্যার মধ্যে গ্রুপটির অধীনে থাকা সব ধরনের সদস্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

মার্কিন নৌবাহিনী এই সংখ্যাকে সামগ্রিক নৌবাহিনীর আত্মহত্যার হারের সঙ্গে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। তবে একজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, সাম্প্রতিক বিমানবাহী রণতরির মোতায়েনগুলোর তুলনায় আটটি আত্মহত্যার চেষ্টা অত্যন্ত বেশি। এসব মোতায়েনে সাধারণত বছরে এক বা দুটি এমন ঘটনা ঘটত।

ওই কর্মকর্তা বলেন, “আটটি আত্মহত্যার চেষ্টা অবিশ্বাস্য রকম বেশি।” তিনি আরও বলেন, “যুদ্ধ পরিচালনার চাপ স্বাভাবিক মোতায়েনের তুলনায় অনেক বেশি। কোনো বন্দরে থামা নেই, সার্বক্ষণিক সতর্কতা—ইত্যাদি।”

এই মোতায়েনে পাঁচজন ধর্মীয় কর্মকর্তা, একজন মনোবিজ্ঞানী, একজন ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার, একজন সমন্বিত প্রতিরোধ পরামর্শক, আচরণগত স্বাস্থ্যবিষয়ক টেকনিশিয়ান এবং একটি থেরাপি/সহায়ক কুকুর ছিল। তা সত্ত্বেও গুরুতর ঘটনাগুলো অব্যাহত ছিল।

নতুন প্রকাশিত তথ্যগুলোতে নাবিকদের কয়েকটি জাহাজ থেকে সমুদ্রে পড়ে যাওয়া বা ঝাঁপ দেওয়ার ঘটনাও উঠে এসেছে। এর আগে সিএনএন যেসব দুটি ঘটনা জানিয়েছিল—একটি লিংকনের এবং অন্যটি স্ট্রাইক গ্রুপের অন্য একটি জাহাজের নাবিক—তারা দুজনই জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার পর উদ্ধার হন। অন্য কয়েকজন নাবিককেও এমন পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

কাও নিশ্চিত করেছেন, আগস্টের শুরুতে এয়ার উইংয়ের একজন নাবিক জাহাজ থেকে সমুদ্রে পড়ে গিয়েছিলেন, তবে তাকে “দ্রুত উদ্ধার” করে রণতরিতে চিকিৎসা দেওয়া হয়। আরেকজন নাবিক মার্চ মাসে জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করলে সহকর্মীরা তাকে থামিয়ে দেন। পরে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং তিনি বাড়ি ফিরে যান।

এর আগে মার্কিন নৌবাহিনী জোর দিয়ে বলেছিল, “জাহাজে আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টার কোনো বৃদ্ধি আমরা লক্ষ্য করিনি। আমরা প্রতিটি সামরিক সদস্যের সুস্থতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করি এবং উদ্বেগ দেখা দিলে তা মূল্যায়ন ও সমাধানের জন্য ধর্মীয়, চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক পেশাজীবীরা রয়েছেন।”

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ মোতায়েন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে

সিএনএনকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে থাকা নাবিকদের আত্মহত্যার চেষ্টা করে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার ঘটনাগুলো রণতরিটির প্রায় ৫,০০০ নাবিক ও মেরিনের মানসিক স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা আরও বলেছেন, মোতায়েনের সময়কাল এবং আত্মহানি বা আত্মহত্যার মধ্যে নৌবাহিনী কোনো প্রতিষ্ঠিত সম্পর্ক দেখতে পায়নি। তার দাবি, জাহাজ থেকে মানুষ সমুদ্রে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও এই স্ট্রাইক গ্রুপের জন্য অনন্য নয়।

তবে নাবিকদের বর্ণনায় কয়েক মাস ধরে যুদ্ধের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে বন্দরে না থামতে পারার কারণে বাহিনীটির ওপর তীব্র চাপের চিত্র উঠে এসেছে। লিংকনের একজন নাবিক সিএনএনকে বলেছেন, মনোবল অত্যন্ত নিচে নেমে গিয়েছিল এবং সহকর্মী নাবিকদের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা নিয়ে বারবার আলোচনা হতো।

মৌলিক সুযোগ-সুবিধাও প্রায়ই অচল হয়ে পড়ত। টয়লেট ও পানির ফোয়ারা ব্যবহারের অনুপযোগী থাকত এবং অনেক সময় গরম পানিও পাওয়া যেত না।

রণতরিটিকে দেশে ফেরার নির্দেশ দেওয়ার আগে ওই নাবিক বলেছিলেন, “প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে যখন আমরা আমাদের ক্যাপ্টেনের কথা শুনি, তখন আমরা মরিয়া হয়ে এবং উদ্বেগের সঙ্গে আমাদের ফিরে যাওয়ার খবরের অপেক্ষা করি।”

গিলিব্র্যান্ড প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সচিব পিট হেগসেথ যেটিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত আমাদের সামরিক সদস্যদের জন্য গুরুতর ও অবনতিশীল পরিস্থিতি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।”

তিনি বলেন, সরকার করদাতাদের অর্থ “বোমা, বলরুম এবং বিলিয়নিয়ারদের” পেছনে ব্যয় করতে প্রস্তুত থাকলেও সেনাসদস্য ও তাদের পরিবারের যথাযথ যত্ন নিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

লিংকনে থাকা অন্যান্য নাবিকও সিএনএনকে বলেছেন, আগের মোতায়েনের তুলনায় তারা অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। কারণ ধারাবাহিক যুদ্ধের কারণে জাহাজগুলো সরবরাহ নেওয়া এবং নাবিকদের বিশ্রামের জন্য বন্দরে থামতে পারেনি।

লিংকন আগস্টে পশ্চিম এশিয়া ছেড়ে গেছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সান দিয়েগোতে ফিরে আসার কথা রয়েছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, জাহাজে থাকা মার্কিন নৌবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে অন্যান্য সামরিক শাখার সেনাদের তুলনায় “গুরুতর মানসিক চাপের” হার বেশি ছিল।

২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর অঞ্চলটির ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে—এমন দাবি প্রতিবেদনে করা হয়েছে।

ওয়াশিংটন ব্যাপক বিমান ও নৌ-সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ব্যবহার করে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা করলেও, প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সফলভাবে একটি নির্ধারক অসমমিতিক আক্রমণাত্মক অবস্থানে চলে যায়।

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে নির্ভুল পাল্টা হামলা পরিচালনা এবং হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ দেশীয়ভাবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রচলিত সুবিধাগুলো কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে—প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে। #
 

পার্সটুডে/এমএএইচ /২৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।