তদন্ত কাজে সহযোগিতা করতে রাজি আজারবাইজান
তেহরানস্থ আজারবাইজান দূতাবাসে হামলার ঘটনায় হঠাৎই সুর পাল্টালো বাকু
-
তেহরানস্থ আজারবাইজান দূতাবাসে হামলা
গত ২৭ জানুয়ারি ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থিত আজারবাইজান দূতাবাসে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে একজন নিহত ও দুই জন আহত হয়। ঘটনার পরপরই ইরানের কর্মকর্তারা বাকু কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে বলেন এর সাথে সন্ত্রাসী হামলার কোনো সম্পর্ক নেই এবং এ ব্যাপারে তারা পূর্ণ তদন্তের আশ্বাস দেন। যদিও বাকু তখন এতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি।
প্রথমদিকে সন্দেহজনক কারণে আজারবাইজানের কর্মকর্তারা ওই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে ইরানের বিচারবিভাগ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে কোনো রকম সহযোগিতা করতে অনীহা দেখিয়ে আসছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই বাকু কর্তৃপক্ষ তেহরানে তাদের দূতাবাসে হামলার ঘটনা তদন্তে সহযোগিতা করতে সম্মতি জানিয়েছে। আজারবাইজানের বিচারবিভাগে সরকার পক্ষের প্রধান কৌশলী কামরান আলিয়েভ ওই ঘটনার তদন্তে গত এক মাস ধরে তাদের অনীহা বা অসহযোগিতার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেছেন, প্রয়োজনে তেহরানে আজারবাইজানের দূতাবাসে হামলার ঘটনা তদন্তের জন্য বাকু সরকারের বিচারবিভাগ ও নিরাপত্তা বিভাগের বিশেষ তদন্ত টিম তেহরান সফরে যাবে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আজারবাইজানের বিচারবিভাগে সরকার পক্ষের প্রধান কৌশলী তেহরানে তাদের দূতাবাসে হামলার ঘটনা তদন্তে ইরানের বিচারবিভাগকে যদিও সহযোগিতা করতে সম্মতির কথা জানিয়েছেন কিন্তু দেশটির কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যমূলক ও অপ্রত্যাশিত কথাবার্তা পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।
দেশটির একজন পদস্থ কর্মকর্তা রিয়েল টিভিকে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন, তাদের নিরাপত্তা সংস্থা সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগের ভিত্তিতে ওই ঘটনার তদন্ত কাজ চালাচ্ছে। তিনি বলেছেন, আজারবাইজানের দূতাবাসে সশস্ত্র হামলার ঘটনা প্রমাণ করে এতে একজন মাত্র ব্যক্তি জড়িত ছিল না এবং এটা ছিল সুপরিকল্পিত। তাই ওই হামলার সাথে জড়িত ও নির্দেশদাতা সবাইকে বিচারের আওতায় আনা হবে। তিনি তার বক্তব্যে এ হামলার পেছনে ইরানকে জড়িয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেছেন।
অনেকে বলছেন, আজারবাইজানের কর্মকর্তারা এমন সময় তেহরানের বিরুদ্ধে অভিযোগের সুরে কথা বলছেন যখন এলহাম আলিয়েভ সরকার দূতাবাসে হামলার ঘটনায় তাদের সন্দেহ বা দাবির স্বপক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন তো করেনি বরং এটিকে তারা আন্তর্জাতিকীকরণ করার চেষ্টা করে আসছে যাতে ইরানের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা যায়। তবে, দেশটির বিচারবিভাগে সরকার পক্ষের প্রধান কৌশলী জানিয়েছেন, ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহদি সাফারি এরই মধ্যে বাকু সফরে গিয়ে আজারবাইজানের পররাষ্ট্র ও উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতে দূতাবাসে হামলার বিষয়ে কথাবার্তা বলেছেন। দূতাবাসে হামলার পর তেহরান ও বাকুর কর্মকর্তাদের মধ্যে এটাই প্রথম বৈঠক।
দুঃখজনকভাবে, এলহাম আলিয়েভ সরকারের কর্মকর্তারা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো গ্রহণযোগ্য দলিল ও প্রমাণ না দিয়েই ইরানের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ করে আসছেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইরানকে হেয় করার জন্য বিদেশিদের পরামর্শে কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু ধারণা করা হচ্ছে বাকুর ইরান বিরোধী কর্মকর্তারা ও বিদেশে তাদের মদদদাতারা তেহরানে তাদের দূতাবাসে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরানকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টায় সফল হতে পারেনি। এ কারণে বিশ্লেষকরা আজারবাইজানের দূতাবাসে হামলার ঘটনার পরপরই বলে আসছেন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী চক্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই হামলা চালানো হতে পারে যাতে ভ্রাতৃপ্রতিম এ দুই মুসলিম দেশের মধ্যে গোলযোগ বাধানো যায়।
ইরানের তাবরিজের রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহদি নাআলবান্দি বলেছেন, 'আমি মনে করি তেহরান-বাকুর মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে ইসরাইলই পরিকল্পিতভাবে হামলার নাটক সাজিয়েছে যাতে আজারবাইজান সংলগ্ন সীমান্ত এলাকার সংঘাতে ইরানকে জাড়ানো যায় এবং ইরানকে ব্যস্ত রেখে ওই এলাকায় ইসরাইলি কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তেহরানের দৃষ্টিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা যায়'।
যাইহোক, হামলাকারীকে আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন করেছে পুলিশ। মূল ঘটনা হচ্ছে, আজারবাইজানের এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন এই হামলাকারী। তার দাবি, প্রায় দশ মাস আগে তেহরানস্থ আজারবাইজান দূতাবাসে প্রবেশের পর তার স্ত্রী আর সেখান থেকে বেরিয়ে আসেনি এবং দীর্ঘ এই সময়ে একবারও তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। স্ত্রীকে উদ্ধার করতেই তিনি সেখানে হামলা চালিয়েছেন বলে দাবি করছে হামলাকারী ঐ ব্যক্তি। এবার যখন এই ব্যক্তি আজারবাইজান দূতাবাসে প্রবেশ করে তখন সঙ্গে তার মেয়েও ছিল। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এই মেয়ে নিরাপত্তা বাহিনীকে বলেছেন, দূতাবাসে যে তার মা নেই এ কথা বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। তার বাবা ভাবতেন, তার স্ত্রী এখনও দূতাবাসেই অবস্থান করছে। মেয়ের ভাষ্যমতে, স্ত্রীকে উদ্ধারের চিন্তা থেকেই দূতাবাসে ঢুকে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে তার বাবা।
প্রকৃতপক্ষে, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কারণে গত ২৭ জানুয়ারি শুক্রবার ক্লাসনিকভ বন্দুক হাতে করে ইয়াসিন হোসেন যাদেহ তেহরানস্থ আজারবাইজান দূতাবাসে ওই হামলা চালায়। হামলার ফলে আজারবাইজান দূতাবাসের একজন কর্মী নিহত ও দুই জন আহত হয়। হামলার পরপরই ইরানের কর্মকর্তারা আজারবাইজানের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে বলেছেন, এটি কোনো সন্ত্রাসী হামলা ছিল না এবং এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করবে তেহরান। হামলার কয়েক মিনিট পরই তেহরানের পুলিশ প্রধান বলেছেন, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওই হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং হামলাকারীকে আটক করা হয়েছে। এরপর ইরান-আজারবাইজান ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটির সদস্য রুহুল্লাহ হাজরাতপুর বলেছেন, 'দূতাবাসে হামলার ঘটনাটি একেবারেই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যার কারণে ঘটেছে, এর সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের কোনো সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে না। কাজেই দুই দেশের সুসম্পর্কের ওপর এই ঘটনা কোনো ধরণের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। তার মতে, দুই দেশের সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। এ ধরণের কোনো ইস্যুকে কেউ যদি অপব্যবহার করতে চায় তাহলে দুই দেশের সরকার ও জনগণই তা মোকাবেলা করবে বলে তার বিশ্বাস'।
দুঃখজনকভাবে এরপরও আজারবাইজানের এলহাম আলিয়েভ সরকার তেহরানে তাদের দূতাবাসের কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে এবং বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে টেনে নিয়ে ইরানকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু আজারবাইজান দূতাবাসের পক্ষ থেকে হামলার ছবি ও ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর ইরানের ব্যাপারে ওই দেশটির এক শ্রেণীর কর্মকর্তার নির্লজ্জ আচরণের বিষয়টি সবার সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ে। এমনকি খোদ এলহাম আলিয়েভ সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারাও বিস্মিত হন। এরপরই তারা ইরানের ব্যাপারে সন্দেহ থেকে সরে আসতে বাধ্য হন এবং তদন্ত কাজে তেহরানে সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। #
পার্সটুডে/রেজওয়ান হোসেন/৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।