ব্রিক্স কি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থায় আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য প্রস্তুত?
-
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান
পার্সটুডে- নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেছেন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং শক্তি প্রয়োগের নিষেধাজ্ঞা রক্ষায় এই জোটকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ব্রিকসকে শুধু অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বিস্তৃত ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানের প্রেসিডেন্টের এই অবস্থান আসলে একটি কৌশলগত প্রশ্ন সামনে এনেছে—ব্রিকস কি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় দেশগুলোর স্বাধীনতা রক্ষায় একটি কার্যকর শক্তিতে পরিণত হতে পারে?
বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ব্রিক্সের বর্তমান অবস্থান বিবেচনা করলে এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। সম্প্রসারণের পর বর্তমানে ব্রিকসের সদস্যসংখ্যা ১১ এবং এই জোট বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে। ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্রিকসের অংশ প্রায় ৪০ শতাংশ বলে ধারণা করা হয়। ফলে ব্রিকসকে এখন আর শুধু কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির সীমিত জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় উদীয়মান অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
পেজেশকিয়ান তার বক্তব্যে ‘সহনশীলতা, সহযোগিতা ও স্থায়িত্ব’—এই তিনটি ধারণাকে শুধু স্লোগানের পর্যায়ে রাখেননি; বরং এগুলোকে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ইরানের দৃষ্টিতে, সহনশীলতা শুধু সংকট মোকাবিলায় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বিষয় নয়। রাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকে সুরক্ষা ছাড়া অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, একতরফা নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক চাপ এবং বৈশ্বিক ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের রাজনৈতিক ব্যবহার—এসবই এমন একটি ক্ষমতাকাঠামোর অংশ, যার মাধ্যমে স্বাধীন দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। এ কারণেই জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংককে শক্তিশালী করা এবং আরও স্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে পেজেশকিয়ানের প্রস্তাব তাঁর রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিকস পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্রিকসের নথিতে জাতীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো, জাতীয় মুদ্রায় অর্থায়ন এবং সদস্য দেশগুলোর পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃসংযোগ সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকও জাতীয় মুদ্রায় ঋণ দেওয়ার পরিমাণ বাড়িয়েছে।
তবে এখনই ব্রিকস একটি ডলারনির্ভরতা-মুক্ত স্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে—এমন দাবি করা যায় না। কিন্তু এর দিকনির্দেশনা স্পষ্ট: সদস্য দেশগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার সম্ভাব্য চাপ ও ঝুঁকি কমানো।
এই প্রেক্ষাপটে পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অংশটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইরান জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং শক্তি প্রয়োগের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিকে ব্রিকসের স্থায়ী আলোচ্যসূচির অন্যতম বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। নয়াদিল্লি সম্মেলনের সামগ্রিক পরিবেশও এই দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ব্রিকসের সদস্যরা রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব, বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থায় গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর আরও কার্যকর ভূমিকার আহ্বান জানানো হয়।
এদিকে ব্রিকসের জন্য ইরানের গুরুত্ব শুধু রাজনৈতিক নয়। মধ্য এশিয়া, ককেশাস, রাশিয়া, পারস্য উপসাগর এবং উন্মুক্ত সমুদ্রপথের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে। এর সঙ্গে দেশটির জ্বালানি ও ট্রানজিট সক্ষমতা যুক্ত হলে ইরান গ্লোবাল সাউথের নতুন বাণিজ্য কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
পেজেশকিয়ান এসব সক্ষমতার কথা তুলে ধরে মূলত ব্রিকসে ইরানের অবস্থানকে শুধু একটি রাজনৈতিক সদস্যদেশ হিসেবে নয়, বরং বিভিন্ন বাজার, জ্বালানি উৎস ও বাণিজ্যিক ট্রানজিট রুটের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তবে এখান থেকেই ব্রিকসের আসল পরীক্ষা শুরু। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে স্বার্থের পার্থক্য, কয়েকটি দেশের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান—এসব কারণে ব্রিকস দ্রুত একটি একক রাজনৈতিক জোটে পরিণত হতে পারবে না।
ব্রিকসের লক্ষ্য ন্যাটো বা ওয়ারশ জোটের মতো আরেকটি সামরিক জোট তৈরি করা নয়। এর প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে এমন নিয়ম, প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্যে, যা বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে একটি মাত্র শক্তিকেন্দ্রের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে পেজেশকিয়ানের বক্তব্যকে ব্রিকসের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি কৌশলগত প্রস্তাব হিসেবে দেখা যায়। অর্থনৈতিক, আর্থিক ও আইনি সহায়ক কাঠামো ছাড়া বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ব্রিকস তখনই নতুন বিশ্বব্যবস্থায় একটি নির্ধারক শক্তিতে পরিণত হবে, যখন রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষা, শক্তি প্রয়োগের বিরোধিতা এবং একতরফাবাদের মোকাবিলার নীতিকে শুধু বিবৃতিতে নয়, বাস্তব কার্যকর ব্যবস্থায় রূপ দিতে পারবে।
নয়াদিল্লি সম্মেলন দেখিয়েছে, এই দাবি এখন আর শুধু ইরানের একক দাবি নয়; বরং একবিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামো ও নিয়ম নতুনভাবে নির্ধারণের পথে গ্লোবাল সাউথের একটি বড় অংশের জন্য এটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠছে।
পার্সটুডে/এমবিএ/১৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।