ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সময়কার কিছু খণ্ডচিত্র-৫ (স্লাইডশো)
পরিস্থিতি ক্রমেই প্রতিকূল হতে দেখে স্বৈরাচারী শাহ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। শাহের সেনারা বিপ্লবীদের অবস্থান দুর্বল করার জন্য চেষ্টা জোরদার করে। ইরানের শাসক মোহাম্মদ রেজা শাহ ১৯৭৮ সালের ১৮ আগস্ট এক সাক্ষাৎকারে তার ভীত-সন্ত্রস্ত হবার বিষয়টি স্পষ্ট করেছিলেন। এ পর্বে এসব বিষয়েই আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হল:
১৯৭৮ সালের আগস্ট মাস। বিপ্লবী আন্দোলন জোরদার হতে দেখে স্বৈরাচারী শাহ সরকার দিশেহারা। তাদের একটাই চিন্তা, কিভাবে বিপ্লবী মুসলমানদের কাবু করা যায়। এ অবস্থায় শাহ এক ঘৃণ্য পন্থা বেছে নেয়। বিপ্লবীদের সুনাম ক্ষুণ্ন করার লক্ষ্যে অনুচরদের সাহায্যে আবাদানের রেক্স সিনেমাহলে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। সিনেমাহলটি তখন দর্শকে পরিপূর্ণ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুনের লেলিহান শিখায় নারী ও শিশুসহ তিন শতাধিক মানুষের করুণ মৃত্য ঘটে। সিনেমাহলে আগুন দেয়ার ঘটনায় সেদিন নারী ও শিশুসহ মোট ৩৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া আহত হয় আরও অনেকে। অগ্নিকান্ডের পরপরই শাহ নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলো, বিপ্লবীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে প্রচার শুরু করে। তারা বলতে থাকে, ইসলামপন্থীরা শিল্প ও সিনেমার বিরোধী। একারণেই তারা এখানে আগুন দিয়েছে। কিন্তু সৌভাগ্যের বিষয় হলো, শাহ ও তার প্রচার মাধ্যমের সে কথা মানুষ বিশ্বাস করেনি।
আবাদানের রেক্স সিনেমাহলে আগুন ধরিয়ে দেয় রেজা শাহ'র অনুচররা
ঐ ঘটনার পর ইমাম খোমেনী (রহ.) এক বাণীতে বলেছিলেন, কোন মুসলমান এমনকি কোন মানুষ এ ধরনের নৃশংসকাণ্ড ঘটাতে পারে বলে আমার মনে হয় না। এ কাজ তাদেরই যারা নৃশংসতা ও পাশবিকতার মাধ্যমে নিজেদের মনুষত্বকে ধ্বংস করেছে। তিনি সিনেমাহলে আগুন দেয়ার জন্য শাহকে দায়ি করে বলেন, ইসলাম বিরোধী এই অমানবিক কাজ বিপ্লবীরা করতে পারেনা কারণ তারা ইসলাম ও ইরানের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ। ইরানে ইসলামী বিপ্লব সফল হবার পর পরিচালিত এক তদন্তের মাধ্যমেও সিনেমা হলে আগুন দেয়ার ঘটনায় শাহ ও তার অনুচরদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে।
আবাদানের রেক্স সিনেমাহলে আগুন দেয়ার পরও শাহ বিরোধী আন্দোলন পুরোদমে অব্যাহত থাকে। এক পর্যায়ে শাহের প্রধানমন্ত্রী জামশিদ অমুযেগার পদত্যাগ করেন এবং জাফর শরীফ ইমামি তার স্থলাভিষিক্ত হন। জনগণকে ধোকা দেয়ার জন্যেই মূলত শাহ, প্রধানমন্ত্রী পদে রদবদল করেন। এর মাধ্যমে তারা জনগণকে বোঝাতে চেয়েছিল যে, শাহের নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
নয়া প্রধানমন্ত্রীও জনগণকে সন্তুষ্ট করার জন্য এবং শাহ বিরোধী আন্দোলনকে স্তিমিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। তিনি ইরানে হিজরী তারিখ পুণরায় চালু করেন। উল্লেখ্য, এর আড়াই বছর আগে শাহ, ইসলাম বিরোধী এক নির্দেশে শাহী তারিখ চালু করেছিলেন। এর ফলে গোটা ইরানের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। নয়া প্রধানমন্ত্রী হিজরী তারিখ পুণরায় চালুর পাশাপাশি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার এবং সাধারণ মানুষের আতংক সাভাক সংগঠন বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ অবস্থায় ইমাম খোমেনী,শাহের চালবাজি উপলব্ধি করতে পেরে জনগণকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
ইরানের জনগণও নয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রতারণা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। তারা শাহ মনোনীত নয়া প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থা না রেখে ১৯৭৮ সালের চৌঠা সেপ্টেম্বর ঈদুল ফিতরের দিন বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেয়। এদিন সারা ইরানের লাখ লাখ জনতা ঈদুল ফিতরের নামাজ শেষে স্বৈরাচারী শাহ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্লোগান দেয়। সেদিন রাজধানী তেহরানে বিশিষ্ট বিপ্লবী আলেম আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ মুফাত্তাহ-র ইমামতিতে অনুষ্ঠিত ঈদের জামাতেও লাখ লাখ মানুষ অংশ নেয়। নামাজ শেষে অপর সংগ্রামী আলেম হুজ্জাতুল ইসলাম ড. মোহাম্মদ জাওয়াদ বহুনার দেশের বাস্তব পরিস্থিতি জনগণের সামনে তুলে ধরেন। আর এর পরই সবাই রাস্তায় নেমে শাহ বিরোধী শ্লোগান দিতে থাকে এবং হযরত ইমাম খোমেনী (রহ.)-র প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে। তেহরানে লাখ জনতার এই বিক্ষোভের খবর গোটা বিশ্বের গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হয়।
এর তিন দিন পর ১৯৭৮ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর আলেমদের আহ্বানে তেহরানে এক মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ থেকে রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়। বিপ্লবী জনতা পরের দিনও বিক্ষোভ মিছিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। রাজতন্ত্র বিলুপ্তির দাবি উত্থাপিত হওয়ায় শাহ ও তার সহযোগীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারে যে, নয়া প্রধানমন্ত্রীর গণপ্রতারণামূলক তৎপরতায় কোন কাজ হয়নি। এ কারণে শাহ বিপ্লবীদের সাথে আরও বেশি নৃশংস আচরণের নির্দেশ দেয়। এর পরের দিনই ইরানের ইতিহাসে এক কলংকজনক অধ্যায়ের সংযোজন ঘটে।
১৯৭৮ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর। শাহের বাহিনী রাজধানী তেহরান, কোম, ইস্ফাহান, শিরাজ, তাব্রিজ ও মাশহাদসহ ১২ টি শহরে সামরিক শাসন জারি করেছে। তেহরানের রাস্তায় রাস্তায় ট্যাংক ও সাজোয়া যান মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু এসব কিছুকেই তোয়াক্কা করছেনা মানুষ। হুমকি ও ভয়-ভীতিকে উপেক্ষা করে শাহের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নিতে হাজার হাজার মানুষ স্কোয়ারগুলোতে সমবেত হচ্ছে। কিন্তু শাহের অনুগত মানুষরুপী হায়েনারা এ দৃশ্য বেশিক্ষণ সহ্য করে নি। তারা নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। একদিকে ট্যাংক আর অন্যদিকে জঙ্গী বিমানের হামলায় হাজার হাজার বিপ্লবীর বুক ঝাযরা হয়। আহত হয় আরও বহু মানুষ। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করা এই হামলার লক্ষ্য ছিলনা বরং তারা সবচেয়ে বেশী সংখ্যক মানুষকে হত্যা করতে চেয়েছিল। শাহ সরকার ভেবেছিল,এই গণহত্যার পর আর কেউ কোন দিন রাজতন্ত্রকে বিলুপ্ত করার কথা মুখে আনবে না। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ঐ হত্যাকান্ডের পর বিপ্লবী আন্দোলন আরও গতিময় হয়ে ওঠে। ইমাম খোমেনী (রহ.) পাশবিক হামলার পর এক শোকবাণীতে বলেন, শাহ নিরস্ত্র ইরানি জাতির উপর প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছে। একারণে ঘৃণ্য ঘটনা সাজিয়ে ইরানিদের উপর অস্ত্র চালাচ্ছে এবং শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। কিন্তু ইরানের মজলুম জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন। তিনি তার বাণীতে আবারও ইরানের সেনাবাহিনীকে জনগণের কাতারে শামিল হবার আহ্বান জানান। একই সাথে সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে জনগণকে অনুপ্রেরণা প্রদান করেন।
তেহরানে সেদিন যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল, মানবাধিকারের দাবিদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিবাদ না জানিয়ে বরং শাহের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ঐ ঘটনার কয়েক দিন পর নিজে চিঠি লিখে শাহের অমানবিক কর্মকান্ডের প্রতি সমর্থন জানান। এছাড়া, মার্কিন প্রেসিডেন্টের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রেযিনেস্কি, শাহকে টেলিফোন করে বলেছিলেন, আপনি যাই করুন না কেন আপনার প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। ইরান সে সময় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে গণ্য হতো এবং শাহের সকল অপকর্মের প্রতি হোয়াইট হাউজের সমর্থন ছিল। এ কারণে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সফল হবার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে নয়া সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং এখনও ঐ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।