'ইরান যুদ্ধে যা হারায়নি আলোচনায় তা ছেড়ে দেবে না'
ট্রাম্পের আবারও পিছু হটা; আরবদের পরামর্শ নাকি ইরানের শক্তি?
-
ট্রাম্পের আবারও পিছু হটা; আরবদের পরামর্শ নাকি ইরানের শক্তি?
পার্সটুডে: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ট্রাম্প যে চোরাবালিতে আমেরিকাকে ফেলেছেন, তা এখন মিথ্যাচারের এমন এক দুষ্টচক্রে পরিণত হয়েছে যে এটি তার পরস্পরবিরোধী অবস্থান প্রকাশ করছে। মনে হচ্ছে মাঠের বাস্তবতা এবং নিজেদের অধিকারের পক্ষে ইরানের দৃঢ় অবস্থান মার্কিন প্রেসিডেন্টকে “ইকোলালিয়া সিনড্রোমে” তথা একই কথা বারবার পুনরাবৃত্তি করার রোগে আক্রান্ত করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আবারও কয়েকটি আরব দেশের নেতাদের অনুরোধের অজুহাতে ইরানের ওপর হামলার হুমকি থেকে সরে এসেছেন। এর আগে তিনি পাকিস্তানের অনুরোধের দাবি তুলে হরমুজ প্রণালিকে মুক্ত করার কথিত “প্রজেক্ট ফ্রিডম” স্থগিত করেছিলেন। গত কয়েক সপ্তাহে বহুবার তিনি যুদ্ধের হুমকি থেকে আবারও আলোচনার পথে ফিরে এসেছেন, যেন দ্রুত অবস্থান পরিবর্তনের রাজনৈতিক রেকর্ড গড়তে চান।
অন্যদিকে বিশ্লেষকরা ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে আরও কিছু কারণ দেখছেন। ইরানের সামরিক শক্তি থেকে শুরু করে জনগণ ও কর্মকর্তাদের দৃঢ়তা। মূলত ৪০ দিনের যুদ্ধে ট্রাম্প এমন কিছু অর্জন করতে পারেননি, যার ভিত্তিতে এখন আরেকটি যুদ্ধের মাধ্যমে নিজের জন্য নতুন সাফল্য অর্জন করতে পারবেন।
ট্রাম্পের মিথ্যার দুষ্টচক্র ও বিভ্রান্তির ঘূর্ণাবর্তে হোয়াইট হাউজ
মার্কিন বিশ্লেষক অ্যারন ম্যাকলিন ট্রাম্পের এই দুষ্টচক্রের প্রসঙ্গে এক্স-এ লিখেছেন: “ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে হুমকি দিয়ে আসছেন যে ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খোলা না রাখে এবং তার দৃষ্টিতে আলোচনায় যৌক্তিক আচরণ না করে, তাহলে ভয়াবহ ঘটনা ঘটবে। কিন্তু এখন কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে এবং এসব হুমকির একটিও বাস্তবায়িত হয়নি।”
ম্যাকলিন যে দুষ্টচক্রের কথা বলছেন, তা শুরু হয়েছিল তখন থেকেই যখন হরমুজ প্রণালিতে আমেরিকার শক্তির প্রকৃত মূল্যায়ন হয়ে গেছে। যে পরাশক্তি সবকিছু শক্তি প্রয়োগ করে আদায় করতে অভ্যস্ত, এবার সে এমন এক দেশের মুখোমুখি হয়েছে, যে নিজের অধিকার আদায়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
বর্তমান মার্কিন সরকার আলোচনার প্রক্রিয়ার মধ্যে দু’বার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালায় এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির পর “প্রজেক্ট ফ্রিডম” বা হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে সামরিক পাহারার পরিকল্পনা পরীক্ষা করে। কিন্তু ইরানের সামরিক বাহিনীর দৃঢ় প্রতিক্রিয়ায় সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই সেই পরিকল্পনাও ব্যর্থ হয়।
বাস্তবে আমেরিকা সামরিক ময়দানে তার শক্তি প্রয়োগ করেছে এবং প্রতিবারই ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে ইরানি জনগণের ধৈর্যশীল প্রতিরোধ এবং দেশের কর্মকর্তাদের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান মার্কিন সরকারের বিকল্পগুলোকে সীমিত করে দিয়েছে।
সপ্তাহজুড়ে পুনরাবৃত্তির সিনড্রোম
আল-মনিটরের সম্পাদক জয়েস করমও অ্যারন ম্যাকলিনের মতো মনে করেন, ইরানের ব্যাপারে ট্রাম্পের আচরণ এমন এক পুনরাবৃত্তিমূলক ধারা, যেখানে তিনি নিজেই বারবার বক্তব্য দেন, পরে তা অস্বীকার করেন এবং আবার পুনরায় একই কথা বলেন।
তিনি এক্স-এ লিখেছেন:“ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের আচরণের ধরণ—বুধবার: ইরান চুক্তি চায়।বৃহস্পতিবার: আমরা প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করছি।শুক্রবার: আমরা হয়তো চুক্তির কাছাকাছি।শনিবার: ইরান জানে কী করতে হবে।রবিবার: সম্পূর্ণ ধ্বংস। তাদের হাতে মাত্র ২৪ ঘণ্টা সময় আছে।সোমবার: ঝড় আসছে।মঙ্গলবার: আমি তাদের আরও সময় দিচ্ছি।এরপর আবার বুধবারে ফিরে যাওয়া।”
এদিকে আল-জাজিরা লিখেছে, ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সব কার্ড পুড়ে গেছে। প্রবীণ সাংবাদিক এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক বন্ধু জেরালদো রিভেরা মনে করেন, ইরানিরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের কৌশল বুঝে ফেলেছে এবং “তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে ট্রাম্প সবসময় পিছু হটেন।”
সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা (সর্বোচ্চ চাপের অভিযান) থেকে শুরু করে ভয় দেখানো, হুমকি, হত্যাকাণ্ড এবং শেষ পর্যন্ত ১২ দিন ও ৪০ দিনের দুই চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে অংশগ্রহণ এসবই তথা মার্কিন সরকার ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যা কিছু ছিল সবই ব্যবহার করেছে। এখন যখন তেহরান একটি আঞ্চলিক সংঘাত থেকে বিজয়ী হয়ে বেরিয়ে এসেছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকি ও ভয় দেখানোর কারণে মাঠে যা হারায়নি, তা আলোচনার টেবিলে হারানোর কোনও কারণ নেই।
ইরানের সামরিক শক্তি ও ট্রাম্পের পিছু হটা
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি থেকে সরে যাওয়ার কারণ নিয়ে যেসব ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে, তার মধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা, জনগণ ও কর্মকর্তাদের দৃঢ় অবস্থান—এসবকেই সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যম তুলে ধরছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে:“বর্তমান সামরিক বিকল্পগুলোর কোনোটিই—বড় আকারের হামলা, নেতৃত্বকে লক্ষ্য করা কিংবা স্থল বা নৌ অভিযান—বিশ্বস্ত ও কম ব্যয়বহুল সমাধান দেয় না। ট্রাম্পের জন্য ইরানের সঙ্গে চুক্তির পথ খোঁজাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।”
এছাড়াও নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগন সতর্ক করেছে যে ইরান তাদের আকাশ বা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন করে এখন আমেরিকার “বিমান অভিযান শনাক্ত ও প্রতিহত করার” সক্ষমতা অর্জন করেছে। এই সতর্কতাই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার ঢেউ থামাতে বাধ্য করেছে।
৪০ দিনের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ এবং পুরো অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ক্ষতির পর এখন ট্রাম্প এক দ্বিধার মুখে পড়েছেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন না—আবার সামরিক অভিযান চালাবেন, নাকি এমন একটি চুক্তিতে নমনীয় হবেন যা তার কট্টর সমর্থকদের মধ্যে তার রাজনৈতিক ইমেজ বা ভাবমূর্তি দুর্বল করতে পারে। যুদ্ধের হুমকি থেকে তার বারবার পিছু হটার কারণও এই প্রেক্ষাপটেই ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী তথা আইআরজিসি'র সাবেক প্রধান কমান্ডার মোহসেন রেজায়ি এক্স-এ লিখেছেন:“ট্রাম্প নিজেই হামলার সময়সীমা নির্ধারণ করেন এবং নিজেই তা বাতিল করেন। তিনি আশা করেন এতে ইরানের জনগণ ও কর্মকর্তারা আত্মসমর্পণ করবে, কিন্তু ইরানের লৌহমুষ্টিই তাকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করবে।” #
পার্স টুডে/এমএএইচ/১৯
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।