ইরানে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট অপরাধী: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা
-
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী
পার্সটুডে- ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী পবিত্র ঈদুল মাবআস বা মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) এর নবুওয়াত-প্রাপ্তি দিবস উপলক্ষে গতকাল শনিবার (১৭ জানুয়ারি, ২০২৬) বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষের সমাবেশে বলেছেন, বর্তমান সমাজেও পবিত্র ইসলাম ধর্মের রয়েছে এমন বিশাল সক্ষমতা, যা ইসলামের প্রথম যুগের মতোই মৌলিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে এবং জাহেলিয়াত, জুলুম, জোরজবরদস্তি, ভয় ও ঔদ্ধত্যে নিমজ্জিত সমাজকে সংশোধন, মুক্তি ও মর্যাদার সমাজে রূপান্তরিত করতে পারে।
তিনি সাম্প্রতিক দাঙ্গা-নৈরাজ্যের বিভিন্ন দিক ও এর পরিকল্পনাকারী ও উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন এবং গত ১২ জানুয়ারিতে সরকারের পক্ষে বিশাল মিছিল-সমাবেশের আয়োজন করায় ইরানি জাতিকে ধন্যবাদ জানান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, ইরানি জাতি নৈরাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে, তবে এই দাঙ্গা-নৈরাজ্যের প্রকৃতি, লক্ষ্য এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও প্রতারিত এজেন্টদের ভালোভাবে চেনা জরুরি।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির দিনকে পবিত্র কুরআনের জন্মদিন, পরিপূর্ণ মানুষ গঠনের ঐশী কর্মসূচি সম্পর্কে মানবজাতির সচেতনতার দিন, ইসলামী সভ্যতার সূচনালগ্ন এবং ন্যায়, ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের পতাকা উত্তোলনের দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে বহু সমাজে বিশেষকরে পশ্চিমা সমাজ গভীর নৈতিক অবক্ষয়, জুলুম, বৈষম্য, আগ্রাসন ও ঔদ্ধত্যে আক্রান্ত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গভীর ও সর্বজনীন ঈমানের ভিত্তিতে কাজ করলে ইসলাম ও ইমানদার মুসলমানরা আজকের বিশ্বকে ধ্বংস ও অবক্ষয়ের পথ থেকে উদ্ধার করে সংশোধন, মুক্তি ও মর্যাদার শিখরে এবং জাহান্নামের দিক থেকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সাম্প্রতিক দাঙ্গা-নৈরাজ্য প্রসঙ্গে বলেন- যে দাঙ্গা ও নৈরাজ্য গোটা জাতিকে কষ্ট দিয়েছে ও দেশের ক্ষতি করেছে, তা শেষ পর্যন্ত ইরানি জাতি, দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও দক্ষ নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে দমন করা হয়েছে এবং এই ফিতনার প্রকৃতি ছিল সম্পূর্ণভাবে আমেরিকান।
তিনি বলেন, আমেরিকার মূল লক্ষ্য শুধু বর্তমান প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বরং এটি ধারাবাহিক মার্কিন নীতি, আর এই লক্ষ্যটা হলো ইরানকে গ্রাস করা এবং ইরানের ওপর আবারও সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। কারণ এত বিশাল ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, সম্পদ ও বৈজ্ঞানিক-প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিয়ে এমন একটি সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে থাকা দেশ তাদের কাছে সহনীয় নয়, তারা এমন দেশকে সহ্য করতে পারে না।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী বলেন, ইরানে সংঘটিত নৈরাজ্যের ক্ষেত্রে অতীতে সাধারণত সংবাদমাধ্যম এবং দ্বিতীয় স্তরের মার্কিন বা ইউরোপীয় রাজনীতিবিদরা হস্তক্ষেপ করতেন। এবারের নৈরাজ্যের বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেই সরাসরি এতে হস্তক্ষেপ করেছেন, বক্তব্য দিয়েছেন, হুমকি দিয়েছেন এবং দাঙ্গাবাজদের উদ্দেশে বার্তা পাঠিয়ে বলেছেন, এগিয়ে যাও, ভয় পেও না, আমরা তোমাদের সামরিকভাবে সমর্থন করব।
তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ধ্বংসকারী ও হত্যাকারীদেরকে ‘ইরানি জাতি’ বলে অভিহিত করে ইরানি জাতিকে বড় ধরণের অপবাদ দিয়েছেন। তিনি প্রকাশ্যে দাঙ্গাবাজদের উসকানি দিয়েছেন এবং পর্দার আড়ালে থেকে আমেরিকা ও ইহুদিবাদী ইসরাইল দাঙ্গাকারীদের সাহায্য-সহযোগিতা দিয়েছে। তাই আমরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে ইরানিদের হতাহত করার জন্য, দেশের ক্ষয়ক্ষতি সাধনের জন্য এবং ইরানি জাতিকে অপবাদ দেওয়ার জন্য অপরাধী বলে মনে করি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী নৈরাজ্যে জড়িতদেরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে বলেন, প্রথম দলটি ছিল সেইসব ব্যক্তি, যাদেরকে আমেরিকা ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচন করে বিপুল অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এদের অনেককেই গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
আর দ্বিতীয় দলটি ছিল কিশোর ও যুবকরা, যারা প্রথম দলের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে বিভ্রান্ত হয়েছিল। ইহুদিবাদী ইসরায়েল বা বিদেশি গুপ্তচর সংস্থাগুলো সঙ্গে এদের সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল না; বরং তারা ছিল অপরিণত ও আবেগপ্রবণ, এদেরকে তাদের নেতারা উত্তেজিত করে দুষ্কর্মে লিপ্ত করেছিল।
তিনি বলেন, এরা ছিল পদাতিক বাহিনীর মতো—তাদের দায়িত্ব ছিল স্থাপনা, বাড়িঘর, দপ্তর ও শিল্পকেন্দ্রে হামলা চালানো। দুঃখজনকভাবে এই ‘অজ্ঞ ও অসচেতন' লোকেরা তাদের ‘প্রশিক্ষিত ও দুষ্কৃতকারী নেতাদের’ নেতৃত্বে বহু বড় অপরাধ সংঘটিত করেছে—২৫০টি মসজিদ এবং ২৫০টির বেশি শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে, বিদ্যুৎ শিল্প, ব্যাংক, চিকিৎসা কেন্দ্র ও খাদ্যদ্রব্যের দোকানে হামলা চালিয়েছে এবং সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ করে কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করেছে।
তিনি বলেন, মসজিদের ভেতরে তরুণদের ঘিরে রেখে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা, তিন বছর বয়সী একটি কন্যাশিশু ও নিরীহ নারী-পুরুষকে হত্যা করার মতো অমানবিক ও বর্বর কাজগুলো ছিল পূর্বপরিকল্পিত নৈরাজ্যের অংশ। এসব অপরাধে ব্যবহারের জন্য বাইরে থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র এনে বিতরণ করা হয়েছিল।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী জোর দিয়ে বলেন, ইরানি জাতি দাঙ্গা-নৈরাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। ১২ জানুয়ারি লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি সেই দিনটিকে জাতির গৌরবময় ইতিহাসের এক স্মরণীয় দিনে পরিণত করেছে এবং বাচালদের মুখে জোরালো চপেটাঘাত করে নৈরাজ্যের ইতি টেনে দিয়েছে।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী সাম্প্রতিক দাঙ্গা-নৈরাজ্যে ইরানি জাতির হাতে আমেরিকার পরাজয়কে ১২ দিনের যুদ্ধে আমেরিকা ও ইহুদিবাদী ইসরায়েলের পরাজয়ের ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তারা এই ফিতনাকে আরও বড় ষড়যন্ত্রের প্রস্তুতি হিসেবে শুরু করেছিল। যদিও জাতি এই নৈরাজ্যের আগুন নিভিয়ে দিয়েছে, তবে এটি যথেষ্ট নয়—আমেরিকাকে তার কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে আমেরিকার সাম্প্রতিক অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে বলেন, আমরা দেশকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাব না, কিন্তু অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অপরাধীদেরও ছেড়ে দেব না। সঠিক পদ্ধতিতে ও নিজস্ব কৌশলে এই বিষয়টিকে এগিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, আল্লাহর সাহায্যে যেভাবে জাতি নৈরাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙেছে, তেমনি দাঙ্গাবাজদের মেরুদণ্ডও ভাঙতে হবে।
বক্তৃতার শেষাংশে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী বাসিজের অবিরাম পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের প্রশংসা করে বলেন, দেশের সব কর্মকর্তা একসঙ্গে কাজ করেছে এবং গোটা জাতি ঐক্যের মাধ্যমে চূড়ান্ত কথা বলেছে ও দৃঢ়ভাবে বিষয়টির ইতি টেনেছে।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে বলেন, অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো নয় এবং মানুষের জীবন-জীবিকা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের উচিত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, খাদ্যদ্রব্য ও পশুখাদ্য সরবরাহে আগের চেয়ে দ্বিগুণ গুরুত্ব ও প্রচেষ্টা নিয়ে কাজ করা। জনগণ ও কর্মকর্তারা যদি নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, তবে আল্লাহ অবশ্যই এতে বরকত দেবেন।
তিনি ঐক্য রক্ষার ওপর আবারও জোর দিয়ে বলেন- দলীয় বিরোধ, রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত বিবাদ যেন জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে না পড়ে। ইসলামী শাসন ব্যবস্থা এবং প্রিয় ইরানকে রক্ষায় আমাদের সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।#
পার্সটুডে/এসএ/১৮