‘আমরা সন্ত্রাসী নই, সন্ত্রাসবাদের শিকার’
পরমাণু বোমা ইসরাইলে, অথচ পরিদর্শকরা ইরানে: জাতিসংঘে পেজেশকিয়ান
-
ভাষণের শুরুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শহীদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীর ছবি তুলে ধরেন মাসুদ পেজেশকিয়ান
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বৈত নীতির সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ইহুদিবাদী ইসরায়েল পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিকভাবে দায়মুক্তি ভোগ করছে, অথচ ইরানকে অব্যাহত পরিদর্শন ও নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেন, শুধু কথার মাধ্যমে আস্থা তৈরি করা সম্ভব নয়; এর জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দ্বৈত মানদণ্ডের অবসান প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “ইসরায়েল গাজায় ৭০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে, অথচ আলোচনার টেবিলে ইরানকে বোমা হামলার শিকার হতে হয়েছে।”
তার ভাষায়, “ইসরায়েল পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী, পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি-তে যোগ দেয়নি এবং তার ইতিহাসে কখনো কোনো আন্তর্জাতিক পরিদর্শককে নিজেদের ভূখণ্ডে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। অথচ দেশটি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনামূল্যের অস্ত্র পায় এবং ইচ্ছামতো যেকোনো রাজধানীতে হামলা চালানোর দায়মুক্তি ভোগ করে।”
পেজেশকিয়ান বলেন, “আমি আবারও বলছি—পরমাণু বোমা ইসরাইলে, কিন্তু পরিদর্শকরা ইরানে! ইসরায়েল হত্যা করে, আর ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়!”
‘আমরাই সন্ত্রাসবাদের শিকার’
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদের অভিযোগের জবাবে পেজেশকিয়ান বলেন, “আমরা সন্ত্রাসী নই; আমরা সন্ত্রাসবাদের শিকার।”
গতকাল (মঙ্গলবার) সাধারণ পরিষদের ৮১তম বার্ষিক অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে ইরানকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়ার হুমকি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘তেহরানের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি হবে কি না, যার মাধ্যমে ইরান নিজেকে “পুনর্গঠন করে আগের চেয়েও অনেক শক্তিশালী দেশ হয়ে উঠতে পারে”, নাকি “আমি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেব”—এ বিষয়ে আমাকে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
পেজেশকিয়ান ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিভিন্ন হামলার ছবি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রদর্শন করেন।
তিনি বলেন, “আমি এমন একটি ইরান থেকে এসেছি, যেখানে আমাদের নেতাকে কোনো আইনগত কারণ বা প্রমাণ ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে।”
তিনি ইরানের মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। সেখানে নিহত স্কুলশিশুদের ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন, “আমি এমন একটি ইরান থেকে এসেছি, যেখানে তারা একটি স্কুলে বোমা হামলা করেছে। আপনারা এসব শিশুকে দেখতে পাচ্ছেন। তারা আমেরিকা ও ইসরাইলের দেওয়া অস্ত্র দিয়ে এসব শিশুকে বোমা মেরে হত্যা করেছে। এসব শিশু কোনো অপরাধ করেনি, কোনো পাপ করেনি।”
ইরানের প্রেসিডেন্ট লামার্দ শহরের ওপর হামলার কথাও উল্লেখ করেন। পেজেশকিয়ানের দাবি, সেখানে মার্কিন বাহিনী প্রথমবারের মতো অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালায়।
তিনি বলেন, “লামার্দ ইরানের একটি ছোট শহর। সেখানে একটি ক্রীড়া হল ছিল, যেখানে শিশুরা শরীরচর্চা করছিল। আমেরিকা ক্লাস্টার বোমা দিয়ে সেটিতে হামলা করে। এসব বোমা হাজার হাজার টুকরোয় বিভক্ত হয়। তারা আমাদের বিজ্ঞানী, মানুষ, নারী ও নিরপরাধ শিশুদের হত্যা করেছে।”
‘তারা হামলা করেছে, কিন্তু আমরা মাথা নত করিনি’
পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সর্বাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চালানো হামলার কথা তুলে ধরে বলেন, “তারা হামলা করেছে, কিন্তু আমরা তাদের সামনে মাথা নত করিনি। আমরা পাল্টা আঘাত করেছি, কিন্তু বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা করিনি।”
তিনি বলেন, “তারা আমাদের স্কুল, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, সেতু ও অবকাঠামোতে হামলা করেছে—যেসব ভূখণ্ড থেকে তারা এসেছিল এবং যেসব জায়গা থেকে তাদের অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছিল। এসবই আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।”
ইরানের প্রেসিডেন্ট তেহরানে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ইসমাইল হানিয়া হত্যার ঘটনাও স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল দায়মুক্তির সঙ্গে যেকোনো সরকার, রাষ্ট্র বা অঞ্চলে হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে।
গাজা প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান পশ্চিমা শক্তিগুলোর কথিত দ্বৈত নীতির সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, “গাজায় ৮০ হাজারের বেশি নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এবং আরও কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তারা তাদের হাতে থাকা উপকরণ দিয়ে গণহত্যা চালাচ্ছে। এরপর তারা অন্যদের সন্ত্রাসী এবং অস্থিতিশীলতার উৎস বলে।”
ইরানের প্রেসিডেন্ট প্রশ্ন করেন, “আমরা কি অস্থিতিশীলতার উৎস? আমরা, যারা স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই এবং মাথা নত করতে অস্বীকার করি—আমরাই কি অস্থিতিশীলতার উৎস?”
‘দেশ রক্ষায় কারও অনুমতি নেব না’
পেজেশকিয়ান ইরান আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার করতে চায়—এমন বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, গত ২০০ বছরে ইরান কোনো দেশের ওপর হামলা করেনি এবং সবসময় আত্মরক্ষার নীতি অনুসরণ করেছে।
তিনি বলেন, “আমরা নিজেদের রক্ষার জন্য শক্তি চাই, আগ্রাসনের জন্য নয়। আমরা উন্নয়নের জন্য জ্বালানি চাই, বোমা তৈরি, ধ্বংস বা সমাজকে হুমকির জন্য নয়। আমরা নিরাপত্তায় অংশ নিতে চাই।”
সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় ইরানি জনগণের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষ প্রতিরাতে রাস্তায় নেমে দেশের প্রতিরক্ষায় অংশ নিয়েছে এবং বিদেশি মদদপুষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে দেশের ভেতরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রচেষ্টা ঠেকিয়েছে।
তিনি বলেন, “সাত মাস ধরে ইরানের জনগণ দিন-রাত রাস্তায় ছিল। জনগণই আমাদের শক্তি এবং জনগণের শক্তির ওপর ভর করেই আমরা দাঁড়িয়ে আছি।”
ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান বলেন, “আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে কেউ মনে না করে যে ইরানের শহরগুলোতে বোমা হামলা চালালেও তার কোনো জবাব দেওয়া হবে না। ইরানের শক্তি প্রতিরক্ষার জন্য। তবে আমরা স্পষ্টভাবে বলছি—দেশকে রক্ষা করার জন্য আমরা কারও কাছে অনুমতি চাইব না।”
তিনি বলেন, ইরান এমন শক্তিশালী হতে চায় যাতে তার অস্তিত্ব ও অগ্রগতি হুমকির মুখে না পড়ে; একই সঙ্গে এমন দায়িত্বশীল থাকতে চায় যাতে সেই শক্তি আধিপত্য বিস্তারে ব্যবহার না করে এবং প্রতিবেশীদের অনিরাপত্তার ওপর নিজেদের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা না করে।
‘পরমাণু অস্ত্রও নয়, পরমাণু জ্ঞান থেকে বঞ্চনাও নয়’
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান বলেন, পারমাণবিক জ্ঞান কয়েকটি দেশের একচেটিয়া অধিকার হতে পারে না।
তিনি বলেন, “বহু বছর ধরে তারা ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচিকে সেন্ট্রিফিউজ, সমৃদ্ধকরণ, নিষেধাজ্ঞা ও বোমার ভাষায় তুলে ধরেছে। কিন্তু আমাদের জনগণের কাছে পারমাণবিক প্রযুক্তি উন্নয়নের অধিকারের অংশ।”
তিনি বলেন, “পারমাণবিক শক্তি আমাদের রোগীদের চিকিৎসা, কৃষির খাদ্যনিরাপত্তা, শিল্পের প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যতের টেকসই বিদ্যুতের সঙ্গে সম্পর্কিত।”
পেজেশকিয়ান বলেন, “ইরান মেনে নেয় না যে পারমাণবিক জ্ঞান কয়েকটি দেশের একচেটিয়া সুবিধা হবে। ইরান পরমাণু অস্ত্রকে নিরাপত্তার উপাদান মনে করে না। তবে বিজ্ঞান, শিল্প ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানির অধিকার থেকে আমরা সরে আসব না।”
তিনি বলেন, “আমরা স্পষ্টভাবে বলছি—পরমাণু অস্ত্রও নয়, পরমাণু জ্ঞান থেকে বঞ্চনাও নয়।”
পেজেশকিয়ানের মতে, ইরানের পারমাণবিক সমস্যার সমাধান যুদ্ধক্ষেত্রে করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “সমাধান হলো এমন একটি চুক্তি, যা বিশ্বকে ইরানের কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ প্রকৃতি সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা দেবে এবং ইরানের জনগণকে তাদের অধিকার সংরক্ষিত থাকার নিশ্চয়তা দেবে।”
‘হরমুজকে ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না’
হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান পশ্চিমা দাবির একটি মৌলিক বৈপরীত্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রে আমরা এমন একটি জলপথের ঐতিহাসিক রক্ষক হতে পারি না, যার সুবিধা সবাই নেয়, অথচ নিজেদের জলসীমাতেও নৌ চলাচলের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হব।”
তিনি বলেন, “তারা আমাদের পথ বন্ধ করে দেয়, এরপর একই জলপথ দিয়ে বিভিন্ন দেশের ধ্বংসের জন্য অস্ত্র, বিস্ফোরক, ক্ষেপণাস্ত্র ও জ্বালানি পরিবহন করে। এটা সম্ভব নয়। তারা এটা করতে পারবে না এবং আমরা আমাদের দেশে এমন কিছু ঘটতে দেব না।”
পেজেশকিয়ান বলেন, “শত্রুভাবাপন্ন নৌবহরের স্থায়ী মোতায়েন এবং যুদ্ধের বিস্তার নিরাপত্তা নিয়ে আসে না। উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তাকে ক্ষুণ্ন করে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।”
‘ফিলিস্তিনে ন্যায়বিচার ছাড়া শান্তি সম্ভব নয়’
পেজেশকিয়ান তার ভাষণের একটি বড় অংশ ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে ব্যয় করেন। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনের জন্য ন্যায়বিচার ছাড়া পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “ফিলিস্তিনকে উপেক্ষা করে আমরা শান্তির কথা বলতে পারি না। ফিলিস্তিনে ন্যায়বিচার ছাড়া পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি টিকবে না।”
তার ভাষায়, “যতদিন বিশ্বে দখলদারিত্ব, আগ্রাসন ও অবিচার থাকবে, ততদিন প্রতিরোধ চলবে। এর একটি রূপকে দমন করা হলে তা অন্য কোনো রূপে, হয়তো আরও শক্তিশালী হয়ে, আবার আবির্ভূত হবে।”
গাজার জনগণের দৃঢ়তার প্রশংসা করে তিনি বলেন, “ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও গাজা মানুষের বিশ্বাসের শক্তি প্রকাশ করেছে—বোমা ও অবরোধ দিয়ে প্রতিরোধকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায় না।”
পেজেশকিয়ান বলেন, “এটাই মানবতার প্রকৃতি। আপনি একজন মানুষকে তার ভূমি থেকে বিতাড়িত করলে সে প্রতিরোধ করবে। আপনি কারও বাড়িতে বোমা হামলা করলে সে প্রতিরোধ করবে।”
তিনি প্রশ্ন করেন, “তারা যদি প্রতিরোধ না করে, তাহলে কী করবে? দাদাগিরি মেনে নেবে? ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়া মেনে নিয়ে নীরবে এই আগ্রাসনের সামনে বসে থাকবে? আর তারা যদি আত্মরক্ষা করতে চায়, তাহলে তাদের সন্ত্রাসী বলা হবে?”
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, পশ্চিম এশিয়ার সমস্যাগুলো দূরবর্তী শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়াই আঞ্চলিকভাবে সমাধান করা সম্ভব এবং উচিত।
তিনি বলেন, “এটা স্পষ্ট যে আমাদের অঞ্চলের সমস্যাগুলো দূরবর্তী শক্তিগুলোর যুদ্ধের অজুহাতে পরিণত হওয়ার আগে অঞ্চল ও অঞ্চলের দেশগুলোর মাধ্যমেই সমাধান করা যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “কৌশলগত স্বাধীনতার অর্থ হলো কোনো বিদেশি শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক যেন প্রতিবেশী কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সুযোগে পরিণত না হয়।”
‘যুদ্ধ দিয়ে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না’
ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের উদ্দেশে পেজেশকিয়ান বলেন, “আমাদের জাতি তাদের সামরিক শক্তি এবং তাদের ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তের পরিণতি খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছে। তারা ইরানের সহনশীলতা পরীক্ষা করেছে এবং এখন তারা ভালোভাবেই জানে যে যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না।”
তিনি বলেন, “ইরান কখনো কোনো যুদ্ধ শুরু করেনি এবং সবসময় আলোচনার টেবিলে বসার ব্যাপারে তার অঙ্গীকার প্রদর্শন করেছে।”
তার ভাষায়, “যুদ্ধ আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমরা প্রমাণ করেছি যে আত্মরক্ষার জন্য আমরা যুদ্ধকে ভয় পাই না; শান্তির জন্য আলোচনা থেকেও আমরা পালিয়ে যাই না এবং প্রিয় ইরানকে রক্ষার জন্য শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমরা দাঁড়িয়ে থাকব।”
‘নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য নিরপরাধ মানুষ’
পেজেশকিয়ান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এসব নিষেধাজ্ঞা দরিদ্র ও নিরপরাধ মানুষকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে এবং ক্ষমতাধর দেশগুলোর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের জন্য সাধারণ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তিনি বলেন, “আমরা যদি ন্যায়বিচার চাই, তাহলে বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বী—উভয়কেই একই মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। মানবাধিকারকে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার করা যাবে না।”
তিনি বলেন, “ইরান বিশেষ কোনো সুবিধা চায় না; সমান অধিকার চায় এবং সেই অধিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব গ্রহণে প্রস্তুত।”
বিশ্ব নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান বলেন, যে বিশ্ব শুধু শক্তির ভাষা বোঝে, সেখানে টেকসই শান্তি অর্জন সম্ভব নয়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “জাতিগুলোর মধ্যে আস্থা ধ্বংস হয়ে গেলে সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীও টেকসই নিরাপত্তা তৈরি করতে পারবে না।”
তিনি আরও বলেন, “আন্তর্জাতিক আইন যদি শুধু তখনই প্রয়োগ করা হয়, যখন তা ক্ষমতাধরদের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাহলে আরও বেশি দেশ তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল নিজেদের শক্তির ওপর নির্ভর করার সিদ্ধান্ত নেবে। এটি আমাদের সবার জন্য আরও বিপজ্জনক এক বিশ্বের সূচনা করবে।”
ইরানের প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান, যেন একবিংশ শতাব্দী জবরদস্তি ও দাদাগিরির যুগে পরিণত না হয়—যেখানে সামরিক শক্তি বৈধতার জায়গা নেয়, নিষেধাজ্ঞা কূটনীতির জায়গা নেয়, হত্যাকাণ্ড রাজনীতির জায়গা নেয় এবং যুদ্ধ সংলাপের জায়গা নেয়।
সমষ্টিগত নিরাপত্তা ও নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা
চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি আগ্রাসনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও পেজেশকিয়ান ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখার পাশাপাশি বিশ্বশান্তির প্রতি তেহরানের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, “ইরান তার শক্তি সংরক্ষণ করবে। আমরা বিশ্বকে আরেকটি যুদ্ধের দিকে নয়, শান্তি ও ন্যায়ের দিকে আহ্বান জানাই—দুর্বলতার কারণে নয়, বরং নিজেদের শক্তির ওপর আস্থা এবং এই উপলব্ধি থেকে যে এই অঞ্চলে কেউ একা নিরাপত্তা অর্জন করতে পারবে না।”
তিনি বলেন, “হয় আমরা একসঙ্গে নিরাপত্তা গড়ে তুলব, নয়তো একসঙ্গে অনিরাপত্তা সহ্য করব।”
পেজেশকিয়ান এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রূপরেখা তুলে ধরেন, যেখানে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা সব দেশের জন্য অবিচ্ছেদ্য ও অভিন্ন অধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে।
ভাষণের শেষদিকে তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক নামে অভিহিত হওয়ার যোগ্য একটি ব্যবস্থা অবশ্যই জাতিগুলোর সমতা, ন্যায়বিচার, ন্যায্যতা এবং মানবজাতির সম্মিলিত ইচ্ছার ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। কারণ যে শান্তি সবার জন্য নয়, তা শান্তি নয়; আর যে ন্যায়বিচার সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে না, তা ন্যায়বিচার নয়।”#
পার্সটুডে/এমএআর/২৩