শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর
তৃতীয় আরোপিত যুদ্ধে ইরানের জনগণই চূড়ান্ত বিজয়ী: মুজতাবা খামেনেয়ী
-
আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা হুসাইনি খামেনেয়ী
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা হুসাইনি খামেনেয়ী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে চলমান ‘তৃতীয় আরোপিত যুদ্ধে’ ইরানের জনগণই চূড়ান্ত বিজয়ী। তিনি এই বিজয়কে জনগণের অংশগ্রহণ, ত্যাগ এবং ঈমানের ফল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আজ (বৃহস্পতিবার) ইসলামি বিপ্লবের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর শাহাদাতের ৪০তম দিবস বা চেহলাম উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় তিনি এসব কথা বলেন।
সাইয়্যেদ মুজতাবা খামেনেয়ী বলেন, “এই সংগ্রামের এই পর্যায়ে নির্দ্বিধায় বলা যায়—বীর ইরানি জাতি এই ময়দানের নিরঙ্কুশ বিজয়ী। এটি নিঃসন্দেহে একটি আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামত, যা আমাদের শহীদ নেতার রক্ত, অন্যান্য শহীদদের ত্যাগ, নির্যাতিত জনগণের কষ্ট এবং মিনাবের পবিত্র বৃক্ষতলে ঝরে পড়া শহীদদের রক্তের বরকতে অর্জিত হয়েছে। মানুষের দোয়া, প্রার্থনা, রাস্তায় উপস্থিতি, মসজিদ ও মহল্লায় সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নিঃস্বার্থ ত্যাগের মাধ্যমেই এই নিয়ামত অর্জিত হয়েছে।”
তিনি বলেন, “এই নিয়ামতের স্থায়িত্ব ও বিকাশ নিশ্চিত করতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা জরুরি, আর সেই কৃতজ্ঞতার বাস্তব প্রকাশ হলো একটি শক্তিশালী ইরান গড়ে তোলার নিরলস প্রচেষ্টা।”
সর্বোচ্চ নেতা উল্লেখ করেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখন একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পতন দৃশ্যমান।”
জনসমাগম অব্যাহত রাখার আহ্বান
আয়াতুল্লাহ মুজতাবা খামেনেয়ী গত ৪০ দিনের মতো জনগণের রাস্তায় উপস্থিতি অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেন। তার ভাষায়, “শহীদ নেতার নির্ধারিত কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য এখন সবচেয়ে প্রয়োজন—গত ৪০ দিনের মতো জনগণের ধারাবাহিক উপস্থিতি। এই উপস্থিতিই আজকের শক্তিশালী ইরানের অন্যতম ভিত্তি। যদি আমরা সামরিক নীরবতার পর্যায়ে প্রবেশ করেও থাকি, তবুও প্রত্যেক সক্ষম নাগরিকের দায়িত্ব হলো রাস্তায়, মহল্লায় ও মসজিদে তাদের উপস্থিতি আরও জোরদার করা।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “শত্রুর সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনা শুরু হলেও জনগণের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি যদি সামরিক নীরবতার পর্যায়েও প্রবেশ করা হয়, তবুও জনগণের উপস্থিতি আরও জোরদার করা উচিত।”
ঐক্যই শক্তিশালী ইরানের পথ
নেতা জাতীয় ঐক্যকে ‘ভবিষ্যৎ শক্তির প্রধান ভিত্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, গত ৪০ দিনে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে দূরত্ব কমেছে এবং মানুষ এক পতাকার নিচে একত্রিত হয়েছে।
তার মতে, “শক্তিশালী ইরান গড়ার একমাত্র পথ হলো সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা।”
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আল্লাহর ইচ্ছায়, এই অবদান অব্যাহত থাকলে ইরানি জাতির সামনে সম্মান, মর্যাদা ও সমৃদ্ধিতে ভরা এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।”
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অতীত পথচলা তুলে ধরে তিনি বলেন, “যখন আমাদের শহীদ নেতা (সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী) দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ছিল একটি নবীন চারা গাছ, যা শত্রুর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ছিল, তবুও টিকে ছিল। কিন্তু প্রায় ৩৭ বছর পর, তার বিদায়ের সময় সেই গাছটি হয়ে উঠেছিল এক শক্তিশালী বৃক্ষ—যার শিকড় গভীর এবং যার ছায়া অঞ্চল ও বিশ্বের বিস্তীর্ণ অংশে বিস্তৃত।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, শক্তিশালী ইরান গঠনের পথ হলো জাতীয় ঐক্য।
প্রতিবেশীদের উদ্দেশে বার্তা
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রতিবেশীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনারা একটি অলৌকিক বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করছেন। তাই সঠিকভাবে দেখুন, বুঝুন এবং শয়তানের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি থেকে সাবধান থাকুন। আমরা এখনো আপনাদের কাছ থেকে যথাযথ প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় আছি, যাতে আমরা ভ্রাতৃত্ব ও সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে পারি।”
তিনি বলেন, “অহংকারী শক্তিগুলো থেকে দূরে না থাকলে এটি সম্ভব নয়—যারা সবসময় আপনাদের অপমান ও শোষণ করে। এটি সবার জানা উচিত-যারা আমাদের দেশে আক্রমণ করেছে, তাদের আমরা বিনা শাস্তিতে ছেড়ে দেব না।”
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, প্রতিটি ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করা হবে এবং শহীদদের রক্ত ও আহতদের কষ্টের বিচার নিশ্চিত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, “আমরা যুদ্ধ চাই না, কখনো চাইনি। কিন্তু আমাদের ন্যায্য দাবি থেকে আমরা সরে যাব না। আমাদের সব সিদ্ধান্তে প্রতিরোধ ফ্রন্টকে বিবেচনায় রাখা হবে।”
মিডিয়া সতর্কতা ও অভ্যন্তরীণ সংহতি
জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যুদ্ধজনিত সংকট মোকাবিলায় একে অপরকে সহায়তা করতে হবে। পাশাপাশি শত্রুপক্ষের প্রভাবিত মিডিয়া থেকে সতর্ক থাকারও পরামর্শ দেন।
তার ভাষায়, “যেসব মিডিয়া শত্রুর নিয়ন্ত্রণে বা তাদের স্বার্থে কাজ করে, তারা কখনোই দেশের মঙ্গল চায় না। তাই সেগুলো থেকে দূরে থাকা বা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করা জরুরি।”
তিনি শত্রুপক্ষের প্রচারণা থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমাদের মন ও চিন্তার জানালা এবং আমাদের কানকে শত্রুনিয়ন্ত্রিত বা তাদের সমর্থিত গণমাধ্যম থেকে রক্ষা করতে হবে। এসব গণমাধ্যম আমাদের দেশের মঙ্গল চায় না। তাই এগুলো থেকে দূরে থাকুন অথবা চরম সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করুন।”
বার্তার শেষাংশে মুজতাবা খামেনেয়ী বলেন, “শহীদ নেতার আনুষ্ঠানিক শোকানুষ্ঠান শেষ হলেও, শহীদদের রক্তের প্রতিশোধের দৃঢ় অঙ্গীকার জনগণের হৃদয়ে জীবিত রয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।#
পার্সটুডে/এমএআর/৯