সৌদি আরব-ইয়েমেন যুদ্ধবিরতি
সৌদি আরব মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অংশভুক্ত একটি দেশ: আবদুল আউয়াল ঠাকুর
ইয়েমেন যুদ্ধ বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় বলে অভিহিতি করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় আমেরিকার সম্মতি রয়েছে এটি মনে করা খুব অমূলক কিছু নয়। কারণ জাতিংসঘের মূল চালিকাশক্তি হিসেবেই কাজ করে আমেরিকা।এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী সমাধানের পথ দেখাবে কি না তা নিয়ে মন্তব্য করার মতো বাস্তব পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার আবদুল আউয়াল ঠাকুর।
বিশিষ্ট এই সাংবাদিক আরো বলেছেন, এটা স্পষ্ট যে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী চক্র এসব যুদ্ধে ইন্ধন দিচ্ছে। তাদের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে যুদ্ধকে জিইয়ে রাখা। প্রশ্নাতীতভাবে একথা বলা যায় সৌদি আরব মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অংশভুক্ত একটি দেশ। সুতরাং সৌদি আরবের নীতি ও চরিত্র বিশ্লেষণ করলে এবং ইয়েমেনে তাদের যুদ্ধ পরিচালনার নীতির ক্ষেত্রেও আমেরিকার প্রভাব রয়েছে। এই যুদ্ধে কার্যত আমেরিকা সহায়তা দিচ্ছে সৌদি আরবকে।
পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।
এটি গ্রন্থণা, উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ
রেডিও তেহরান: সাত বছরের যুদ্ধের মাথায় এসে ইয়েমেন এবং সৌদি আরবের মধ্যে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়েছে। এই যুদ্ধ এবং যুদ্ধবিরতির ঘটনাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
আবদুল আউয়াল ঠাকুর: সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের যুদ্ধের বিষয়টি যদি আজকের আলোচনায় বিবেচনায় আনি তাহলে এর পেছনটাও একটু ঘুরে দেখা দরকার। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যকার যুদ্ধের ইতিহাস বেশ পুরনো। অটোম্যান সম্রাজ্যের পতনের পর থেকেই মূলত সৌদি আরব ও ইমেনের মধ্যে সংঘর্ষের ইতিহাস রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ের যুদ্ধ আর অতীতের যুদ্ধের মধ্যে মৌলিক এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত কিছু পার্থক্য রয়েছে। বর্তমান সময়ের বিবেচনায় জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধ এবং যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছে সেটি আরও কিছু বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত।
জাতিসংঘ এরইমধ্যে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যকার যুদ্ধকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় বলে অভিহিত করেছে। আর সৌদি আরব ও ইয়েমেনের ভেতরকার যুদ্ধের মধ্যেও কিন্তু ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ দেখছি। করোনা মহামারির আক্রমণ দেখেছি। আর বিভিন্ন মানবিক বিপর্যয় কিন্তু চলতি বিশ্বকে অনেক বেশি আক্রান্ত এবং বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে গোটা বিশ্বে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। হতে পারে এই যুদ্ধের প্রভাব সৌদি ও ইয়েমেন যুদ্ধের ভেতরও পড়ে থাকতে পারে। কারণ আজ লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে- ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণেই হোক বা অন্য কোনো কারণে হোক পাকিস্তানেও একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। আর এসব পরিবর্তনকে নানা আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে যুদ্ধ শুরু হওয়া এবং যুদ্ধবিরতির কারণগুলোর মধ্যে নানা ক্ষেত্রে ঐক্য এবং অনৈক্যের সুত্রসমূহ বিদ্যমান রয়েছে।
রেডিও তেহরান: জনাব, আবদুল আউয়াল ঠাকুর, জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়েছে যার অর্থ এখানে আমেরিকার সম্মতি রয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। আপনার কি মনে হয় এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী সমাধানের পথ দেখাবে?
আবদুল আউয়াল ঠাকুর: জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় আমেরিকার সম্মতি রয়েছে এটি মনে করা খুব অমূলক কিছু নয়। কারণ জাতিংসঘের মূল চালিকাশক্তি হিসেবেই কাজ করে আমেরিকা। কিন্তু জাতিসংঘেরও তো কোনো বিকল্প নেই। এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী সমাধানের পথ দেখাবে কি না তা নিয়ে মন্তব্য করার মতো বাস্তব পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। কারণ এ দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের যেসব কারণ রয়েছে তারমধ্যে আল কায়েদা প্রসঙ্গও রয়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের দরিদ্রপীড়িত মানুষ এবং শিশুদের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গত সাত বছরের যুদ্ধে ইয়েমেনে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরও বহু মানুষ। শিশুরা ভুগছে অপুষ্টিতে। সত্যিকারার্থে সেখানে একটি মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘ সেখানে মানবিক সাহায্যের জন্য বারবার আবেদন করছে। সেখানে যুদ্ধবিরতি স্থায়ী পথে যেতে হলে আগে সেখানে মানবিক সাহায্য কার্যক্রমে এগিয়ে যেতে হবে। আর যুদ্ধপক্ষগুলোকে অনুভব করতে হবে যে যুদ্ধ চালিয়ে সেখানে মানুষকে হতাহত ও ক্ষতিসাধন করা ছাড়া আর কিছুই হচ্ছে না। বিশেষ করে সৌদি আরবকে এ বিষয়টি বুঝতে হবে যে, ইয়েমেনের মতো একটি দরিদ্র দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করা কতখানি যৌক্তিক এবং সঙ্গত!
রেডিও তেহরান: যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হলেও সৌদি আরবের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যেই তা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সৌদিকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন তুলেছেন- জয়ের সম্ভাবনা নেই জেনেও কেন রিয়াদ এই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে? আপনি কি বলবেন?
আবদুল আউয়াল ঠাকুর: আসলে যুদ্ধ কেন হয়! ইউক্রেনে যে ঘটনাগুলো ঘটছে, কেন সেখানে যুদ্ধ ত্বরান্মিত হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ধর্মভিত্তিক বিষয়, স্বার্থ, আধিপত্যসহ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যাবে প্রতিটি যুদ্ধের পেছনে তৃতীয় পক্ষের স্বার্থ লুকায়িত থাকে। কেন তৃতীয় পক্ষ এসব যুদ্ধ বাঁধিয়ে রাখে সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তৃতীয় পক্ষের এখানে বড় স্বার্থ হচ্ছে অস্ত্র বিক্রি, আধিপত্য বিস্তার ও কূটনৈতিক ষড়যন্ত্র। বিশ্বে শান্তির প্রতিষ্ঠার চিন্তা করতে হলে যুদ্ধমুক্ত রাখার বিষয়টি প্রথম শর্ত। আর শান্তির বিষয়টির সাথে যুক্ত থাকবে শান্তিবাদী ও কল্যাণকামী মানুষ। ফলে এটা স্পষ্ট যে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী চক্র এসব যুদ্ধে ইন্ধন দিচ্ছে। তাদের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে যুদ্ধকে জিইয়ে রাখা। প্রশ্নাতীতভাবে একথা বলা যায় সৌদি আরব মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অংশভুক্ত একটি দেশ। সুতরাং সৌদি আরবের নীতি ও চরিত্র বিশ্লেষণ করলে এবং ইয়েমেনে তাদের যুদ্ধ পরিচালনার নীতির ক্ষেত্রেও আমেরিকার প্রভাব রয়েছে। এই যুদ্ধে কার্যত আমেরিকা সহায়তা দিচ্ছে সৌদি আরবকে। আর সামগ্রিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিবেচনা করতে হচ্ছে- ইউক্রেন-রাশিয়া, নাকি ইয়েমেন সৌদি আরব নাকি আরও অন্য কোনো যুদ্ধের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। বর্তমানে ইউক্রেন-রুশ যুদ্ধের দিকে যদি আমেরিকাকে বেশি মনোযোগী হতে হয় তাহলে নিশ্চিতভাবে তাকে ইয়েমেন থেকে দৃষ্টি সরাতে হবে। আর সেক্ষেত্রে সৌদি আরবের অবস্থান পাল্টাতে হবে। আর সৌদি আরবে নানা দেশের বহুজাতিক বাহিনী আছে। আসলে সৌদি আরবের যুদ্ধনীতি নির্ভর করে অন্যান্য দেশগুলোর যুদ্ধনীতি পরিস্থিতি ও প্রভাবের ওপর।
রেডিও তেহরান: সাত বছরের এই যুদ্ধের যদি অবসান হয় তাহলে এখান থেকে সৌদি আরবের কী অর্জন থাকবে? এর বিপরীতে প্রতিবেশী একটি দরিদ্র দেশের ওপর পেশিশক্তি প্রদর্শনের জন্য সৌদি আরব কী ইতিহাসে কলঙ্ক বয়ে বেড়াবে না?
আবদুল আউয়াল ঠাকুর: দেখুন, যুদ্ধের কার্যত কোনো অর্জন থাকে না। যেসব দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সংকট থাকে সেখানে সরকার পরিবর্তনসহ নানা জটিল ইতিহাস থাকে। সেক্ষেত্রে কিছু অর্জন থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু ইয়েমেনে সৌদি আরবের যে যুদ্ধ সেখানে সৌদির প্রাপ্তি যোগ হওয়ার আসলে কোনো ইতিহাস নেই।
আপনি যদি ১৯৩৪ সালের যুদ্ধ থেকে হিসাব করে দেখেন তাহলে দেখা যাবে প্রতিটি যুদ্ধে কোনো না কারণে সৌদি আরবকে পশ্চাদপসারণ করতে হয়েছে। আজকের পরিস্থিতিও কিন্তু তার বাইরে কিছু না। সৌদি আরব মুখে যেভাবে লড়াই করুক না কেন কার্যত পেশীশক্তি প্রদর্শনের জন্য দেশটিকে যে অর্থনৈতিক শক্তি ক্ষয় করতে হয়েছে তাতে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে। সৌদি আরবের তেলের উপর বিশ্বের যারা নির্ভরশীল সেই তেল নিয়ে নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বে। বর্তমান বিশ্বে ধীরে ধীরে তেলের চাহিদা বাড়ছে না-বরং কমছে। তেলের বিকল্পের দিকে ছুটছে অনেকে। বিষয়টিকে কিন্তু গুরুত্বের সাথে নিতে হবে।
আরেকটি বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। ইয়েমেনের সাথে কিন্তু বন্দরের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। অর্থাৎ তেল সরবরাহের মৌলিক যে পোর্ট তারসাথে কিন্তু ইয়েমেনের সম্পর্ক রয়েছে। সৌদি আরব ইয়েমেনের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার যে লড়াই করছে আধুনিক সময় সেই লড়াইয়ে সফলতা অর্জন করা একেবারেই সম্ভব না। এইসব যুদ্ধ আসলে একধরনের জেদাজেদি, একধরনের আমিত্ব প্রকাশের লড়াই। সে কারণে এখানে সরাসরি অর্জনের চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে প্রভাব বিস্তারের খাতায় নাম লেখানো।
একটি কথা অবশ্যই মানতে হবে, সেটি হচ্ছে সৌদি আরবের সাথে বিশ্বের মুসলমানদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কারণ মক্কায় রয়েছে পবিত্র কাবা ঘর। তারপরও দেশটি ইয়েমেনে যুদ্ধ চালাচ্ছে এবং তার অনেকটা মূল দিতে হচ্ছে। ইয়েমেনের ঘটনার প্রভাব নানাভাবে কিন্তু বিশ্বে পড়ছে। ইয়েমেন যুদ্ধ নিয়ে সৌদি আরবের ভূমিকা এবং ইরান বিষয়ে যে আলোচনাগুলো রয়েছে তা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইয়েমেন –সৌদি যুদ্ধ। এখানে জয় কার বিরুদ্ধে! দুটি পক্ষই মুসলিম। এখানে শিয়া-সুন্নি কিংবা অন্যন্যা ইস্যু তুলে যে যুদ্ধ পরিচালনা করা হচ্ছে তাতে ক্ষতি নিজেদের। কারণ এখানে যুদ্ধ মূলত মুসলমানদের মধ্যে। আর মুসলমানদের ক্ষতিসাধন করা যদি সৌদি আরবের কোনো উদ্দেশ্য থেকে থাকে তাহলে হয়তো সেই লাভ তারা পেতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার কোনো যুক্তি নেই। এখানে যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অন্য কোনো শক্তিকে ব্যবহার না করে নিজেরাই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে যুদ্ধ কিংবা সমস্যাগুলোকে মিটিয়ে ফেলা ভালো। আর এরকম উদ্যোগ নেয়া হলে তা হবে সবার জন্য কল্যাণকর এবং সঠিক।
রেডিও তেহরান: তো জনাব আবদুল আউয়াল ঠাকুর ইয়েমেন সৌদি যুদ্ধ বিরতি প্রসঙ্গে রেডিও তেহরানের সাথে কথা বলার জন্য আপনাকে আবারও অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
আবদুল আউয়াল ঠাকুর: আপনাকে এবং আপনার মাধ্যমে রেডিও তেহরানের শ্রোতাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৬