রেডিও তেহরানের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
রাহবারের ছবি তোলার আমার ঈদের দিনটি: সৈয়দ মূসা রেজা
-
তেহরানের জুমার নামাযে ইমামতি করছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী
১৯৯৮ সালের ঈদ-উল-ফিতরের দিনটি ছিল শুক্রবার। ফেব্রুয়ারি মাস। হাওয়ায় তখনও শীতের কামড় বহাল তবিয়তেই রয়েছে তেহরানে। রেডিও তেহরানে যোগ দিয়েছি জুলাই মাসে। ইরানে আসার এক বছরও পুরা হয়নি।
মোসাল্লায় ইমাম খোমেনি (রহ) ঈদের নামাজ পড়তে যাব। এটা কিভাবে ঠিক করেছিলাম মনে নেই। সাজমানে বারনামে জুনুবির সেদা ও সিমার ‘কলোনি’, বেহসাত থেকে বের হয়ে দুই পা বাড়ালেই ট্যাক্সি স্ট্যান্ড। সেখান থেকে খেয়া-ট্যাক্সি করে সাদেকিয়াতে যাই ভোরে। তেহরানে তখন দুই ধরণের ট্যাক্সি মিলত। একটা নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাতায়াত করত খেয়া-ট্যাক্সি। দেশের নদীপারের খেয়া নৌকার মতো। আর ছিল তুলনামূলক দামি টেলিফোন ট্যাক্সি।
সাদেকিয়াতে পৌঁছালাম তখনো কুয়াশা ঢাকা ভোর। ঘড়ি তখনো ৭টার ঘরে যায়নি। আমি একা নই। মুজাহিদ এবং সোহেল ছিল, যদি স্মৃতি ভুল না করে। সেখান থেকে বাসে মোসাল্লায় গেলাম। সাদেকিয়া থেকে মোসাল্লায় নারী-পুরুষদেরকে নেওয়ার জন্য অনেক বাস ছিল। তেহরানের বিভিন্ন প্রান্তে এ ভাবে বাস দেওয়া হয় ঈদের নামাজে যাতায়াতের জন্য। এ বাসে টিকেট লাগে না।
১৯৯০ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে সেখানেই গেছি সাথী হয়েছে ক্যামেরা। নাকইন এফএম ২। লেন্স ৫৫ ম্যাক্রো নিক্কর ২.৮। ক্যামেরাটা এখনও আছে। আছে লেন্সটা। কাজ করে ডিজিটাল ক্যামেরায়ও। একটু ঝামেলা হয়। তবে ছবি খারাপ আসে না। ক্যামেরাটাও আছে। কিন্তু ফিল্ম প্রায় অ-চল হয়েই গেছে। ব্যবহার করার ইচ্ছা থাকলেও সম্ভব নয়। সেদিন ঈদের জামায়াতে যাওয়ার সময়ও ক্যামেরার ব্যাগ কাঁধেই ছিল।
আমাকে কেউ আগে বলে দেয়নি যে ক্যামেরা নিয়ে ঢোকা যাবে না বা ঢুকতে ঝামেলা হবে। নতুন দেশে কাজ করতে গেলে ওরিয়েন্টশনের একটা ব্যবস্থা থাকে। কী করা যাবে বা করা যাবে না- তা বিশদভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। রেডিও তেহরানে তখনও এমন কিছুর বালাই ছিল না। তবে তাতে সেই ঈদের দিনে, শাপে বর হয়েছে। তথ্য না জানায় বা জানানোয় কখনো কখনো ‘বরে’ শাপ হয়েছে। সর্পিল সে সব কথা ভবিষ্যতের খাতায় জমা থাক। ‘যে ছাগল মরে গেছে তাকে মরে যেতে দাও, কেন তার চামড়া তুলে নাও’ সাবেক সহকর্মীর ইচ্ছাকৃত বেসুরা ঢংয়ের গানের সুর ভাজতে ভাজতে বরং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সেই ঈদের দিনের ঘটনায় ফিরি।
মোসাল্লায় ঢোকার মুখে তল্লাশি হচ্ছে। ক্যামেরা দেখেই নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্ব নিযুক্তরা জানিয়ে দিল, না এখান দিয়ে ঢুকতে দেওয়া হবে না। দেখিয়ে দিল কোন্ প্রবেশ দ্বারে যেতে হবে।
ঈদের জামায়াতে ইমামতি করবেন রাহবার। সেখানে ক্যামেরা নিয়ে ঢোকা সহজ হবে না। ঢাকায় প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান বিশ্বাস এসেছিলেন বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির (বিপিএস) অনুষ্ঠানে। বিপিএস সদস্য হিসেবে সেখানে টুকটাক ছবি তুলে ছিলাম। আলোকচিত্রীদের সংগঠন হওয়ায় অনুষ্ঠান ছিল ‘ক্যামেরাময়।’ এক একজনের কাছে একাধিক ক্যামেরা এবং সবাই ছবি তুলতে ব্যস্ত। নিজের ছবি উঠল কী উঠল না তা নিয়ে গরজ নেই কারো! হাড়ের ভেতরে যাদের আলোকচিত্র স্থান করে নিয়েছে, হৃদয়ে শিল্প শিকড় মেলে দিয়েছে একমাত্র তাদের মধ্যেই নিজ ছবি তোলার অন্তহীন অনীহা পাখনা মেলে। না হলে, ফাঁক তালে নিজ শাখামৃগ চেহারাকে লেন্সের সামনে মেলে ধরতে সর্ব শরীর চালাতে বা কনুই মেরে এগিয়ে যেতে দ্বিধাহীন থাকে অনেক বিকারবিহীন বিকৃত আত্মপ্রেমে দেওয়ানা চিত্ত।
এরকম গুঁতোর মুখে প্রথম পড়ি তৎকালীন ফার্স্টলেডি রওশন এরশাদের এক অনুষ্ঠানের ছবি তোলার সময়। আধা সরকারি সংস্থা আয়োজিত হোটেল সোনার গাঁওয়ের সে গোটা অনুষ্ঠানের ছবি তুলতে হয়েছিল আমাকে।
প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং রওশন এরশাদের অনুষ্ঠানে ছবি তোলার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিত্বদের ছবি তোলার হাতে খড়ি হয় ভালোভাবে।

এমন অনুষ্ঠানে ছবি তুলতে যাওয়ার আগে অনেক হাঙ্গামা পোহাতে হয়। নিরাপত্তার বেড়া বাইতে হয়। কিন্তু সেদিনের ঈদ-উল-ফিতরের ময়দানে ওসব ছাড়াই গিয়েছিলাম। দুরু দুরু বুকে প্রবেশদ্বারের কাছে যেয়ে দাঁড়ালাম। দেখালাম রেডিওর কার্ড। কাজ হলো না। হওয়ার কথাও না। প্রায় পত্র পাঠ বিদায়!
অনুনয় করলাম। তাও কাজ হলো না। এর মধ্যে ইংরেজি জানা এক কর্তাব্যক্তিকে পেলাম। তিনিও প্রথমেই না বললেন। এখানেই ভাগ্য হেসে উঠল।
আরবি টিভির এক সহকর্মীর সাথে বিশ্ব কার্যক্রমের দফতরে মাঝে মাঝে দেখা হয়। দেখা হয় খাওয়ার ঘরেও। পেটা শরীর। মুখে উদার হাসি। কখনোই তাকে মুখে দেখেনি বিষণ্ণতার ম্লান কুয়াশা। তিনি পদে ভারি কোনো কর্তা নন। খেটে খাওয়া কর্মী। আরবি এবং ফারসি ছাড়া আর কোনো ভাষা তিনি জানেন না। আর আমার ফার্সি তখন পুরো বাক্য নয় বরং কিছু শব্দে সীমিত।
একটু সময় লাগল তার ব্যাপারটা বুঝতে। তারপর তিনি বুলন্দ গলায় সুপারিশে নামলেন। ‘হামকারে মা’ (আমাদের সহকর্মী) আঙ্গুল দিয়ে ঈশারা করতে করতে এ কথা বারবার বলছেন। আর সাথে সাথে নিজের বুকে হাত ঢুকছেন। সে সময় ‘মাসুলিয়াত’ (দায়িত্ব) জাতীয় শব্দ শুনেছি বলে হলো। ভদ্রলোক চড়া স্বরে কথা বলে চলেছেন। ইরানিরা সাধারণভাবে মৃদুভাষী। সে তুলনায় আমরা বা আরবি লোকজন স্বর চড়িয়ে কথা বলি। এ দলে আমি নিজেকে বরাবর ‘রাসভ কণ্ঠের’ গুচ্ছেই হিসাব করি। যাকগে, ওখানে সেদিন অবশ্য আমি অতিশয় মিন মিন করছিলাম। তীব্র শীত। আর মন খারাপ। দুইয়ের যোগফলে স্বর ভেজা মুড়ির মতো হয়ত উদিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আরবি ভদ্রলোকের গলা অনেকদূর যাচ্ছিল। কী সব বলছেন বুঝতে পারলাম না। আমার ধারণা, ভদ্রলোক নিজেকে আমার গ্যারান্টার হিসেবে পেশ করছেন।
তাতেই, হয়ত, ‘চিঁড়া ভিজল।’ কর্তা ব্যক্তি আরবি টিভির ভদ্রলোককে থামালেন। নিজে একটু দূরে গেলেন। মনে হলো, ওয়াকিটকিতে কোথাও কথা বললেন। ফিরে এসে হাসি মুখে আমার ব্যাগকে স্ক্যানারে দিতে বললেন। আমার কার্ডটা নিলেন। আর আমাকে দিলেন ‘আক্কাস’ (আলোকচিত্রী) লেখা একটা কার্ড। সেটা গলায় ঝোলাতে হলো। সাথে ধাতব কিছু আছে কিনা জানতে চাইলেন। আর ক্যামেরার শাটার একবার টিপতে বললেন। নিরাপত্তার এই পর্বের ছক আমার অপরিচিত নয়।
দশটা ঈদের ফুর্তিতে মনটা মাতোয়ারা হয়ে উঠল। রাহবারের ছবি তোলার সুযোগ পাওয়াকে জীবনের বিশেষ ঘটনা না বললে কোন্ ঘটনাকে বিশেষ অভিধায় চিহ্নিত করবো! খানিকটা হেঁটে ঢুকলাম। দেখলাম একটা কনটেইনারের উপর দাঁড়িয়ে অনেক আলোকচিত্রী। অবিরাম শাটারের ছন্দ বেজে চলেছে। সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত। উঠলাম উপরে। ঈদগা প্রায় পুরোটাই দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। দলে দলে নারী-পুরুষ তখনো আসছে। নারীদের নামাজের স্থান আলাদা। মাঝে পর্দা দেওয়া আছে। আমার কাছে কোনো জুম বা টেলিফটো লেন্স না থাকায় সে সব ছবি যুতসই হয়নি। এর মধ্যে নিরাপত্তার দায়িত্ব নিযুক্ত ব্যক্তিরা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিলেন, রাহবারের হেলিকপ্টার নামা ও ওঠার সময় কোনোভাবেই ছবি তোলা যাবে না। কনটেইনারের চারধারে দশাসই চেহারার চার নিরাপত্তা কর্তা দাঁড়িয়ে রইলেন।
রাহবারের হেলিকপ্টার নামল। দেখলাম। তারপরই পুরো ঈদের জামায়াত ফেটে পড়ল শ্লোগানে। সে সময় কনটেইনার থেকে নিচে নামলাম। অন্য আলোকচিত্রীদের নামতে দেখে তাদের অনুসরণ করলাম অনভিক্ত আমি।
এবারে মুসল্লিদের অনেক কাছাকাছি চলে এলাম। এখান দিয়ে জামায়াতে সামিল হওয়ার একটা দ্বার আছে। পদস্থ কর্তা ব্যক্তিরা এখান দিয়ে ঢুকছেন।
রাহবার এসে দাঁড়ালেন উঁচু মঞ্চে। শ্লোগান তখনো চলছে। রাহবার হাত নেড়ে ‘মামনুনাম’ (ধন্যবাদ) বার কয়েক বলার পর থামল শ্লোগান।
জুম বা টেলিফটো লেন্সের অভাবে এখান থেকেও রাহবারের ছবি তুলে সুবিধা হলো না। সাধারণভাবে ১০০ আইএসও’র ফিল্ম ব্যবহার চল থাকলেও বহুদিন ওই ফিল্ম ব্যবহার করিনি। ক্যামেরায় ৪০০ আইএসও ফুজি ফিল্ম ব্যবহার করেছি। সেদিন এ ফিল্ম ব্যবহারের ফজিলত হাতে হাতেই পেলাম। মেঘাচ্ছন্ন দিন থাকায় শাটারের গতি আর এফ স্টপ সুবিধার জায়গায় রাখতে পারলাম এ কারণেই।
ইমামতির জন্য রাহবার নিচে নেমে এলেন। আমরা যে জায়গায় ছিলাম তার চেয়ে আট দশ ফুট নিচে ইমামতির স্থান। সেখানে যেতে হয় চিকন পথ ধরে। ঢোকার মুখে নিরাপত্তা বেশ জোরাল। সে সময় আলোকচিত্রীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি লেগে গেল। সবাই এক যোগে ঢুকে ছবি তোলার জন্য উদগ্রীব। মুখের কথায় কাজ হচ্ছে না দেখে নিরাপত্তার দায়িত্বের এক দশাসই কর্তা হালকাভাবে আলোকচিত্রীদের ধাক্কা দিলেন। আমাদের কাছে হালকা মনে হলেও দেখলাম টপাটপ কয়েকজন আলোকচিত্রী পড়ে গেল। ভাগ্যিস, আমি ছিলাম দূরে। বাঁচলাম ‘পপাত ধরণী তল’ হওয়ার হাত থেকে। এরপর আর ধাক্কাধাক্কি নেই। একবারে কয়েকজন করে আলোকচিত্রীকে ভেতরে যেতে দেওয়া হলো। ছবি তুলে চলে আসছে তারা। আমার পালা আসার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। বরং বলা ভালো অধীর হয়েই উঠলাম। তর সইছিল না।
রাহবার নামাজ শুরু করার পর আমি বেশ কাছ থেকে ছবি তোলার সুযোগ পেলাম। তুলতে হলো দ্রুত। ওখানে বেশি সময় থাকতে দেওয়া হয়নি কোনো আলোকচিত্রীকে।
এ দুটোই সেই ছবি।
লেখক: সাবেক সিনিয়র সাংবাদিক, রেডিও তেহরান বাংলা।
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৬