বিশ্লেষণ:
কেন গাজায় যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে ইসরায়েল?
-
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রানচেস্কা আলবানিজে
পার্সটুডে—ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও জাতিসংঘের অবস্থান থেকে স্পষ্ট হচ্ছে যে, ইহুদিবাদী ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকছে।
ফিলিস্তিনি ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের সিনিয়র নেতা গাজি হামাদ জোর দিয়ে বলেছেন, ইহুদিবাদী ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন করতে চায় না। তিনি বলেন, দখলদার ইসরায়েল চায় না যে গাজায় যাত্রীদের যাতায়াত সহজ হোক।
ফিলিস্তিন মুক্তির পপুলার ফ্রন্ট–এর রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হাইসম আবদেহ গাজায় ইহুদিবাদী হামলা বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, এসব হামলা দখলদারদের যুদ্ধবিরতির প্রতি অবজ্ঞা এবং গাজার যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশে অনীহা ও তাতে বাধা দেওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ।
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রানচেস্কা আলবানিজেও জোর দিয়ে বলেছেন, ইসরায়েলকে অবশ্যই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল বন্ধ করতে হবে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায়সমূহ সম্মান করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং গাজার বাসিন্দাদের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার ও কোনো শর্ত ছাড়াই সেখানে সাহায্য প্রবেশের আহ্বান জানান।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক উপ-মহাসচিব টম ফ্লেচার রাফাহ ক্রসিং পুনরায় খোলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, এই ক্রসিং আংশিকভাবে খুলে দেয়া একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও তা যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, রাফাহ ক্রসিংকে একটি প্রকৃত মানবিক করিডোরে পরিণত করতে হবে, যাতে আমরা সহায়তা পাঠানোর গতি বাড়াতে পারি।
গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপ ১০ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে কার্যকর হয়। এই চুক্তিটি হামাস ও ইহুদিবাদী ইসরায়েলের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার ফল, যা মিসর, কাতার, যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় এবং মিসরের শার্ম আল-শেইখ শহরে অনুষ্ঠিত হয়।
এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় হামাস ১৩ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে জীবিত ২০ জন ইহুদিবাদী বন্দিকে মুক্তি দেয় এবং পরে আরও কয়েকজন বন্দির মরদেহ হস্তান্তর করে। এর বিনিময়ে ইহুদিবাদী ইসরায়েল তাদের কারাগার থেকে প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেয়।
ইহুদিবাদী ইসরায়েলের ধারাবাহিক সংকট সৃষ্টির প্রবণতা, গাজায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের পেছনে রয়েছে অধিকৃত ভূখণ্ডে অভ্যন্তরীণ সংকটের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার চরমপন্থী ইহুদিবাদীদের মোকাবিলায় অক্ষমতা।
নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভা যুদ্ধপন্থী ও চরমপন্থী ইহুদিবাদী দুই ধারার সমন্বয়ে গঠিত—যারা গাজায় সামরিক অভিযান শেষ করতে প্রস্তুত নয় এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াকে অপরিহার্য মনে করে।
মাসের পর মাস ধরে যুদ্ধ চলার পর নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভা জনসাধারণের অনাস্থা ও গভীর সামাজিক বিভাজনের মুখোমুখি হয়েছে। অধিকৃত ভূখণ্ডের সংকটময় পরিস্থিতি ইহুদিবাদীদের মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে; আবার চরমপন্থী ইহুদিবাদীদের দাবির বিরোধিতা করলেও নেতানিয়াহুর সরকার সংকটে পড়ছে।
নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভা সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে ভঙ্গুর জোটগুলোর অন্যতম। তিনি চরমপন্থী ইহুদিবাদী দলগুলোর সমর্থনের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল—যারা যুদ্ধবিরতিকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের বিজয় হিসেবে দেখে। বন্দিমুক্তি, হামলা বন্ধ বা রাফাহ থেকে পিছু হটার মতো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে যেকোনো ছাড় দ্রুতই নেতানিয়াহুর সরকারের পতন ঘটাতে পারে।
গাজায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে ইহুদিবাদী ইসরায়েল কার্যত পরাজয়কে বিলম্বিত করতে চাইছে; অথচ এর ব্যয় নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক বৈধতার অভাব তেল আবিবের জন্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে এবং তেল আবিবে অভ্যন্তরীণ বিরোধ বাড়লে রাজনৈতিক ভাঙন ও আগাম নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্র তৈরি হবে এবং নেতানিয়াহু পদত্যাগে বাধ্য হবেন।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের প্রস্তাবসমূহের প্রতি ইহুদিবাদী ইসরায়েলের অব্যাহত অবজ্ঞা বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক সমাজ ও ফিলিস্তিনপন্থীদের প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়বে। তেল আবিবের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও লক্ষ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথ সুগম করতে পারে।
এ ছাড়া, ইহুদিবাদী ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও সাবেক যুদ্ধমন্ত্রী ইয়োয়াভ গালান্ত–এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার প্রেক্ষিতে, এই নেতাদের গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের মামলাগুলো আন্তর্জাতিক নানা আদালতে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রও তৈরি হবে। #
পার্স টুডে/এমএএইচ/০৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।