৯৮.২ শতাংশ মানুষের ভোটে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান
১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইসলামি বিপ্লব চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে। বিপ্লব বিজয়ের দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে আরেকটি বিপ্লবী ঘটনা ঘটায় ইরানি জনগণ।
এবারের বিপ্লবটি হয় গণতান্ত্রিক পন্থায়; গণভোটে তারা ইসলামি শাসনব্যবস্থার পক্ষে রায় দেয়। গণভোটে ইরানের শতকরা ৯৮.২ ভাগ নাগরিক ইসলামি শাসনব্যবস্থার পক্ষে ভোট দেন।এরপর থেকে প্রতি বছর ১২ ফারভারদিন ইরানে পালিত হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র দিবস।
ফার্সি ১৩৫৭ সালের ২২ বাহমান বা ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসলামি বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয় হয়। ইরানি জনগণ তাদের দেশ থেকে মার্কিন প্রভাবকে ধুয়েমুছে বিদায় জানায়। বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয়ের ১০ দিন আগে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা এবং ইসলামি বিপ্লবের সফল নেতা ইমাম খোমেনী (রহ.) ১৬ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে স্বদেশভূমি ইরানে প্রত্যাবর্তন করেন।
ইরানের জনগণ তাদের এই প্রাণপ্রিয় নেতাকে নজিরবিহীন সংবর্ধনা প্রদান করে। মেহরাবাদ বিমানবন্দরে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেয়ার পর ইমাম খোমেনী (রহ.) শাহ বিরোধী সংগ্রামে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য তেহরানের উপকন্ঠে অবস্থিত গোরস্তান- বেহেশতে যাহরায় গমন করেন। সেখানে তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বলেন, জনগণের সহায়তায় তিনি ইরানের নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা করবেন। ১২ ফারভারদিনের গণভোটে মূলত সে প্রতিশ্রুতিরই বাস্তবায়ন ঘটে।
ফার্সি ১৩৫৮ সালের ১২ ফারভারদিন অনুষ্ঠিত গণভোটে ইরানের শতকরা ৯৮.২ ভাগ নাগরিক ইসলামি শাসনব্যবস্থার পক্ষে ভোট দেন। এর মাধ্যমে দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে হাজার হাজার বছরের রাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটে। এ ছাড়া, এই গণভোটের মাধ্যমে ইরানি জনগণ প্রথমবারের মতো তাদের ভাগ্য নির্ধারণের কাজে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। এই ঐতিহাসিক গণভোট ইরানি জনগণকে সম্মান, মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
জনগণের মধ্যে এই অনুভূতি বদ্ধমূল হয় যে, এখন থেকে নির্বাচনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এর আগে রাজতান্ত্রিক শাহ সরকারের শাসনামলেও সাজানো নির্বাচনে ভোট দিত ইরানি জনগণ। কিন্তু ওই নির্বাচনের মাধ্যমে শাহকে পরিবর্তনের কোনো সুযোগ পেত না জনগণ। দেশের মানুষ যখনই শাহ পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলনে নামত তখনই শাহের পক্ষ থেকে সে সময়কার প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে নতুন কোনো প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার গঠন করা হতো। কিন্তু বিপ্লবের পর ইরানের জনগণ ভোটের আসল স্বাদ উপভোগ করার সুযোগ পায়।
যেকোনো বিপ্লবের পর একটি দেশের শাসনব্যবস্থা কেমন হবে তা নির্ধারণের জন্য গণভোট অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। ইরানে অনুষ্ঠিত গণভোটের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে একথা তুলে ধরা হয় যে, কোনো একক ব্যক্তি বা মহল নিজের সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে জনগণের কাছ থেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আর জনগণই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার। এই দিক দিয়ে বিশ্বের অন্যান্য বিপ্লবের সঙ্গে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের একটি গুণগত পার্থক্য গড়ে উঠেছে। গণভোটের এই সিদ্ধান্তটি এসেছে ইসলামি বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ.)’র কাছ থেকে। বিপ্লবের পরপরই তিনি ঘোষণা করেন, জনগণের কাছ থেকেই জেনে নিতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তারা কী ধরনের শাসনব্যবস্থা চায়।
১২ ফারভারদিনের গণভোটের আগে জনগণের উদ্দেশে দেয়া এক বাণীতে ইমাম দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জনগণ যেন সর্বোচ্চ সংখ্যায় এ গণভোটে অংশগ্রহণ করে এবং শাসনব্যবস্থা বাছাই করার ক্ষেত্রে তাদেরকে যেন পুরোপুরি স্বাধীনতা ভোগ করতে দেয়া হয়। ইমাম জনগণকে উদ্দেশ করে বলেন, এই গণভোট আমাদের দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। এটি হয় আপনাদেরকে মুক্তি ও স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করাবে অথবা অতীতের মতো আপনারা বিদেশিদের ওপর নির্ভরশীল থাকবেন। কাজেই এই গণভোটে সবাই অংশগ্রহণ করুন। আপনারা ব্যালট পেপারে ইসলামি প্রজাতন্ত্র লিখতে পারেন, যদি রাজতন্ত্র অথবা অন্য যে শাসনব্যবস্থা চান সেটিও লিখে দিতে পারেন।
এখানে উল্লেখ করা যায়, ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের সব নির্বাচনে জনগণকে ব্যালট পেপারে কাঙ্ক্ষিত প্রার্থীর নাম লিখতে হয়। কোনো ব্যক্তি বা দলের পক্ষ থেকে কোনো প্রতীক ঘোষণা করা হয় না এবং ভোটাররা সেই প্রতীকের ওপর সিলও মারেন না। ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত গণভোটেও ভোটারদের হাতে সাদা ব্যালট পেপার দেয়া হয়েছিল এবং সেখানে তারা ইসলামি প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার নাম লিখে দিয়েছিলেন। এই গণভোটের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে ইরানে ধর্মভিত্তিক জনগণের শাসন আইনি বৈধতা পেয়েছিল।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবের প্রধান শ্লোগান ছিল ‘এস্তেকলাল, আযাদি, জমহুরিয়ে ইসলামি’ অর্থাৎ ‘স্বাধীনতা, মুক্তি, ইসলামি প্রজাতন্ত্র’। এই শ্লোগানের মধ্যদিয়েই মূলত ইরানি জনগণ বিপ্লব বিজয় পরবর্তী শাসনব্যবস্থার ধরন ঠিক করে রেখেছিল। কিন্তু তারপরও ইমাম খোমেনী (রহ.) বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিকতা দিতে এবং জনগণের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে এই শাসনব্যবস্থার পক্ষে ম্যান্ডেট পেতে চেয়েছিলেন।
১২ ফারভারদিনের গণভোটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- এর মাধ্যমে ইরানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। ওই ভোটের সাফল্য ইরানের জনগণকে তাদের নেতা ও প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যালট পেপারের শরণাপন্ন হতে উৎসাহ যুগিয়েছিল। ফলে তখন থেকে প্রেসিডেন্ট ও সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় সব প্রতিনিধি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পরপরই অনুষ্ঠিত এই গণভোট বিশ্বখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। এ ধরনের বিপ্লবের পর সাধারণত যেখানে রাজনৈতিক নেতারা স্বেচ্ছাচারীভাবে নিজেদের সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর চাপিয়ে দেন সেখানে ইমাম খোমেনী (রহ.) জনগণের কাছেই জানতে চান তারা কি চায়। এটি বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠিত বড় বড় বিপ্লবের তুলনায় নজীরবিহীন ঘটনা।
১৯৭৯ সালের ওই গণভোটের পর বিগত ৩৮ বছরে ইরানের জনগণ অন্তত ৩৮টি নির্বাচনে অংশ নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের সুচিন্তিত মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তারা ভোট কেন্দ্রগুলোতে উপস্থিত হয়ে ভোট প্রদানের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ইসলামি শাসনব্যবস্থা রক্ষা করার জন্য তারা প্রত্যেকে আন্তরিক এবং দায়িত্ব পালনে একনিষ্ঠ ও সচেতন। ইরানে চলতি বছর এমন সময় ইসলামি প্রজাতন্ত্র দিবস পালিত হচ্ছে যখন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র দু’মাস বাকি।
রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে নির্বাচন। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে সব সময় জনগণের এই অধিকারটি সমুন্নত ছিল। এই দিক দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য সব দেশের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে ইরান। ইসলামি ইরানের প্রতিটি জনপ্রতিনিধিকে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত করার যে প্রক্রিয়া চালু রয়েছে তা থেকে এদেশে নির্বাচনের গুরুত্ব ফুটে ওঠে।
১২ ফারভারদিনের গণভোটের আরেকটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আর তা হলো ওই ভোটের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, ইসলামে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরান থেকে আমেরিকার প্রভাব চিরতরে উৎখাত করে দেয়ার কারণে এই বিপ্লবের দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়েছিল। আর সে অবস্থায় এরকম একটি গণভোটের আয়োজন করে ইমাম খোমেনী (রহ.) বিশ্ববাসীকে ইসলামের এই উদারতা সম্পর্কে অবহিত করেছেন।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম