ট্রাম্পের হুমকিতে ইরানের অগ্রগতি থামবে না: বেলায়েতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান খানের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা।
বিশেষ করে বিপ্লবের চার দশকে ইরান কতোটা উন্নতি করলো, কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করলো সেসব নিয়ে গবেষণাধর্মী বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরছিলেন তিনি। গত পর্বে আমরা জেনেছি যে ইরান জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অসামান্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আমেরিকা এবং ইসরাইলসহ তাদের মিত্ররা যে ইরানের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে তার কারণ আর কিছু নয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র এবং ইরানের উন্নয়ন। বিশেষ করে বিশ্বের হাতে গোণা মাত্র কয়েকটি দেশ পরমাণু প্রযুক্তির মতো উন্নত প্রযুক্তি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এই ক্ষেত্রে ইরানও এখন গর্বিত অংশীদার। এটা শত্রুদের কোনোভাবেই সহ্য হচ্ছে না। আজকের পর্বে আমরা এ নিয়েই আলোচনার সূত্রপাত করবো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই ব্যাপক হুমকি-ধমকি দিয়ে ইরানের সামরিক অগ্রগতি থামাতে চেয়েছিল। বিষয়টাকে খুবই হাস্যকরভাবে নিয়েছে ইরান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী আকবর বেলায়েতি বলেছেন, ট্রাম্প এসব করে ইরানের অগ্রগতি থামাতে পারবে না। মার্কিন প্রশাসনের এসব হুমকিকে ইরান মোটেই তোয়াক্কা করে না বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ব্যাপারে নতুন কোনো অবস্থান নেন নি। তিনি তার পূর্বসুরীদের ইরান বিদ্বেষী নীতিরই অনুসরণ করছেন মাত্র। তবে পূর্বসূরীদের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শত্রুতায় পদ্ধতিগত পার্থক্য রয়েছে। বেলায়েতির দৃঢ় মনোবল ব্যাপক আশার সঞ্চারক। একইসঙ্গে জেসিপিওএর প্রতি ইউরোপের সমর্থন ও সমঝোতার ওপর অটল থেকে কাজ করে যাবার অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরে ড. সিদ্দিকও একই আশার কথা বললেন:
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম কাসেমিও দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতি রোধ করা সম্ভব নয় আমেরিকার পক্ষে। ইরানের বৈজ্ঞানিক উন্নতি প্রতিহত করার লক্ষ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপের যে খেলা মার্কিন সরকার শুরু করেছে নিঃসন্দেহে তা থেকে কোনো উপকার পাবে না ওয়াশিংটন। এই যে দৃঢ় প্রত্যয় ইরানি কর্মকর্তাদের তা কিন্তু কেবল বুলি আওড়ানো নয়,তার পেছনে রয়েছে বিশাল প্রস্তুতি। ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান আলী আকবর সালেহি বলেছেন,বিশ্বের পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো তেহরানের সঙ্গে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। সালেহি আরও বলেছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও ইরানের পরমাণু খাতে ব্যাপক পুঁজি বিনিয়োগ করতে চায়। কোনো কোনো দেশ পরমাণু-বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ভূমিকা রাখতে চায়। এমনকি স্বয়ং আমেরিকাও পরমাণু সমঝোতা অনুযায়ী আরাক রি-অ্যাক্টর সংস্কারের বিষয়ে কারিগরী সহযোগিতা করবে।
আপনারা জানেন যে ১০ নভেম্বর 'আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জাদুঘর ও বিজ্ঞান-কেন্দ্র দিবস' পালন করা হয় বিশ্বজুড়ে। ইরান কেবল এই দিবস পালন করেই ক্ষান্ত হয় নি বরং তার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক জাদুঘরও প্রতিষ্ঠা করেছে ইরান। এখন থেকে প্রায় অর্ধযুগ আগেই এই জাদুঘরের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিজ্ঞানের নানা মূল ভিত্তি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি তুলে ধরে বৈজ্ঞানিক ভাবনার বিকাশ ঘটানো এবং জীবনমানের উন্নয়ন ও চেতনার বিকাশ এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য। ইসলামী ও ইসলাম-পূর্ব যুগের ইরানি বিজ্ঞানীদের নানা উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি সমসাময়িক যুগের নানা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও মৌলিক সূত্র তুলে ধরাও এ জাদুঘরের অন্যতম লক্ষ্য। সুতরাং যে জাতি বিজ্ঞান ও নতুন নতুন উদ্ভাবনীর ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রেখেছে এবং রেখে যাচ্ছে,সেই জাতিকে দমিয়ে রাখা যাবে কী করে। ড.বেলায়েতি বলেছেন,দৃশ্যত ইরান বিরোধী নিষেধাজ্ঞা অনুমোদন ছাড়া মার্কিন কংগ্রেস ও সিনেটের অন্য কোনো কাজ নেই। ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব নিষেধাজ্ঞা একেবারেই নিষ্ফল। এসব করে ইরানের অগ্রগতি বন্ধ করতে পারবে না কেউ।
বহু ক্ষেত্রে ইরান অগ্রগতি অর্জন করেছে, সেকথা আমরা আগেও বলেছি। বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইরানের অর্জন অবাক করার মতো। যেমনটি বললেন ড. সিদ্দিকুর রহমান খান।
ক্যান্সার চিকিৎসাসহ দুরারোগ্য বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ইরানের অগ্রগতির কথা শুনলেন আপনারা। বিশেষ করে চিকিৎসা ও মেডিসিনের ক্ষেত্রে ন্যানো টেকনোলজির ব্যবহারসহ মেডিক্যাল ট্যুরিজমের কথাও বললেন ড. সিদ্দিক। মেডিক্যাল ট্যুরিজমের ফলে এখন উন্নত অনেক দেশের রোগীও আসছে ইরানে। কেন তাহলে ইরানের বিরোধিতা? এইসব অগ্রগতি, ইসলামের শক্তি এবং বিপ্লবের শক্তি,জনগণের মধ্যকার ঐক্য ইত্যাদি। এ কারণেই তারা ভয় পায়। এ কারণেই তারা বিপ্লব ও ইসলামী শক্তিকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করছে। যেমনটি বললেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী:
"ইসলামি শক্তি এবং বিপ্লবের শক্তিকে তারা ভয় পায়। সেজন্যই তারা চেষ্টা করছে শক্তির মূল উৎসকে বিনাশ করতে, নিশ্চিহ্ন করতে। আমাদের শক্তির উৎসগুলো কী? রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক নিরাপত্তা, জাতীয় ঐক্য, বিপ্লবী নীতিমালার প্রতি আনুগত্য, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, ইসলামি বিপ্লবী সংস্কৃতির বিকাশ উন্নয়ন ও এর গভীরতা। এসবেরই বিরোধী তারা। অবশ্য, তারা আমাদের সামরিক অগ্রগতিরও বিরোধী, আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের বিরোধী, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে আমাদের উপস্থিতির বিরোধী। কেননা এগুলোও আমাদের শক্তির উপাদান"।
বিপ্লবের এই নেতা আরও বলেছেন:
আমেরিকার সঙ্গে আমাদের সংকটটা মৌলিক। এটা সমাধানযোগ্য নয়। যতদিন দ্বীনী শাসন ব্যবস্থা বিশেষ করে ইসলামি শাসন ব্যব স্থা থাকবে ততদিন ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সংকট মিটবে না। আমেরিকার সঙ্গে সমস্যাটা এখানেই। তারা চায় বিপ্লবের আগের ইরানের অবস্থায়,ইসলামি শাসনব্যবস্থার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে। সেটা তো অবাস্তব, সম্ভব না"।
মূলত সে কারণেই তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে নিরন্তর লেগে আছে। যাই হোক বন্ধুরা!আসর গুটাতে হবে। শেষ করার আগে একটি কথা বলে রাখি। তাহলো ইরানের জনগণ সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সভ্যতার অধিকারী। তারা যে-কোনো চাপ মোকাবিলা করতে জানে। বর্তমান পরিস্থিতিও ইরান কেটে উঠবে-এই দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেই সমাপ্তি টানছি আজকের পর্বের। #
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/১৭
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন