'কথাটি সত্য কি না, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়; কীভাবে তা বলা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ'
শুধু সত্য কথা বলাই যথেষ্ট নয়: কথা বলার আদব সম্পর্কে কুরআন
-
কথা বলার আদব সম্পর্কে কুরআন
পার্সটুডে: কুরআন শুধু কোনো কথা সত্য না মিথ্যা, তা যাচাই করে না; কথার ধরন, সম্মান, কোমলতা, প্রভাব এবং এমনকি কখন ও কীভাবে কথা বলা হচ্ছে—এসবও কুরআনের দৃষ্টিতে কথা বলার নৈতিকতার অংশ।
আমাদের জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মাত্র কয়েকটি শব্দ দিয়ে শুরু হয়। একটি বাক্য কাউকে শান্ত করতে পারে, কারও হৃদয় ভেঙে দিতে পারে, কোনো ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতে পারে, এমনকি একটি সাধারণ মতবিরোধকে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধে পরিণত করতে পারে। তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, কুরআন কথা বলার বিষয়ে এত গুরুত্ব ও সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে আলোচনা করেছে।
মজার বিষয় হলো, কুরআন শুধু এটাই বলে না যে, “মিথ্যা কথা বলো না” বা “ভালো কথা বলো।” একইসঙ্গে কথা বলার বিভিন্ন ধরন বোঝাতে আলাদা আলাদা শব্দ ও বাগধারা বা ভাব ব্যবহার করেছে। যেন কুরআন বলতে চায়—সঠিকভাবে কথা বলার মাত্র একটি বৈশিষ্ট্য নেই। পার্সটুডের এই প্রতিবেদনে আমরা এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির দিকে নজর দিয়েছি:
উদাহরণস্বরূপ, কুরআন (কওলান সাদীদা)-এর কথা বলা হয়েছে; অর্থাৎ সঠিক, দৃঢ় ও সুচিন্তিত কথা। এমন কথা, যা তাড়াহুড়ো বা আবেগের বশে বলা হয়নি। আজকের এমন এক সময়ে, যখন মানুষ খুব দ্রুত কোনো কিছু শোনে এবং সঙ্গে সঙ্গেই তা পুনঃপ্রচার করে, এই কথার তাৎপর্য হয়তো আরও বেশি।
অন্যত্র (কওলান মারুফা) বলা হয়েছে; অর্থাৎ শোভন ও গ্রহণযোগ্য কথা। এখানে শুধু কথাটি সত্য কি না, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়; কীভাবে তা বলা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কখনো আমাদের কথা সত্য হতে পারে, কিন্তু আমরা এমন সুরে তা বলতে পারি, যাতে সামনের মানুষটি অপমানিত বোধ করেন। মনে হয়, কুরআন এমন কথাকে ভালো কথা হিসেবে বিবেচনা করে না।
(কওলান কারিমা) বাক্যটি বিষয়টিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়; অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে কথা বলা। এই অভিব্যক্তি দেখায় যে, সম্মান শুধু বাহ্যিক আচরণের বিষয় নয়; মানুষের কথাবার্তাতেও তার প্রকাশ থাকা উচিত।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভাবভঙ্গি বা দৃষ্টিকোণের একটি হলো (কওলান লায়্যিনা); অর্থাৎ কোমল কথা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কথা বলার ক্ষেত্রে কোমলতার অর্থ নিজের অবস্থান বা মতামত পরিত্যাগ করা কিংবা দুর্বল হয়ে যাওয়া নয়। একজন মানুষ ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন, সমালোচনা করতে পারেন, এমনকি কঠিন কথাও বলতে পারেন; কিন্তু তারপরও তাঁর ভাষা রূঢ় বা অপমানজনক না-ও হতে পারে।
(কওলান মাইসুরা)-ও আরেকটি দৃষ্টিকোণ বা অভিব্যক্তি; অর্থাৎ সহজ, সান্ত্বনাদায়ক ও হৃদয়গ্রাহী কথা। অনেক সময় আমরা সত্যিই কারও সমস্যা সমাধান করতে পারি না, কিন্তু অন্তত এমনভাবে কথা বলতে পারি, যাতে তাঁর কষ্টের সঙ্গে আরও কষ্ট যোগ না হয়।
কুরআনে (কওলান বালিগা)-এর কথাও এসেছে; অর্থাৎ স্পষ্ট বা মোক্ষম তথা কার্যকর ও প্রভাবশালী কথা। সুতরাং কুরআনের দৃষ্টিতে ভালো কথা শুধু এমন কথা নয়, যা সত্য; একইসঙ্গে তা সঠিকভাবে পৌঁছে দেয়াও জরুরি। সম্ভবত এ কারণেই আল্লাতি হিয়া আহসানু «الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ» এবং কাওলান লিন্নাস হাসুনান «قُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا»-এর মতো অভিব্যক্তিও দেখা যায়; অর্থাৎ কথা বলতে হলে তা সর্বোত্তম পদ্ধতিতে বলা উচিত।
অন্যদিকে, ভুল ও অসত্য কথার ক্ষেত্রেও কুরআন বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করেছে।
«قَوْلَ الزُّورِ» (কওলাজ জুর) বলতে মিথ্যা ও বাতিল কথাকে বোঝানো হয়েছে। «الْإِفْك» (ইফক) এমন মিথ্যার কাছাকাছি, যা সত্যকে বিকৃত বা উল্টে উপস্থাপন করে। আর «بُهْتَان» (বুহতান) হলো এমন অপবাদ, যাতে এমন কোনো বিষয় কারও ওপর আরোপ করা হয়, যার বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই।
তবে কুরআনে ভাষার সব ধরনের ভুল শুধু মিথ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। «غِيبَة» (গীবত) এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। কারও সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে, তা সত্যও হতে পারে; কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে তার সেই কথা বলাও ভুল বা অন্যায় হতে পারে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: যা কিছু সত্য, তা-ই বলার মতো উপযুক্ত বিষয়—এমনটা আবশ্যিক নয়।
«هَمْز» (হামজ) ও «لَمْز» (লামজ) বলতে দোষ খোঁজা, কটাক্ষ ও অপমানের মতো বিষয় বোঝানো হয়। এগুলো কখনো কখনো খুব স্বাভাবিক বা তুচ্ছ বলে মনে হতে পারে—একটি কটাক্ষ, একটি ঠাট্টা, একটি ছোট্ট বাক্য। কিন্তু এসবের মাধ্যমেও একজন মানুষের ব্যক্তিত্বকে আঘাত করা সম্ভব।
«سُخْرِيَة» (সুখরিয়া) অর্থ অন্যকে উপহাস করা। আর «تَنَابُز بِالْأَلْقَاب» (তানাবুজ বিল-আলকাব) অর্থ এমন উপাধি বা নামে মানুষকে ডাকা, যা তাকে অপমানিত করে। এমনকি পাপ, শত্রুতা বা ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে গোপনে পরিচালিত কথাবার্তার ব্যাপারেও কুরআন সতর্ক করেছে এবং 'আননাজওয়া বিল ইসমে ওয়াল উদ্ওয়ান' «النَّجْوَى بِالْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ»—অর্থাৎ পাপ ও সীমালঙ্ঘনের উদ্দেশ্যে গোপন শলা-পরামর্শ বা কথোপকথনের কথা উল্লেখ করেছে।
এই সব দৃষ্টিকোণ বা অভিব্যক্তি একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়: কুরআনের দৃষ্টিতে জিহ্বা শুধু কথা বলার একটি মাধ্যম নয়; এটি মানুষের নৈতিক চরিত্রেরও একটি অংশ।
আমরা কী বলছি, তা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু কীভাবে বলছি, সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এমনকি আমরা কার সম্পর্কে, কোন পরিস্থিতিতে এবং কী উদ্দেশ্যে কথা বলছি—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সম্ভবত এ কারণেই কখনো একটি বাক্য বলার আগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড থেমে ভেবে নেয়াই যথেষ্ট হতে পারে।
এই কথাটি কি সত্য? এটি বলা কি জরুরি? আর যদি বলা জরুরি হয়, তাহলে কি এটিকে আরও একটু ভালোভাবে বলা যায় না? #
পার্স টুডে/এমএএইচ/০৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।