বিক্ষোভ ঠেকাতে ব্যাপক ধরপাকড়:
সিইসি'র পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল দিল্লি, আটক মমতা-মানিক সরকারসহ বহু নেতা
-
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরবিন্দ কেজরিওয়াল আটক
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী নয়াদিল্লি। শনিবার (১০ অক্টোবর) নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে আয়োজিত কর্মসূচিতে যোগ দিতে গিয়ে আটক হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতা ও আন্দোলনকর্মী।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) নেত্রী নেহা বোরা, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব ও আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণসহ আরও অনেকে। এ ছাড়া মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী এবং বিক্ষোভের অন্যতম আয়োজক সিজেপির কয়েকজন নেতাকেও আটক করার খবর পাওয়া গেছে।
বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে পুলিশ। যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। কনট প্লেস এলাকার কাছে বিক্ষোভস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করা অন্তত ২০০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাসভবনের সামনে ধর্না, আটক মমতা
দিল্লিতে নিজের বাসভবনের সামনে ধর্নায় বসার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আটক করে পুলিশ। তাঁর সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ দোলা সেন, প্রতিমা মণ্ডল, ডেরেক ও’ব্রায়েন, শামিরুল ইসলাম ও সাকেত গোখলেকেও আটক করা হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে অভিযোগ করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাসভবন থেকে বের হতে দেওয়া হচ্ছিল না। পুলিশ তাঁকে আটকে রেখেছিল এবং প্রতিবাদ করতেও বাধা দিচ্ছিল। পরে তিনি সাংসদদের নিয়ে বাসভবনের সামনেই বসে পড়েন। এরপর তাঁকে আটক করা হয় বলে জানা গেছে।
আটক কেজরিওয়াল, মানিক সরকারসহ বিরোধী নেতারা
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আয়োজিত বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার পথে আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে আটক করা হয়েছে। একই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-এর নেতা মানিক সরকারকেও আটক করা হয়।
বিক্ষোভে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের কর্মীদের অংশগ্রহণের কথা ছিল। কিন্তু পুলিশি বাধা ও ব্যাপক ধরপাকড়ের কারণে অনেকেই নির্ধারিত স্থানে পৌঁছাতে পারেননি।
যন্তর মন্তরের বদলে দিল্লি হাটে যাওয়ার আহ্বান
যন্তর মন্তর এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং কার্যত অবরুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর আন্দোলনকারীরা দিল্লি হাটের দিকে মিছিল করার আহ্বান জানান।
এআইএসএর নেত্রী নেহা বোরা এবং সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব ও প্রশান্ত ভূষণ দিল্লি হাটের দিকে যাওয়ার পথে আটক হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নেহা বোরা দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী এবং শিক্ষার্থী আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর আগেই পুলিশ বহু মানুষকে আটক করেছে। এর পরও তাঁরা প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
আটক সিজেপির নেতারা, আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা
বিক্ষোভের অন্যতম আয়োজক সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলের নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে মুম্বাই থেকে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর আটক করা হয়। দলের আইনবিষয়ক প্রধান রত্ন সিংকেও আটক করার খবর পাওয়া গেছে।
সিজেপি ‘যন্তর মন্তর ২.০’ নামে এই বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল। সংগঠনটির আশা ছিল, কর্মসূচিতে প্রায় ২০ হাজার মানুষ অংশ নেবেন। তবে দিল্লি পুলিশের অনুমতি না থাকায় কর্মসূচি ঘিরে শুরু থেকেই উত্তেজনা তৈরি হয়।
দলের নেতাদের আটক করা হলেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সিজেপি। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শীর্ষ নেতারা আটক হলে অজিঙ্ক শিন্দে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন।
এদিকে, মুম্বাইয়ে নিজের বাসভবন থেকে মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীকেও আটক করেছে পুলিশ। সিজেপির সমর্থনে অগস্ট ক্রান্তি ময়দানে একটি কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার সময় তাঁকে আটক করে ডিএন নগর থানায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, বাতিল একাধিক ট্রেন
বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লির পরিবহনব্যবস্থাতেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশনের সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, শনিবার ৪৫টি মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়। এর মধ্যে রাজীব চক, পটেল চক ও কাশ্মীরি গেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন রয়েছে।
এর আগে ৫৭টি স্টেশন বন্ধ রাখার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল। পরে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের পর নির্দেশনা সংশোধন করা হয়। কোনো আন্দোলন ঠেকাতে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সব পথ বন্ধ করা যায় না—আদালতের পর্যবেক্ষণে এ বিষয়টি উঠে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া শনিবার ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে পৌঁছানোর কথা ছিল—এমন একাধিক মেল ও এক্সপ্রেস ট্রেন বাতিলের খবর পাওয়া গেছে।
হোটেলে তল্লাশি, সাতস্তরীয় ব্যারিকেড
বিক্ষোভকারীদের জমায়েত ঠেকাতে দিল্লি ও সংলগ্ন এলাকার হোটেলগুলোতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। কোনো আন্দোলনকারী সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। বাড়ির মালিক ও স্বল্পমেয়াদি আবাসনসেবা প্রদানকারীদের আন্দোলনকারীদের ঘর ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করার খবরও পাওয়া গেছে।
যন্তর মন্তরগামী সড়কে সাতস্তরীয় ব্যারিকেড বসানো হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে। ব্যারিকেডের একাধিক অংশ ঝালাই করে যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সড়কে স্টিলের কাঁটাও বসানো হয়েছে। সকাল থেকে পুলিশের মাইকিংয়ে কর্মসূচির অনুমতি না থাকার কথা জানিয়ে মানুষকে জমায়েত না হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, প্রতিবাদ করার অধিকার সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি রাজধানীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তাদের দায়িত্ব। এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার কথা বলেছে পুলিশ।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে বিরোধী দলগুলোর আপত্তি, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি এবং বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক আটক—সব মিলিয়ে দিল্লিতে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র হয়েছে।
তথ্যসূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য হিন্দু এবং সরবরাহ করা সংবাদ-প্রতিবেদন। প্রকাশের আগে আটকের সংখ্যা, সংশ্লিষ্ট নেতাদের বর্তমান অবস্থা এবং পরিবহনব্যবস্থার হালনাগাদ তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
পার্সটুডে/এমএআর/১০