ভারতে করোনা রুখতে একগুচ্ছ পরামর্শ দিলেন অধ্যাপক ড. শেখ কামালউদ্দীন
https://parstoday.ir/bn/news/india-i82492-ভারতে_করোনা_রুখতে_একগুচ্ছ_পরামর্শ_দিলেন_অধ্যাপক_ড._শেখ_কামালউদ্দীন
ভারতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে একগুচ্ছ পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক ড. শেখ কামালউদ্দীন। আজ (রোববার) রেডিও তেহরানকে দেওয়া সাক্ষাতকারে পশ্চিমবঙ্গের নহাটা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক ড. শেখ কামালউদ্দীন এসব পরামর্শ দেন।
(last modified 2026-03-14T11:23:49+00:00 )
আগস্ট ২৩, ২০২০ ১৬:০৪ Asia/Dhaka
  • অধ্যাপক ড. শেখ কামালউদ্দীন
    অধ্যাপক ড. শেখ কামালউদ্দীন

ভারতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে একগুচ্ছ পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক ড. শেখ কামালউদ্দীন। আজ (রোববার) রেডিও তেহরানকে দেওয়া সাক্ষাতকারে পশ্চিমবঙ্গের নহাটা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক ড. শেখ কামালউদ্দীন এসব পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, গত ১২ মার্চ থেকে আমাদের দেশে কোভিড-১৯ এর কারণে যে মৃত্যুর সূচনা আজ (রোববার) পর্যন্ত সেই সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬ হাজার ৭০৬ জনে। আর ইতোমধ্যে আপনারা জেনেছেন যে এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৩০ লাখ ৪৪ হাজার ৯৪০ জন। আশার কথা এটাই যে, সুস্থতার হার বেশ ভালো ৭৪.৮৯ শতাংশ। অন্য অনেক দেশের তুলনায় মৃত্যু হার আমাদের দেশে কম, ১.৮৭ শতাংশ। তবে এই পরিসংখ্যানগুলো যথেষ্ট নয়। পরিসংখ্যানে হেরফের ঘটে কোভিডের পরীক্ষার উপরে। এখন তুলনামূলকভাবে পরীক্ষার সংখ্যা বেশি হওয়াতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হচ্ছে। অবশ্য এতে ভয়ের কিছু নেই, মানুষ সচেতন হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘মানুষের মধ্যে একটি মরিয়া মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেননা যে মানুষটি ৪/৫ জনের সংসার দৈনিক ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার উপার্জনে নির্বাহ করতেন তিনি মাসান্তিকে রেশন থেকে প্রাপ্ত চাল-ডাল এর উপরে ভরসা রাখতে পারছেন না। আর এটা তো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। ভবিষ্যতে মানুষ কী খাবে,  কী করবে তার  দিশা রেশন ব্যবস্থা হতে পারে না। তাই কী করে করোনা আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, দূরে থাকা যায় আমাদের বরং সে দিকেই দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন। প্রথমতঃ  আমাদের রাজ্যসহ সারা দেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ আছে। বন্ধ আছে অর্থাৎ সামনাসামনি পড়াশোনা বন্ধ আছে  বা সরাসরি শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী এক জায়গায় অবস্থান  করছেন না কিন্তু অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে পড়াশোনা শুরু হয়েছে। এখানেও একটা ব্যবধান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সকলের প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নেই। কিন্তু আমাদের দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যাদের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন ওই শিক্ষার্থীদের  প্রতি, ভাবলে অবাক হতে হয় তাঁরা সরকারী ক্যান্টিন থেকে  খুব কম পয়সায় খাবার পাচ্ছেন যে খাবারের মূল্য তালিকা দেখলে যে কোনও সাধারণ মানুষের চোখ বিস্ফোরিত হয়ে উঠবে। এ জন্য অবিলম্বে এই ব্যবস্থা তুলে দিয়ে আর পাঁচজন সরকারি চাকুরে যেমন নিজস্ব খাবার সংগ্রহ করে থাকেন তাঁদেরও সেইভাবে খাদ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন আর উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে এই সংকটকালে কোভিডের সঙ্গে যুদ্ধ করতে  যাঁরা ব্যস্ত রয়েছেন তাঁদের প্রতি নজর দেওয়া প্রয়োজন। আর পাঠ্যশালা বন্ধ রেখে ধর্মশালা খুলে দেওয়া হয়েছে এবং  হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সেখানে সরকারি স্বাস্থ্যবিধি মেনে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। প্রকৃত চিত্র তা নয়। যে কোনও ধর্মস্থানের  সামনে গেলেই যে কেউ তা সাদা চোখে দেখতে পাবেন। সুতরাং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন মনে করি।’  

তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয়তঃ কিছুদিনের মধ্যেই বিহার বিধানসভা নির্বাচন। পরের বছর পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্য বিধানসভা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচন কমিশন উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণসহ নির্বাচন করতে  বদ্ধপরিকর। কিন্তু তারা যে কথাগুলো বলছেন সেই সমস্ত বিধি সর্বত্র মেনে চলা সম্ভব হবে কি না সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে যদি কেউ আক্রান্ত হয় সেই আক্রান্তের দ্বারা যদি আরো কেউ আক্রান্ত হয় তাহলে এই প্রশ্ন স্বাভাবিক যে নির্বাচনের জন্য যারা আক্রান্ত হলেন তাদের দায় কে নেবে?  পাঁচ বছরের জন্য যে সংসদীয় ব্যবস্থা কোনোভাবে তাকে কী এক বছর বা কমপক্ষে  ছ’মাস পিছিয়ে দেওয়া যায় না? মনে রাখতে হবে আগের সরকারও জনগণের দ্বারাই নির্বাচিত হয়েছিলেন। যে জনগণ মন্ত্রীদের, সদস্যদের নির্বাচিত করেন নির্বাচিত সদস্যরা   পরবর্তীকালে জনগণ তাদের উপরে যে আস্থা, ভরসা রাখেন তা কিন্তু নেতারা রাখতে পারেন না। তা যদি হতো তাহলে এক দলের হয়ে নির্বাচিত হয়ে অনায়াসে অন্য দলে চলে যেতে পারতেন না। বড় নির্বাচনগুলো তো শুধু নেতাদের দেখেই হয় না, দলকে দেখেও হয়। সুতরাং দল পরিবর্তনের প্রভাবে সেই নেতা নির্বাচিত হতে পারেন কিনা একবার দলবদলু সদস্যদের ভেবে দেখা দরকার। বর্তমান পরিস্থিতিতে তো আরো বেশি করে দরকার। তৃতীয়তঃ নেতাদের পরস্পর বিরোধী মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে হবে। রাজ্য সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা কোভিড, তার বাড়বাড়ন্ত এবং তা রুখে দিতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারে আসীন দলকে নিশানা করে বিবৃতি দিচ্ছেন আর কেন্দ্রীয় সরকারে যে দল আছে সেই দলের রাজ্য নেতারা রাজ্য সরকারকে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার জন্য দায়ী করছেন। সব দলের নেতারাই যদি দেশের জন্য কাজ করেন, দেশের মানুষের ভালো-মন্দের জন্য কাজ করেন তাহলে সব দলের নেতাদের বক্তব্যকে সত্য বলে ধরে নিতে হলে দুই সরকারই ব্যর্থ বলে ধরে নিতে হয়। এই দুই সরকারের এবং তাদের নেতাদের পরস্পর বিরোধী বক্তব্যের মাঝে পড়ে প্রাণ যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবন। প্রচলিত প্রবাদ-  ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’। আমাদের দেশে এখন হয়েছে সেই অবস্থা। আর সন্ধ্যা হলে টিভিতে বসে পরস্পর বিরোধী বক্তব‍্য অবিলম্বে বন্ধ করে শিশুদের ভালো রাখার জন্য কী করা যায় সেটি ভেবে দেখা উচিত।

চতুর্থতঃ করোনা পরিস্থিতিতে বেশকিছু জনবহুল জায়গা সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলেও এখনো পর্যন্ত বাতানুকূল প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ আছে। কিন্তু শোনা যাচ্ছে  সেগুলোও খুলে দেওয়া হতে পারে। অবিলম্বে ওই প্রচেষ্টা বন্ধ করা দরকার। সঠিক কারণ জানা না গেলেও এটুকু অন্ততঃ বোঝা গেছে ঠান্ডা বাতানুকূল ব্যবস্থা কোভিডের  বাড়বাড়ন্তের একটা অন্যতম কারণ এবং সিনেমা হলে জনসমাগম হবেই। যদিও বলা হবে সরকারি নিয়মমাফিক দূরত্ববিধি মেনে সব করা হবে এবং আমরা অবশ্যই জানি যা কেবল বাগাড়ম্বর ছাড়া কিছুই না। সুতরাং, প্রেক্ষাগৃহ খোলার সিদ্ধান্ত বন্ধ করতে হবে।

পঞ্চমত অবিলম্বে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে দিয়ে প্রচুর হাসপাতাল, সরকারি মেডিকেল কলেজ, সরকারি নার্সিং কলেজ তৈরি করতে হবে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে সেনাবাহিনীকে দিয়ে কেন? আমরা জানি, আপনারাও জানেন যে ঠিকাদারি সংস্থার দীর্ঘসূত্রিতার ফলে অনেক কাজ থমকে গেছে, থমকে আছে। অথচ ভারতীয় সেনাবাহিনী বিশ্বের যেকোনো শক্তিধর দেশের সেনাদের প্রতি চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে তারা দক্ষতার সঙ্গে অতি দ্রুত বিপর্যয় মোকাবিলা করার মতো উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার মধ্যদিয়ে এই নির্মাণকার্য সম্পন্ন করতে পারে।  তাদের কাছে সেই ধরনের প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো এবং প্রযুক্তিবিদ রয়েছেন এবং কে না জানে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভারতবর্ষে সবথেকে বেশি প্রয়োজন হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং কলেজ।

ষষ্ঠতঃ বহুল প্রচলিত থাকলেও এ ব্যাপারে অবিলম্বে দৃষ্টিপাত করতে হবে যে জিডিপি শুধু নয় বাজেটের একটা বড় অংশ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় করতে হবে। কেননা মহামারীর কবলে পড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও সহযোগী ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে পড়াশোনা চলছে। অদূর ভবিষ্যতে আমরা মানি, না মানি তাকেই কিন্তু অবলম্বন করতে হবে।  আর সেই অনলাইন ব্যবস্থাপনায় দেশের একটি বড় অংশের ছেলেমেয়েরা শুধুমাত্র উপযুক্ত পরিকাঠামো না থাকায় শিক্ষা গ্রহণ করতে না পেরে আত্মহত্যা করার মতো ঘটনা ঘটিয়ে ফেলছে। সুতরাং, এখন কিছুদিনের জন্য চাঁদ বা মঙ্গলগ্রহে  না গিয়ে ছেলেমেয়েদের একটি বছর নষ্ট না করে তাদেরকে উপযুক্তভাবে শিক্ষা দিতে পারলে পরবর্তীকালে বহু ছেলে মেয়ে চাঁদে বা মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার মত অবস্থায় উন্নীত হবে। সুতরাং, শুধু ভোটের আগে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে  শিক্ষার্থীদের জন্য ল্যাপটপ দেওয়ার ঘোষণা নয়, বর্তমান  পরিস্থিতিতে অবিলম্বে সব শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তুলে দেওয়া হোক আর স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দ করতে হবে এজন্য যে স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে শিশুরা সঠিক পাঠগ্রহণ করা থেকে বঞ্চিত হবে। সেজন্য অন্যান্য দফতর থেকে দরকার হলে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে বেশি করে ব্যয় করতে হবে।

সপ্তমতঃ সমস্ত কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের বাহুল্য বর্জন করতে হবে। একজন সংসদ সদস্য বা একজন বিধায়ক যে  পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা পান, তাঁদের পরিবার পেয়ে থাকেন, কিছুদিনের জন্য তা বন্ধ করা দরকার। একজন এমপি বা বিধায়কের জন্য দশটা করে সংবাদপত্রের সরবরাহ এই মুহূর্তে না করলেও চলবে। এমনকি তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য যে ব্যয়বরাদ্দ নির্দিষ্ট আছে তা থেকেও ব্যয় বরাদ্দ সংকোচ করে জনগণের জন্য সেই বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। কেননা নেতাদের, মন্ত্রীদের জন্য জনগণ নন,   জনগণের জন্য নেতারা নির্বাচিত হন। ভোটের সময় তাঁরা তো তাই-ই বলেন। সুতরাং নেতা থেকে কী হবে যদি  জনগন না থাকেন। গরীব, অসহায় জনগণের দিকে এবার একটু বেশি করে নজর দেওয়া দরকার মনে করি।

সবশেষে বলতে চাই যে,  যে নেতা-মন্ত্রীরা সব ব্যাপারেই মন্তব্য করে থাকেন সেই সব মন্তব্য সব সময় যে সুচিন্তিত এবং বিজ্ঞানসম্মত তা-ও নয়। পৌরাণিক কালে কোন যুদ্ধ কত দিনের মধ্যে সমাপ্ত হয়েছিল আধুনিক যুগে কোভিডের  মতো মহামারী থেকে দেশবাসীকে কত দিনের মধ্যে রক্ষা  করা যাবে বলে যাঁরা ঘোষণা করেন তাঁরা এবং জনগণ আমরা প্রত্যেকেই বুঝতে পারছি যে সেটি হয়নি। সুতরাং আমার আবেদন, এখন আপনারা একটু কম কথা বলুন আর চিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের, অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের বলতে সুযোগ দিন। সারা জীবন ছিল, থাকবে আপনাদের বলার জন্য। এখন ডাক্তার, নার্স, বিজ্ঞানী, পুলিশকর্মীদের একটু বলার এবং তাঁদের বলা কথাগুলো মেনে চলার ব্যবস্থা করলে ভালো হয়।

সর্বোপরি একথাটি বহুবার বহুজন বহু জায়গায় বলেছেন, জনগণকে সচেতন হতে হবে তাঁরা সচেতন না হতে পারলে আদতেই এই মহামারী থেকে মানব সভ্যতাকে রক্ষা করা যাবে না।’ সুতরাং আমরা সচেতন হই। মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের যথাসম্ভব অবদান রেখে যাই বলেও অধ্যাপক ড. শেখ কামালউদ্দীন মন্তব্য করেন।#

পার্সটুডে/এমএএইচ/এমবিএ/২৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।