উপনিবেশবাদীদের রাজনৈতিক কূটচাল
ফিলিস্তিন কার্ড নিয়ে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের নতুন খেলা
-
ফরাসি রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার
পার্স টুড -ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত ফ্রান্স ও ব্রিটেন ঘোষণা করেছে তা নিছক একটি রাজনৈতিক কূটচাল বা লোক-দেখানো তৎপরতা যাতে ঘরোয়া রাজনৈতিক চাপ ও হুমকি মোকাবেলা করা যায়।
একটি আমেরিকান সংবাদমাধ্যম জোর দিয়ে এ বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তদন্তের পর এক প্রতিবেদনে এই মত ব্যক্ত করেছে। ব্লুমবার্গ নিউজ নামের এই সংবাদমাধ্যম দুটি বিশিষ্ট ইউরোপীয় দেশের পক্ষ থেকে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার পদক্ষেপ পরীক্ষা করে একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে লিখেছে: এ পদক্ষেপ বোধগম্য, গাজা যুদ্ধের অবসান বা সেখানকার জনগণের দুর্ভোগ কমানো এর লক্ষ্য নয়, বরং এটি নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক তিরস্কারের এমন একটি পদক্ষেপ যা বাস্তবে পরিস্থিতির উপর তেমন বড় কোনো প্রভাব হয়ত ফেলবে না।
ইহুদিবাদী ইসরায়েল সৃষ্টির পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ব্রিটেন ও ফ্রান্স। এখন এই দুই দেশের সরকারই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রতি স্বীকৃতির হুমকি দিয়ে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন শাসকগোষ্ঠীর ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করছে।
ইসরাইল গাজা যুদ্ধে যে অমানবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে সে জন্য নেতানিয়াহুকে তিরস্কার করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। কিন্তু গাজাবাসীর মানবিক দুর্দশা কমানোর কোনো ইচ্ছা এই পদক্ষেপে নেই। ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে এসব পদক্ষেপের ফলে গাজাবাসীর কাছে কোন ত্রাণ সাহায্য পৌঁছানোর কাজে সহায়তা হবে না, কিংবা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথও সুগম হবে না।
এইসব পদক্ষেপের ফলে হয়তো ইসরাইলের কাছে সামরিক সাহায্য পাঠানো বন্ধ করার ক্ষেত্রে কিছুটা প্রভাব পড়বে। কিন্তু কোন ব্যাপক কূটনৈতিক পদক্ষেপ ছাড়া ও কার্যকর ময়দানি পদক্ষেপ নেয়া ছাড়া কেবল মুখে মুখে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি স্বীকৃতি আসল সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে এক ধরনের রাজনৈতিক নাটক বা অভিনয় মাত্র।
প্যালেস্টাইন: ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ নীতির একটি হাতিয়ার
পার্স টুডে ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইউরোপে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিতর্ক যখন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, তখন বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে এই অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারের চেয়েও ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও বিবেচনা থেকেই উৎসারিত।
এই দুই দেশের নেতাদের ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে মৌলিক পরিবর্তনের ফলাফল নয়, বরং অভ্যন্তরীণ ঘটনা-প্রবাহ এবং হুমকির প্রতিক্রিয়া। ফ্রান্সের অভ্যন্তরে দুর্বল অবস্থানের কারণে ফিলিস্তিনি সমর্থকদের ব্যাপক প্রতিবাদের মুখোমুখি হওয়ায় ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, বিশ্ব মঞ্চে তার ভাবমূর্তি পুনর্নির্মাণের জন্য এই বিষয়টি উত্থাপন করেছেন। যুক্তরাজ্যে, লেবার পার্টির অভ্যন্তরে গুরুতর চ্যালেঞ্জ এবং জেরেমি কোরবিনের নেতৃত্বে প্রতিদ্বন্দ্বীর উত্থানের মুখোমুখি হয়ে প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার এই বিষয়টিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়া আসলে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দমন করার এবং দেশে এই নেতাদের রাজনৈতিক মূলধন সংরক্ষণের একটি প্রচেষ্টা।
রাজনৈতিক ইঙ্গিত নাকি কূটনৈতিক পদক্ষেপ? ব্লুমবার্গ ফিলিস্তিনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে
ব্লুমবার্গের সমালোচনামূলক প্রতিবেদনে জোর দেয়া হয়েছে যে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত তৈরি না করে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়া কেবল একটি রাজনৈতিক শ্লোগান এবং কেবল এরকম শ্লোগান বা অভিনয় একটি রাষ্ট্রের বাস্তবতা গড়ে তুলতে পারে না।
পশ্চিম এশিয়ায় ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ভূমিকা; সীমান্ত-রেখা টানা থেকে নেতানিয়াহুকে মোকাবেলা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম এশিয়ায় একসময় নতুন ব্যবস্থার স্থপতি ব্রিটেন এবং ফ্রান্স এখন গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে এই অঞ্চলে তাদের ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ করতে চাইছে; সংকট সমাধান তাদের লক্ষ্য নয়, বরং ইসরায়েলের নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন অবৈধ ও দখলদার শাসকচক্রের উপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগই এর লক্ষ্য।
যদিও ব্রিটেন এবং ফ্রান্স এখন আর অতীতের মত বড় ঔপনিবেশিক শক্তি নয়, তবুও তারা নিরাপত্তা পরিষদে তাদের অবস্থান এবং পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান সীমানা গঠনে তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণে আঞ্চলিক ঘটনা-প্রবাহে এখনও প্রভাবশালী খেলোয়াড়। এই দুটি দেশ, যারা ইসরায়েলের ঐতিহ্যবাহী সমর্থক বলে বিবেচিত, তারা এখন গাজায় ব্যাপক অপরাধযজ্ঞে জড়িত নেতানিয়াহুর উপর রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করে তাকে তিরস্কার করতে চাইছে।
ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়ার তাদের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ কেবল সহানুভূতি বা অভ্যন্তরীণ সংকট সমাধানের জন্য কোনো আন্তরিক প্রচেষ্টা নয়, বরং গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের অযৌক্তিক আচরণের প্রতিক্রিয়া এবং এই অঞ্চলে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্নির্মাণের জন্য নিবেদিত। #
পার্স টুডে/এমএএইচ/০৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।