জ্ঞানেশ পদত্যাগ না করা পর্যন্ত থামব না: রাহুলের হুঁশিয়ারি
দেশকে আরশোলা-ছারপোকাদের উৎপাত থেকে বাঁচাতে হবে: মন্তব্য শুভেন্দুর
-
শুভেন্দু অধিকারী
‘দেশকে আরশোলা-ছারপোকাদের উৎপাত থেকে বাঁচাতে হবে’—কলকাতায় দুর্গাপূজার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এমন মন্তব্য করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে, ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, জ্ঞানেশ পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে। এদিকে, এসআইআর বাতিল, জ্ঞানেশের অপসারণ এবং পুরোনো ভোটার তালিকা অনুযায়ী নির্বাচনের দাবিতে কলকাতায় বিক্ষোভ করেছে আটটি বাম ছাত্রসংগঠন।
গতকাল রোববার কলকাতার শিয়ালদহ থেকে মিছিল বের করেন আটটি বাম ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তাঁদের দাবি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণ করতে হবে, এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে এবং পুরোনো ভোটার তালিকা অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
পুলিশ মিছিল আটকে দিলে বিক্ষোভকারীরা রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানান। তাঁদের অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। বাদ পড়া ভোটারদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও জানান তাঁরা।
বিক্ষোভকারীরা দিল্লিতে এসআইআরবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া নেতা-কর্মীদের আটকের ঘটনার প্রতিবাদ করেন। বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে বাম ছাত্রনেতারা বলেন, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষায় তাঁদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। দাবি পূরণ না হলে পশ্চিমবঙ্গে আরও বড় আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারিও দেন তাঁরা।
জ্ঞানেশ পদত্যাগ না করা পর্যন্ত থামব না: রাহুল
সোমবার নয়াদিল্লিতে কংগ্রেসের সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে জ্ঞানেশ চাপে রয়েছেন। তাঁকে পদত্যাগ করে রাজসাক্ষী হওয়ার আহ্বান জানান কংগ্রেস নেতা।
রাহুল বলেন, ‘আপনি পদত্যাগ করুন। রাজসাক্ষী হয়ে যান। এটাই একমাত্র উপায়। প্রায়শ্চিত্তের উপায়। আপনি অন্যায় করেছেন ঠিকই, কিন্তু মূল অপরাধী আপনি নন।’
তাঁর অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও ব্যবসায়ী গৌতম আদানিরা জ্ঞানেশ কুমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে কী ধরনের প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, তা দেওয়া বিবরণে স্পষ্ট নয়।
রাহুলের ভাষ্য, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের আপত্তির বিষয়টি গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার লড়াইয়ের অংশ। তিনি বলেন, ‘যত দিন জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা দেবেন না, তত দিন আমরাও থামব না।’
সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার ঘোষণা
সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী জানান, এসআইআর নিয়ে তাঁদের আপত্তি আদালতে তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছে কংগ্রেস। তাঁর দাবি, প্রধান বিচারপতি বিরোধীদের আবেদন করার পথ বাতলে দিয়েছেন। সে অনুযায়ী, সোমবার বিকেলেই সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জমা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
রাহুল বলেন, এই লড়াই সংবিধান ও দেশের গণতান্ত্রিক চরিত্র রক্ষার লড়াই। দলমত–নির্বিশেষে সবাইকে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী তাঁদের কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে।
তিনি আরও দাবি করেন, দুই শতাধিক সরকারি কর্মকর্তা তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য দিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও রয়েছেন বলে দাবি করেন রাহুল। তবে এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এখানে পাওয়া যায়নি।
রাহুলের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গেলে তাঁদের বাধা দেওয়া হয়েছে এবং আটক করা হয়েছে। পরে যন্তর মন্তরে কর্মসূচি পালন করতে না পেরে রাজঘাটে প্রার্থনা করেন তাঁরা। এবার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার কথা জানান কংগ্রেস নেতা।
শুভেন্দুর ‘আরশোলা-ছারপোকা’ মন্তব্য
এদিকে, রোববার সন্ধ্যায় কলকাতার সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের দুর্গাপূজার উদ্বোধন করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এবারের পূজার থিম ‘বন্দে মাতরম’। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত এই গানের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে পূজামণ্ডপ সাজানো হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শুভেন্দু বলেন, দেশকে ‘আরশোলা-ছারপোকাদের’ উৎপাত থেকে বাঁচাতে হবে। দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ করার কথাও বলেন তিনি। তবে তাঁর এই মন্তব্যে কাদের ইঙ্গিত করা হয়েছে, তা দেওয়া তথ্য থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
এসআইআর নিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক সংঘাত
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক বিতর্ক জোরালো হচ্ছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের অবস্থান ও প্রক্রিয়ার পক্ষে-বিপক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর বিক্ষোভ, রাহুল গান্ধীর পদত্যাগের আহ্বান এবং শুভেন্দু অধিকারীর বিতর্কিত মন্তব্য—সব মিলিয়ে এসআইআর ইস্যুতে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।#
পার্সটুডে/এমএআর/১২