ইউরোপের প্রতিরক্ষায় কেন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর জোর দিচ্ছেন ন্যাটো মহাসচিব?
https://parstoday.ir/bn/news/world-i155538-ইউরোপের_প্রতিরক্ষায়_কেন_যুক্তরাষ্ট্রের_ওপর_জোর_দিচ্ছেন_ন্যাটো_মহাসচিব
পার্সটুডে-উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংগঠন বা  ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুট ইউরোপের প্রতিরক্ষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর জোর দিয়েছেন।
(last modified 2026-01-18T14:26:52+00:00 )
ডিসেম্বর ২৮, ২০২৫ ১০:৪৯ Asia/Dhaka
  • ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুট
    ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুট

পার্সটুডে-উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংগঠন বা  ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুট ইউরোপের প্রতিরক্ষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর জোর দিয়েছেন।

পার্সটুডে জানিয়েছে, ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুট বলেছেন, ন্যাটো সদস্য দেশগুলি এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে পারে এবং ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমেরিকার প্রতিরক্ষা থেকে স্বাধীন হওয়া উচিত নয়।

তিনি শুক্রবার জার্মান সংবাদ সংস্থা (ডিপিএ) এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, নিরাপত্তার জন্য ইউরোপের উচিত আরও বেশি ব্যয় করা তবে সেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি। রুট আরও বলেন, আমি নিশ্চিত যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোকে সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করে। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

ন্যাটো মহাসচিব ট্রাম্পের মতকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ট্রাম্প বলেছেন, ইউরোপের কেবল নিজস্ব প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নেওয়া উচিত। মার্ক রুট দাবি করেন, ২০২৫ সালের অক্টোবরে রোমানিয়া থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি যুদ্ধ ব্রিগেড প্রতিস্থাপন ছাড়াই ফিরিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও ওয়াশিংটন মহাদেশের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। তবে, এই পদক্ষেপকে ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি হ্রাস করার প্রথম দৃঢ় পদক্ষেপ হিসাবে দেখা হচ্ছে। ইউরোপীয় মিত্ররা যখন ইউরোপ থেকে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সম্পদ স্থানান্তরের জন্য মার্কিন সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে তখনও তার এ মন্তব্য এলো। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের জন্য তার সামরিক সহায়তা স্থগিত করার ফলে ইউরোপীয়রা শূন্যস্থান পূরণ করতে বাধ্য হয়।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল নথি প্রকাশিত হয়েছে। তাতে ইউরোপের দেশগুলিকে তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষার জন্য অর্থ প্রদানের স্পষ্ট আহ্বান জানানো হয়েছিল। এতে ন্যাটোর প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি হ্রাস করার জল্পনা-কল্পনা, একটি স্বাধীন ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি ত্বরান্বিত করা অপরিহার্য করে তুলেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইউরোপীয় মিত্রদের 'প্রতিরক্ষার বোঝা ভাগ করে নেওয়ার' এবং মহাদেশের নিরাপত্তার জন্য 'প্রাথমিক দায়িত্ব' নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ওয়াশিংটনে তিনি এ আহবান জানান। ২০২৫ সালের জুনে হেগে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে, তারা তাদের সামরিক ব্যয় জিডিপির ৩.৫ শতাংশ এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত ব্যয় ১.৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আজ পর্যন্ত, শুধুমাত্র পোল্যান্ড এবং লিথুয়ানিয়া ৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ন্যাটোর ধারনা অনুযায়ী  অর্ধেকেরও বেশি সদস্য রাষ্ট্র ২ শতাংশের মধ্যে রয়ে গেছে। ১৯৪৯ সালে ন্যাটো প্রতিষ্ঠার পর থেকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে ন্যাটে তৈরি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তার সামরিক শক্তি, উন্নত প্রযুক্তি এবং বিশাল সামরিক বাজেটের সাথে সবসময় এই পশ্চিমা সামরিক জোটের মেরুদণ্ডের ভূমিকা পালন করে আসছে।

ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সাম্প্রতিক অবস্থান প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ইউরোপের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন হওয়া উচিত নয়। তার ভিত্তি হিসেবে বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা যায়:

প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ইউরোপীয় দেশগুলির সম্মিলিত শক্তির চেয়ে অনেক বেশি। ন্যাটো দেশগুলির জিডিপির প্রায় ৭৫ শতাংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে অবস্থিত এবং এর বেশিরভাগই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। এই অর্থনৈতিক ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব রাশিয়া বা বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের মতো হুমকি মোকাবেলায় ইউরোপকে আমেরিকান সহায়তার উপর নির্ভরশীল করে তোলে।

দ্বিতীয়ত, ন্যাটোর কৌশলগত কাঠামো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে। ওয়াশিংটন কেবল সামরিক সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তির বৃহত্তম সরবরাহকারীই নয়, বরং এর বিস্তৃত তথ্য এবং লজিস্টিক নেটওয়ার্কও রয়েছে যা কেবল ইউরোপই প্রতিস্থাপন করতে পারে না। ন্যাটো মহাসচিব বিশ্বাস করেন যে, ইউরোপীয় নিরাপত্তা অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে, আলাদাভাবে নয়।

তৃতীয়ত, ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির জন্য মার্কিন চাপ আরেকটি কারণ। ওয়াশিংটন আশা করে যে ইউরোপীয় দেশগুলি সামরিক ব্যয়ে আরও বেশি অবদান রাখবে তবে তারা তাদের জন্য নেতৃত্বের ভূমিকা সংরক্ষণ করে। এর ফলে ইউরোপ বাস্তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এমনকি যদি তারা তাদের সামরিক বাজেট বৃদ্ধিও করে।

এই নির্ভরতার পরিণতি বহুমুখী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউরোপীয় নিরাপত্তা নির্ভরতার সমর্থকরা, যেমন ধরুন মার্ক রুট, তিনি দাবি করেন যে ইউরোপীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্তত তত্ত্বগতভাবে ন্যাটোর কাঠামোর মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই ব্যক্তিরা বিশ্বাস করেন যে, এটি ইউরোপীয় দেশগুলোকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা সামাজিক কল্যাণের মতো অন্যান্য ক্ষেত্রে তাদের সম্পদ বরাদ্দ করার অনুমতি দেবে। এছাড়াও, ইউরোপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি রাশিয়া এবং অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রভাব বিস্তারকে বাধা দেয়।

সাধারণভাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউরোপের প্রতিরক্ষা নির্ভরতার ওপর ন্যাটো মহাসচিবের জোর দেওয়ার কারণ সামরিক এবং অর্থনৈতিক শক্তির বাস্তবতা। তার মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ইউরোপ বিশ্বব্যাপী হুমকি সম্পূর্ণরূপে মোকাবেলা করতে পারে না। তবে, এই নির্ভরতার এমন পরিণতি রয়েছে যা ইউরোপের কৌশলগত স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে এবং মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিতে পরিবর্তনের জন্য এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। অতএব, ইউরোপীয় নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ন্যাটোর প্রতি আমেরিকার প্রতিশ্রুতির পরিমাণ এবং যৌথ প্রতিরক্ষায় ইউরোপের অবদান বৃদ্ধির ক্ষমতার ওপর।

অন্যদিকে, এই নির্ভরতা ইউরোপের কৌশলগত স্বাধীনতার জন্য সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। অনেক ইউরোপীয় রাজনীতিবিদ বিশ্বাস করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ইউরোপকে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতি দেখিয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কার্যকরভাবে তার মিত্রদের স্বার্থের চেয়ে নিজস্ব অগ্রাধিকারগুলিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আর এই উদ্বেগের ফলে কিছু ইউরোপীয় নেতাকে একটি স্বাধীন ইউরোপীয় সেনাবাহিনী তৈরির আহ্বান জানাতে উদ্ধুদ্ধ করেছে। যদিও ন্যাটো মহাসচিব এই ধারণাটিকে অপ্রয়োজনীয় বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।#

পার্সটুডে/জিএআর/২৮