আলেপ্পো পুনরুদ্ধার: সিরিয়ার ভবিষ্যত কোন দিকে যাচ্ছে?
https://parstoday.ir/bn/news/west_asia-i29440-আলেপ্পো_পুনরুদ্ধার_সিরিয়ার_ভবিষ্যত_কোন_দিকে_যাচ্ছে
সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় আলেপ্পো নগরী দীর্ঘ চার বছর পাঁচ মাস বিদেশি মদদপুষ্ট জঙ্গিদের দখলে থাকার পর গত ১৩ ডিসেম্বর পুনরুদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী। এ ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিরিয়া সরকারের বিরোধী আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহল।
(last modified 2026-03-14T11:23:49+00:00 )
ডিসেম্বর ২৮, ২০১৬ ১৬:২০ Asia/Dhaka
  • আলেপ্পো পুনরুদ্ধার: সিরিয়ার ভবিষ্যত কোন দিকে যাচ্ছে?

সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় আলেপ্পো নগরী দীর্ঘ চার বছর পাঁচ মাস বিদেশি মদদপুষ্ট জঙ্গিদের দখলে থাকার পর গত ১৩ ডিসেম্বর পুনরুদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী। এ ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিরিয়া সরকারের বিরোধী আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহল।

২০১২ সালের জুলাই মাসে আলেপ্পোর পূর্ব অংশ দখল করে নিয়েছিল জঙ্গিরা। তখন থেকে এতদিন এই নগরীর পূর্ব অংশ জঙ্গিদের এবং পশ্চিম অংশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।  বর্তমানে গোটা শহরের ওপর সেনাবাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।  সেনাবাহিনীর আলেপ্পো বিজয় এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম একে বাশার আল-আসাদ সরকারের সবচেয়ে বড় বিজয় এবং বিদ্রোহীদের কঠিনতম পরাজয় হিসেবে উল্লেখ করেছে।  ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্টে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বিশিষ্ট লেখক রবার্ট ফিস্ক লিখেছেন: বাশার আসাদ বিরোধী গণমাধ্যমগুলো আলেপ্পো পুনরুদ্ধারকে ‘সেনাবাহিনীর হাতে আলেপ্পোর পতন’ বলে উল্লেখ করেছে। অথচ এসব গণমাধ্যমই এতদিন দায়েশ জঙ্গিদের হাতে কোনো শহরের পতন হলে সেটাকে 'নিয়ন্ত্রণ' শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করে এসেছে।  

সন্ত্রাসীদের হাতে নিহতদের গণকবর

শুধু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নয় পশ্চিমা বিশ্ব ও তাদের আরব মিত্র দেশগুলিও আলেপ্পো পুনর্দখলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। এমনকি জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনও ১৪ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে দেয়া এক বক্তব্যে বলেন, আলেপ্পোর বেসামরিক নাগরিকদের দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে তার সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করছে। তিনি আরো বলেন, ‘আলেপ্পোর হত্যাকাণ্ড’ বন্ধ করতে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, একটি দেশের সেনাবাহিনীর হাতে সেদেশেরই একটি শহর পুনর্দখলের বিরুদ্ধে এত বেশি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখানো হলো কেন? কেন বাশার আসাদের বিরোধী দেশগুলো প্রকাশ্যে এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করল? সিরিয়ার সরকার ও তার মিত্ররা কি এমন বিজয় অর্জন করল যে, আন্তর্জাতিক সমাজের পক্ষ থেকে এমন কড়া প্রতিক্রিয়া দেখানো হলো?

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে সিরিয়ায় আলেপ্পো নগরীর কৌশলগত গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে। বিদেশি মদদে সিরিয়ায় সংঘাত চাপিয়ে দেয়ার আগে আলেপ্পো ছিল দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী ও বাণিজ্যিক রাজধানী। দামেস্ক থেকে ৩১০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই শহরের অবস্থান তুরস্ক সীমান্ত থেকে মাত্র ৫৪ কিলোমিটার দূরে।  সন্ত্রাসীরা সিরিয়ায় অস্ত্রশস্ত্র ও জঙ্গি অনুপ্রবেশের কাজে এই সীমান্ত ব্যবহার করত।  সংঘাত শুরুর আগে সিরিয়ার শতকরা ৬০ ভাগ রপ্তানি আলেপ্পো নগরী থেকে হতো বলে অর্থনৈতিক দিক দিয়েও এই শহরের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এ কারণে জঙ্গিরা এই নগরীকে কেন্দ্র করে বিশেষ পরিকল্পনা তৈরি করে।  

তাদের ধারণা ছিল, আলেপ্পো দখল করতে পারলে সিরিয়া সরকারকে অর্থনৈতিক দিকে দিয়ে দুর্বল করে ফেলা যাবে।  এ ছাড়া, আলেপ্পো নগরীতে ছিল সেনাবাহিনীর স্কুল ও সামরিক অ্যাকাডেমি। অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রাগারও ছিল এই শহরে। সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসারদের প্রশিক্ষণ হতো এখানকারই সামরিক অ্যাকাডেমিগুলোতে।

এসব কারণে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের জন্য আলেপ্পো মুক্ত করা ছিল অতি জরুরি। ২০১৩ সালের এক অভিযানে আলেপ্পোর আল-কালামুন এলাকা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। এর ফলে লেবানন ও ভূমধ্যসাগর থেকে সিরিয়ায় তৎপর জঙ্গিদের কাছে অস্ত্রশস্ত্র আসার রুট বন্ধ হয়ে যায়। এবার গোটা আলেপ্পো পুনরুদ্ধার হওয়ার ফলে তুরস্ক থেকে জঙ্গিদের কাছে অস্ত্রের চালান আসার একটি প্রধান রুট কার্যকরভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। এই নগরী জঙ্গিমুক্ত হওয়ার পর এখন আলেপ্পো ও দামেস্কের পার্শ্ববর্তী জঙ্গি অধ্যুষিত এলাকাগুলোর দিকে মনযোগ দিতে পারবে সেনাবাহিনী।

সেইসঙ্গে ইদলিব হবে সেনাবাহিনীর জঙ্গি বিরোধী অভিযানের পরবর্তী লক্ষ্য। আলেপ্পো পুনর্দখলের ফলে জঙ্গি অধ্যুষিত ইদলিব আগের চেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে। দামেস্কে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট ফোর্ড বলেছেন, আলেপ্পো সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসার ফলে এখন আগামী এক বছরের মধ্যে ইদলিব পুনরুদ্ধার করা সরকারের জন্য সহজ হবে। 

আলেপ্পো পুনরুদ্ধার হওয়ার ফলে সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও প্রমাণিত হয়েছে।  সেইসঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা ও সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতাও যে তার সরকারের রয়েছে সে বিষয়টিও দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে। এ কারণে আলেপ্পো মুক্ত হওয়ার পর বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর দাবি তোলা এখন আর জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকদের জন্য সহজ হবে না।  যারা সিরিয়াকে কয়েক খণ্ডে বিভক্ত করার পরিকল্পনা করেছিল, তারা এতদিন আলেপ্পোকে ‘সিরিয়ার বেনগাজি’ বলে দাবি করত। তারা বলে বেড়াত, বেনগাজি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর লিবিয়ায় যেমন মুয়াম্মার গাদ্দাফি সরকারের পতন হয়েছিল সেরকমভাবে একদিন সিরিয়ায়ও আসাদ সরকারের পতন হবে। কিন্তু এখন আলেপ্পো পুনর্দখলের ফলে সে দাবির অসারতা প্রমাণিত হয়েছে।  এর ফলে সিরিয়ার অখণ্ডতা রক্ষা করা দামেস্কের পক্ষে সহজ হবে।

এদিকে ইদলিব প্রদেশের শিয়া অধ্যুষিত দু’টি শহরের অধিবাসীদের জন্য আলেপ্পো পুনরুদ্ধার ছিল বড় ধরনের স্বস্তির খবর।  প্রায় দুই বছর আগে থেকে ওই শহর দু’টি জঙ্গিরা অবরোধ করে রেখেছে এবং সেখানকার অধিবাসীরা এতদিন চরম মানবেতর জীবনযাপন করছিল। এ অবস্থায় পূর্ব আলেপ্পো পুনর্দখলের আগ মুহূর্তে জঙ্গিদের সঙ্গে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর এক গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা হয়। সমঝোতা অনুযায়ী পূর্ব আলেপ্পোয় আটকে পড়া প্রায় ৫ হাজার জঙ্গি ভারী অস্ত্র ফেলে শুধুমাত্র তাদের ব্যক্তিগত অস্ত্র নিয়ে নিরাপদে শহর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। বিনিময়ে শিয়া অধ্যুষিত অবরুদ্ধ শহর দু’টি থেকে প্রায় ১,২০০ আহত ও অসুস্থ মানুষকে বেরিয়ে আসতে দেয় জঙ্গিরা। এই ঘটনা সিরিয়ার বেসামরিক নাগরিকদের জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে আসাদ সরকারের সক্ষমতা ফুটিয়ে তোলে যার ফলে দেশে তার জনপ্রিয়তা আরো বেড়ে যায়।

আলেপ্পো পুনর্দখলের ফলে সিরিয়ার সেনাবাহিনী ও দামেস্কের মিত্রদের যুদ্ধে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে মনোবল বেড়েছে বহুগুণ।  দেশটির জনগণের মধ্যেও এখন এ আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে যে, প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদ উগ্র তাকফিরি সন্ত্রাসীদের হাত থেকে তাদেরকে সুরক্ষা দিতে পারবেন। অন্যদিকে আলেপ্পোয় জঙ্গিদের পরাজয়ের ফলে তাদের পাশাপাশি তাদের পৃষ্ঠপোষকদের মনোবল ভেঙে পড়েছে।  এই মারাত্মক পরাজয়ের ফলে জঙ্গিদের মধ্যে এখন মতভেদ বেড়ে যাবে যার ফলে তাদের চূড়ান্ত পরাজয়ের ক্ষেত্রে তৈরি হবে।

আঞ্চলিক অঙ্গনেও আলেপ্পো পুনর্দখলের বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।  এই বিজয়কে ইরানের নেতৃত্বাধীন প্রতিরোধ ফ্রন্টের বিজয় এবং সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আপোষকামী ফ্রন্টের পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। সৌদি আরব ও কাতারের গণমাধ্যমগুলো আলেপ্পো বিজয়ের খবরকে ‘সরকারি বাহিনীর হাতে আলেপ্পোর পতন’ বলে উল্লেখ করেছে।  এ থেকে বোঝা যায়, এসব দেশ আলেপ্পো বিজয়কে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের নেতৃত্বাধীন প্রতিরোধ ফ্রন্টের বিজয় হিসেবেই মনে করছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ বিজয় ছিল প্রকারান্তরে আমেরিকার বিরুদ্ধে রাশিয়ার বিজয়। রাশিয়া আলেপ্পো উদ্ধার অভিযানে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়ে সিরিয়ার সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করেছে। এ বিজয়ের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার ক্ষেত্রে রাশিয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে দর কষাকষি করতে পারবে।  সামরিক সহযোগিতিার পাশাপাশি আসাদ সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রতিহত করতেও ভূমিকা রেখেছে রাশিয়া। গত পাঁচ বছরে বাশার আসাদ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি ও নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আনা পাঁচটি প্রস্তাব ভেটো দিয়ে আটকে দিয়েছে মস্কো।

সার্বিকভাবে বলা যায়, আলেপ্পো পুনর্দখলের ফলে দেশের ভেতরে শক্তির ভারসাম্য এখন ব্যাপকভাবে প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদের পক্ষে চলে যাবে।  বিদেশি মদদপুষ্ট জঙ্গিরা ক্রমেই দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়বে এবং এক সময় তাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব হবে।  কিন্তু সৌদি আরবের মতো জঙ্গিদের আঞ্চলিক মিত্র এবং আমেরিকার মতো আন্তর্জাতিক মিত্ররা আলেপ্পো বিজয়ে সন্তুষ্ট নয় বলে তারা নতুন উদ্যেমে জঙ্গিদের সহযোগিতা দিতে এগিয়ে আসতে পারে।  সিরিয়া সরকার ও তার মিত্ররা সে ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/২৮