প্রতিরক্ষায় ইরানের নতুন চমক: দুই ভূমিকায় ‘শাহাব সাকেব’ ক্ষেপণাস্ত্র
-
‘শাহাব সাকেব’ ক্ষেপণাস্ত্র
পার্সটুডে: বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ভূমিভিত্তিক প্রধান অস্ত্র হলো ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। কয়েক কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে শত্রুকে মোকাবিলা করার জন্য এগুলো বিমান বিধ্বংসী কামানের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সম্প্রতি এই প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা অর্জন করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান।
পার্সটুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়: স্বল্প পাল্লা, মাঝারি পাল্লা এবং দূরপাল্লা। এই তিন বিভাগেই ইরান এখন নিজস্ব প্রযুক্তির সমাহার ঘটিয়েছে।
ইরানের অগ্রগতি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প বিভিন্ন ধরণের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ডিজাইন ও তৈরিতে চোখ ধাঁধানো সাফল্য অর্জন করেছে। বর্তমানে ইরানের প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলো দেশের আকাশসীমা রক্ষায় বিভিন্ন ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করছে।
রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিমান প্রতিরক্ষা সনাক্তকরণ, গাইডেন্স ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মতো এই অর্জনগুলো ইরানের নিজস্ব বিশেষজ্ঞদের দ্বারা ডিজাইন ও তৈরি করা হয়েছে। এগুলো এখন ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটের কাছে রয়েছে। বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনীর অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো কম উচ্চতায় শত্রুর লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার জন্য তৈরি 'শাহাব সাকেব' ক্ষেপণাস্ত্র, যা রাডার গাইডেন্স প্রযুক্তিতে সজ্জিত।
সাধারণ পরিচিতি
'শাহাব সাকেব' প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রটি ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের 'ইয়া জাহরা' প্রকল্পের একটি অন্যতম অবদান। কম উচ্চতায় লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার জন্য ডিজাইন করা এই ক্ষেপণাস্ত্রটি 'লাইন অব সাইট' রেডিও গাইডেন্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে। শাহাব সাকেবের কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য নিচে দেওয়া হলো:
- দৈর্ঘ্য: ২.৯৩ মিটার
- ব্যাস: ১৫৪ মিলিমিটার
- ওজন: ৮৪ কেজি
- গতি: ৭৪০ মিটার প্রতি সেকেন্ড
- পাল্লা বা রেঞ্জ:
- ৪০০ মিটার/সেকেন্ড গতির লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে: ৫০০ থেকে ৮,৬০০ মিটার।
- ৩০০ মিটার/সেকেন্ড গতির লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে: ১০ কিলোমিটার।
- হেলিকপ্টারের বিরুদ্ধে: ১১ কিলোমিটার।
নোট: এই ক্ষেপণাস্ত্রটি সর্বোচ্চ ৫,৫০০ মিটার উচ্চতায় এবং ১.৩ মাক গতিসম্পন্ন লক্ষ্যবস্তুর সাথে লড়াই করতে পারে। যেহেতু বেশিরভাগ যুদ্ধবিমান কম উচ্চতায় ভারী যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে এই গতিতে পৌঁছাতে পারে না, তাই এটি দিয়ে প্রায় সব ধরণের যুদ্ধবিমানকে লক্ষ্যবস্তু বানানো সম্ভব। আর বিমানগুলো যদি এর চেয়ে বেশি উচ্চতায় ওড়ে, তবে সেগুলো অন্যান্য উচ্চতর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ফাঁদে পড়বে।
এই ক্ষেপণাস্ত্রটি 'ইয়া জাহরা' এবং 'হেরজ-ই নাহম' প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়। এছাড়াও, 'কারার' জেট ড্রোনগুলোকে আকাশপথের লক্ষ্যবস্তু মোকাবিলার জন্য এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে, যার ফলে এটি এখন একটি 'আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রেও রূপান্তরিত হয়েছে। ড্রোনে ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই ক্ষেপণাস্ত্রে একটি অপটিক্যাল থার্মাল সিকার ব্যবহার করা হয়েছে, যা শত্রুর বিমানের তাপের উৎস ধরে লক করতে পারে।
সুতরাং, কারার ড্রোনে ব্যবহৃত শাহাব সাকেবের সাথে ভূমিভিত্তিক সংস্করণের মূল পার্থক্য হলো এর গাইডেন্স সিস্টেমে। ভূমিতে এটি রেডিও গাইডেন্স ব্যবহার করলেও ড্রোনে এটি হিট-সিকিং বা তাপ-অনুসন্ধানী গাইডেন্স সিস্টেম ব্যবহার করে।
বৈশিষ্ট্যসমূহ
ধারণা করা হয় যে, ইরানের সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত চীনা 'এফএম-৮০' ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সাথে শাহাব সাকেবের মূল পার্থক্য কেবল রাডার সিস্টেমে, তবে ক্ষেপণাস্ত্র দুটির মূল বৈশিষ্ট্যগুলো একই রকম।
সাধারণত, শাহাব সাকেব ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার নির্ভুলতার হার একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়লে ৮৬% থেকে ৯০% এবং একসাথে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়লে ৯৬% পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর ওয়ারহেডের ওজন ১৩.৫ থেকে ১৪ কেজি এবং এটি উচ্চ বিস্ফোরক ঘরানার।
- গঠন: এর বডি নলাকার এবং এতে 'ক্যানার্ড' বা সম্মুখ-ডানা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া পেছনের অংশে ট্রাপিজিয়াম আকৃতির ডানা রয়েছে। ক্যানার্ড থাকার কারণে ক্ষেপণাস্ত্রটি কমান্ড পাওয়ার সাথে সাথে খুব দ্রুত দিক পরিবর্তন করতে পারে, যা একটি প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি। পেছনের ডানার কিছু অংশ ভাঁজ করা যায়, যার ফলে এটি ছোট কন্টেইনারে সহজেই বহন ও উৎক্ষেপণ করা সম্ভব।
- লড়াইয়ের ক্ষমতা: এই ক্ষেপণাস্ত্রটি অভিকর্ষজ ত্বরণের চেয়ে ২৫ গুণ বেশি চাপ সহ্য করে নিখুঁতভাবে মোড় নিতে পারে, যা যেকোনো সাধারণ যুদ্ধবিমানের পিছু নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
- ফিউজ প্রযুক্তি: এটি লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি গিয়ে বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য একটি 'ইনফ্রারেড প্রক্সিমিটি ফিউজ' ব্যবহার করে। যদি ক্ষেপণাস্ত্রটি সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত নাও করে, তাও এর কাছাকাছি গিয়ে বিস্ফোরিত হয়ে ওয়ারহেডের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুকে সর্বোচ্চ ক্ষতি করতে পারে।
তথ্যানুযায়ী, এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ফরাসি 'ক্রোটাল' ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর একক-পর্যায়ের সলিড-ফুয়েল রকেট মোটরটি ২.২ থেকে ২.৭ সেকেন্ড ধরে জ্বলে। ক্ষেপণাস্ত্রটি তার ওড়ার মোট সময়ের ৫% সাবসনিক গতিতে, ৫০% ট্রান্সসনিক (০.৮ থেকে ১ মাক) গতিতে এবং ৪৫% সুপারসনিক (২.৩ মাক পর্যন্ত) গতিতে পার করে। ৮ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে ক্ষেপণাস্ত্রটির মোট সময় লাগে মাত্র ১০ সেকেন্ড।
শত্রুর রাডার ও দৃষ্টি এড়াতে এর বডির ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছে যাতে সুপারসনিক গতিতে বাতাস কম বাধা সৃষ্টি করে। তাছাড়া, এই ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত সলিড-ফুয়েল বা কঠিন জ্বালানিটি সম্পূর্ণ ধোঁয়াহীন এর ফলে শত্রুপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্রটি ধেয়ে আসার পথ দেখতে পায় না এবং তারা প্রতিক্রিয়া জানানোর বা আত্মরক্ষার কোনো সময় পায় না।#
পার্সটুডে/এমএআর/১৯