ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সময়কার কিছু খণ্ডচিত্র-৮ (স্লাইডশো)
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i32521-ইরানের_ইসলামি_বিপ্লবের_সময়কার_কিছু_খণ্ডচিত্র_৮_(স্লাইডশো)
বিপ্লব বিজয়ের সময় ঘনিয়ে আসার সাথে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। আশুরার মিছিলে ৪০ লক্ষাধিক মানুষের অংশগ্রহণের কারণে হতভম্ব শাহ ও মার্কিন সরকার এটা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, সহিংসতা চালিয়ে আর কোন লাভ হবেনা বরং তা বিপ্লবের বিজয়কেই আরও ত্বরান্বিত করবে। এ অবস্থায় শাহ এমন একজনকে প্রধানমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত নেন,যিনি সবার কাছেই কিছুটা হলেও গ্রহণযোগ্য হবেন।
(last modified 2026-03-14T11:23:49+00:00 )
ফেব্রুয়ারি ০৭, ২০১৭ ১৩:০৮ Asia/Dhaka

বিপ্লব বিজয়ের সময় ঘনিয়ে আসার সাথে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। আশুরার মিছিলে ৪০ লক্ষাধিক মানুষের অংশগ্রহণের কারণে হতভম্ব শাহ ও মার্কিন সরকার এটা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, সহিংসতা চালিয়ে আর কোন লাভ হবেনা বরং তা বিপ্লবের বিজয়কেই আরও ত্বরান্বিত করবে। এ অবস্থায় শাহ এমন একজনকে প্রধানমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত নেন,যিনি সবার কাছেই কিছুটা হলেও গ্রহণযোগ্য হবেন।

ইমাম খোমেনী শাহের এ সিদ্ধান্তের পেছনের অশুভ উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হন এবং স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, যে ব্যক্তিই শাহের সাথে সাক্ষাত করবে, গোটা ইরানি জাতি তাকে প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু অবশেষে ১৯৭৯ সালের ছয়ই জানুয়ারি শাহপুর বাখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করতে রাজী হন এবং সবাইকে এ প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি দূর্নীতির মোকাবেলা করবেন ও জনগণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবেন। শাহপুর বাখতিয়ার এমন সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন যখন দেশের বেশীর ভাগ অঞ্চলই বিপ্লবীরা নিয়ন্ত্রণ করছিল। ইমাম খোমেনী (রহ.)-ও এক ঘোষণায় বাখতিয়ারের সরকারকে অবৈধ হিসেবে অভিহিত করেন এবং ঐ সরকারের সাথে কোন ধরনের সহযোগিতা না করতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

ইমাম খোমেনী (রহ.) ১২ জানুয়ারি বিশিষ্ট আলেম ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে ইসলামী বিপ্লবী পরিষদ গঠন করেন,যাতে অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা যেতে পারে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের অংশগ্রহণে পূর্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে অনুগত একটি পরিষদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে ১৩ ই জানুয়ারি রাজতান্ত্রিক পরিষদ গঠন করে। পাশাপাশি মার্কিন বিশেষ প্রতিনিধিও ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে শাহকে দেশ ত্যাগে রাজি করাতে সক্ষম হন। শাহকে বোঝানো হয়, রাজতন্ত্র ও মার্কিন স্বার্থে আপাতত তার দেশ ত্যাগ করা উচিত।

এ অবস্থায় শাহ ১৬ জানুয়ারি মিশর চলে যান। এর ফলে গোটা ইরানে আনন্দের জোয়ার বইয়ে যায়। এ উপলক্ষ্যে জনতা একে অপরকে মিষ্টি খাইয়ে উৎসব পালন করে। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের স্কোয়ারগুলো থেকে শাহের মূর্তি নামিয়ে ফেলা হয়। সে সময় ইমাম খোমেনী (রহ.) এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানি জাতিকে এটা বুঝতে হবে শাহের দেশত্যাগ মানেই বিজয় নয়। তবে তা বিজয়ের পথে অগ্রগতি।

শাহের দেশত্যাগের পর তার ঘনিষ্ঠজন ও আত্মীয় স্বজনদের মধ্যেও দেশত্যাগের হিড়িক পড়ে যায় এবং তারা সাথে করে বিপুল অর্থ-কড়ি নিয়ে বিদেশ চলে যায়। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক প্রতিবেদনে বলেছিল, সে সময় প্রায় এক হাজার তিন'শ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। যাইহোক শাহের দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে ৫৩ বছরের পাহলাভি রাজতন্ত্রের পতন যে অনিবার্য,তা সবাই উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাল না ছেড়ে ইরানের সেনাবাহিনীকে সেনা অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত করে। কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি।

১৯৭৯ সালের ১৯  জানুয়ারি। ইমাম হোসেন (আ:)-র শাহাদাতের চেহলাম বার্ষিকী। সেনা অভ্যুত্থানের গুজবকে গুরুত্ব না দিয়ে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ঐ দিনের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের পর একটি ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। ঐ ইশতেহারে স্বৈরাচারী শাহের রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও প্রধানমন্ত্রী শাপুর বাখতিয়ারের নেতৃত্বাধীন সরকারকে অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়। ইমাম খোমেনী (রহ.) ঐ বিক্ষোভ মিছিলের পর এক বার্তায় জানান যে, তিনি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই দেশে ফিরে আসবেন। পাশাপাশি তিনি ইরানের সংসদ ও রাজতান্ত্রিক পরিষদের সদস্যদের পদত্যাগের আহ্বান জানান।

ইমাম খোমেনী(রহ.)-র স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘোষণার পর প্রতিটি মুহূর্তই আরও ঘটনাবহুল হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন শহরে প্রতিদিনই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হতে থাকে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বিপ্লবীদের হতাহত হবার খবর প্রকাশ হতে থাকে। আর এ পর্যায়ে এসে সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীতেও শাহের বিরোধিতা বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৯ সালের ২০ শে জানুয়ারি দক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাস বিমান ঘাটির বেশ কিছু অফিসার ও সদস্য, বিপ্লবীদের সাথে যোগ দেয়। তাদের পথ ধরেই আরও অনেকে জনগণের পাশে এস দাড়ায়। পাশাপাশি কিছু বিপ্লবী সেনা সদস্যকে আটক ও তাদেরকে মৃত্যুদন্ড দেয়ার খবরও প্রকাশিত হয়।

অন্যদিকে, শাহের অনুপস্থিতিতে দেশ পরিচালনার জন্য গঠিত রাজতান্ত্রিক পরিষদের প্রধান সাইয়্যেদ জালাল উদ্দিন তেহরানি, ইমাম খোমেনী (রহ.)-র সাথে সাক্ষাত করতে ফ্রান্সে যান। ইমাম তার সাথে সাক্ষাত করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি এর আগেই ঘোষণা করেছিলেন যে, শাহী সরকারের কর্মকর্তাদের সাথে তিনি তখনি কেবল সাক্ষাত করবেন যখন তারা তাদের পদ থেকে সরে দাড়াবে। ইমাম খোমেনী(রহ.), সাইয়্যেদ জালাল উদ্দিন তেহরানিকেও পদত্যাগ ও রাজতান্ত্রিক পরিষদ বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিতে বলেন। জালাল উদ্দিন তেহরানি রাজতন্ত্রের পতন অনিবার্য দেখে ইমামের কথা অনুযায়ী পদত্যাগ করেন এবং ইমামের সাথে সাক্ষাতের অনুমতি লাভ করেন।

ইমাম খোমেনী দেশে ফিরবেন, এ খবর বিপ্লবীদের মনোবল চাঙ্গা করলেও শাহ সরকার ও তার দোসররা উদ্বেলিত হয়ে পড়ে। তারা জানতো ইমাম ইরানে প্রবেশ করার সাথে সাথে চূড়ান্ত বিজয়ের পথে যাত্রা আরও ত্বরান্বিত হবে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শাপুর বাখতিয়ার দেশের সকল বিমানবন্দর বন্ধ করে দেয় এবং তেহরানের মেহরাবাদ বিমান বন্দরে ভারী অস্ত্র মোতায়েন করে। ইমামকে অভ্যর্থনা জানাতে যেসব ইরানি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল,তারা এ পদক্ষেপের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী বাখতিয়ার জনগণের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রমাণ করার লক্ষ্যে প্যারিসে ইমাম খোমেনী (রহ.)-র সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছে ব্যক্ত করে। কিন্তু ইমাম ঘোষনা করেন, বাখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাড়ালেই কেবল তার সাথে বৈঠক হতে পারে। এ অবস্থার মধ্যে স্বৈরাচারী শাহ ও প্রধানমন্ত্রী বাখতিয়ারের পক্ষে খুব অল্প সংখ্যক মানুষ মিছিল বের করে। এই মিছিল থেকেই আরেকবার প্রমাণিত হয় যে, ইরানের মাত্র হাতে গোনা কিছু মানুষ শাহকে সমর্থন করছে, বাকী সবাই তার পতন চাচ্ছে।