ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সময়কার কিছু খণ্ডচিত্র-৭ (স্লাইডশো)
স্বৈরাচারী শাহের বাহিনী ১৯৭৮ সালের ৪ নভেম্বর ছাত্র বিক্ষোভে গুলি চালিয়ে ৫৬ জনকে হত্যা করার পর আন্দোলন আরও তীব্রতর হয়। শাহ তার অতীত ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন থেকে তার বক্তব্য প্রচার করা হয়। ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি তিনি সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এর একদিন পরই ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার শ্লোগান নিয়ে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী শরীফ ইমামী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
শাহ, জেনারেল আযহারিকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেন। সেনা কর্মকর্তাদের হাতে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেয়ার মাধ্যমে শাহ আরও কঠোর হস্তে বিপ্লবী আন্দোলন দমনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু জনগণ তাতে ভয় পায়নি। তারা তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখে। এরই মাঝে একদিন শাহের নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভ দমনের জন্য পবিত্র মাশহাদ শহরে অবস্থিত বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-র বংশধর হযরত ইমাম রেজা (আ.)-র মাজারে প্রবেশ করে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। ইমাম রেজা (আ.)-র মাজার অবমাননার খবর সমগ্র ইরানে ছড়িয়ে পড়লে জনগণ আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
দেখতে দেখতে আবারও শোকাবহ মহররম মাস এসে হাজির হয়। মহররম মাস উপলক্ষ্যে ইমাম খোমেনী (রহ.) ইরানিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠান। তিনি ঐ বার্তায় মহররম মাসে সংঘটিত কারবালার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, মহররম হচ্ছে তলোয়ারের বিরুদ্ধে রক্তের বিজয়ের মাস। তিনি শয়তানি শক্তির মোকাবেলায় নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। ইমাম খোমেনী (রহ.) ইরানের স্বৈরাচারী শাহকে এজিদের সাথে তুলনা করে বলেন, মহররম হচ্ছে এজিদি শক্তির পরাজয়ের মাস। এই মাসে ঘাতক শাহের অন্যায়-অপকর্ম আরও বেশি বেশি তুলে ধরতে তিনি দেশের আলেম সমাজের প্রতি আহ্বান জানান। ইমামের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে মহররমের প্রথম দিন থেকেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শাহের অন্যায়-অপকর্ম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। প্রথম দিনই শাহের ঘাতক বাহিনীর হাতে কয়েক জন শাহাদাৎবরণ করেন। ইমাম খোমেনী (রহ.) ঐ হত্যাকান্ডের নিন্দা জানিয়ে বলেন, এসবের মাধ্যমে শাহ তার পতন ঠেকাতে পারবে না। তিনি ইরানি জনগণের উপর হামলা না চালাতে শাহের সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অত্যাচারী শাহের খেদমত না করার উপায় হিসেবে ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে যাওয়া এখন সেনা সদস্যদের ধর্মীয় দায়িত্ব।
১৯৭৮ সালের ১০ ডিসেম্বর। ইমাম হোসেন (আ.)-র শাহাদাৎবার্ষিকী বা আশুরার পূর্ব দিন। ইমাম হোসেন (আ.)-র প্রতি ইরানিদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বিষয়টি উপলব্ধি করে শাহ দুই দিনের জন্য সামরিক আইন তুলে নেয়। কিন্তু একি দেখছে শাহ। রাজধানী যে জনসমুদ্রে পরিণত হচ্ছে। জনসমুদ্রের সবার মুখে একই সুর। সবাই শাহের পতনের দাবি জানাচ্ছে। সেদিনের মিছিলে তেহরানের পয়ত্রিশ লক্ষাধিক মানুষ অংশ নিয়েছিল। এর পরের দিন অর্থাৎ এগারোই ডিসেম্বর ইমাম হোসেন (আ.)-র শাহাদাৎবার্ষিকীর মিছিলে মানুষের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়। ঐ দিন রাজধানী তেহরানে আশুরার শোক মিছিলে চল্লিশ লক্ষ মানুষ অংশ নেয়। সেদিনও একই ধ্বনি ওঠে; স্বৈরাচার নিপাত যাক, শাহের পতন চাই। মিছিল শেষে তেহরানের বিক্ষোভকারীরা শাহের পতন দাবি করে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে।
সেদিনের বিক্ষোভের পর সবাই এটা বুঝতে পারে যে, শাহের পতন এখন শুধুই সময়ের ব্যাপার। রাজধানী তেহরানে আশুরার মিছিলে শাহের পুলিশ ও সেনাবাহিনী কোন প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি না করলেও বিভিন্ন মফস্বল শহরে হামলার ঘটনা ঘটে এবং বেশ কয়েক জন বিপ্লবী হতাহত হয়।আশুরার মিছিলে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ও শাহের পতনের দাবিতে বিবৃতি প্রকাশিত হবার পর ইমাম খোমেনী (রহ.) আশুরার মিছিলকে শাহের পতনের পক্ষে গণরায় হিসেবে ঘোষণা করেন। পাশাপাশি তিনি আবারও জনগণের পাশে দাড়াতে সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান। ইমাম খোমেনীর আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে সেনা সদস্যরা ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে যেতে শুরু করে এবং বিপ্লবীদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায়।
১৯৭৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর। শাহের গার্ড বাহিনীর সদস্যরা সেদিন তেহরানে গুলি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কামরান নেজাতুল্লাহিকে হত্যা করে। তিনিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েক জন শিক্ষক তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও নিরপরাধ মানুষ হত্যার প্রতিবাদে তিন সপ্তাহ ধরে অবস্থান ধর্মঘট পালন করছিলেন। শ্রদ্ধেয় এ শিক্ষকের দাফন অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেয় এবং তা শাহ বিরোধী বিক্ষোভে রূপ লাভ করে। শাহের বাহিনী এখানেও গুলি চালায়। এক শহীদের জানাযায় এসে আরও বহু বিপ্লবীকে লাশ হয়ে ঘরে ফিরতে হয়। এর একই সময়ে ইরানের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাব্রিজের পরিস্থিতি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সেখানকার বেশ কিছু সেনা সদস্য ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দেয় এবং শাহের অনুগত সেনাদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে।
১৯৭৯ সালের পহেলা জানুয়ারি। শাহের বাহিনী ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মাশহাদ শহরে গণহত্যা চালায়। শত শত মানুষ হতাহত হয়। অন্যান্য শহর থেকেও সংঘর্ষের খবর আসতে থাকে। জেনারেল আযহারির নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার বিপ্লবী আন্দোলন স্তব্ধ করার লক্ষ্যে নৃশংসতার মাত্রা বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে, শাহের পতন নিশ্চিত বুঝতে পেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি ও বৃটেনের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানরা ক্যারিবিয়ান সাগরের পূর্বে অবস্থিত গুয়াদেলুপ দ্বীপে এক বৈঠকে বসে। সেখানে তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, বিপ্লবীদের আন্দোলনের কারণে শাহ আর টিকে থাকতে পারবে না,ফলে তাকে ক্ষমতা ছাড়তেই হবে। পাশাপাশি তারা এও বলে যে, ইমাম খোমেনী(রহ.)-র অনস্বীকার্য অবস্থানের কারণে তার সাথে আলোচনায় যাওয়াটাই মঙ্গলজনক হবে।
এই বৈঠকের একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেদেশের নৌবাহিনীর তৎকালীন উপ-প্রধান রবার্ট হাইযারকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে ইরানে প্রেরণ করে। ইরানের সেনাবাহিনীকে সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত করাই ছিল তার প্রধান দায়িত্ব। গুয়াদেলুপ দ্বীপে ইরান সম্পর্কে বৈঠক এবং সেনা অভ্যুত্থানের জন্য নৌ কর্মকর্তাকে তেহরানে প্রেরণের ঘটনা, ইরানের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের স্পষ্ট প্রমাণ। বৃটেনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শাহ সরকারের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল এবং শাহ মার্কিন ইঙ্গিত ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্তই গ্রহণ করতো না।
শাহ বহু বার প্রকাশ্যেই মার্কিন নীতি অনুসরণের কথা বলেছেন। মার্কিন নীতি বাস্তবায়ন করতে যেয়ে শাহ জনগণের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টিকে সব সময় উপেক্ষা করেছেন। ইরানে মহান বিপ্লব সফল হবার এটিও ছিল একটি কারণ। ইরানি জনগণ সব সময় স্বৈরাচারী শাহকে হঠিয়ে জনকল্যাণমুখী সরকারের হাতে দেশের পরিচালনাভার হস্তান্তরের চেষ্টা করে আসছিল। ইসলামী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাদের সে প্রত্যাশা পূর্ণ হয়।