ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসনের পর আরো বেপরোয়া মার্কিন সরকার
https://parstoday.ir/bn/news/world-i155762-ভেনেজুয়েলায়_আগ্রাসনের_পর_আরো_বেপরোয়া_মার্কিন_সরকার
পার্সটুডে- ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আক্রমণের পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবি বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও রূপরেখা তৈরির কথা জানিয়েছেন।
(last modified 2026-01-18T14:26:52+00:00 )
জানুয়ারি ০৪, ২০২৬ ১৮:০৪ Asia/Dhaka
  • • প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেটের সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও
    • প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেটের সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও

পার্সটুডে- ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আক্রমণের পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবি বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও রূপরেখা তৈরির কথা জানিয়েছেন।

পার্সটুডে জানিয়েছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভেনেজুয়েলায় তার দেশের সামরিক আক্রমণের প্রশংসা করে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য একটি রূপরেখা ও প্রতীক তুলে ধরেছেন। রুবিও বলেন: "ট্রাম্প কথার নয় বরং কর্মের একজন প্রেসিডেন্ট এবং সকলের এই বাস্তবতা বোঝা উচিত। মাদুরোর সাথে যা ঘটেছে তার একটি স্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীন বার্তা রয়েছে। ট্রাম্পের সাথে কারও রাজনৈতিক বা প্রতারণামূলক খেলা খেলা উচিত নয়। যদি আপনি আগে না জানতেন, তাহলে এখনই বুঝতে হবে।"

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিউবাকেও হুমকি দিয়ে বলেছেন: ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক আক্রমণের পর কিউবান সরকারের "উদ্বিগ্ন" হওয়া উচিত। ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন যে কিউবা এই অঞ্চলে বৃহত্তর মার্কিন নীতিগত বিষয়গুলির অংশ হয়ে উঠতে পারে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিল যে ল্যাটিন আমেরিকায় উত্তেজনা বৃদ্ধির একইসাথে ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার বাইরেও তার মনোযোগ প্রসারিত করার চেষ্টা করতে পারে।

৩ জানুয়ারী, শনিবার সকালে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আক্রমণের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও প্রতিক্রিয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। কারাকাস এবং আরও বেশ কিছু রাজ্যে বিস্ফোরণ এবং ধোঁয়ার কুণ্ডলীর খবর পাওয়া গেছে এবং ট্রাম্প এ ব্যাপারে মার্কিন ভূমিকা নিশ্চিত করে একটি বিবৃতি জারি করেছেন। ট্রাম্প অবশেষে ঘোষণা করেছেন যে নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার উপর মার্কিন আক্রমণকে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে, যে কথা তিনি নিজেই বারবার জোর বলেছেন: তা হলো "শক্তির মাধ্যমে শান্তি।" এই পদ্ধতিটি এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে তৈরি যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল তার সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি নির্মমভাবে প্রকাশ করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজের স্বার্থ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

প্রকৃতপক্ষে, ট্রাম্প বিশ্বাস করেন যে প্রতিদ্বন্দ্বী এবং শত্রুদের সামনে দুর্বলতা দেখানো বা পিছু হটা দেখানো শুধু যে কেবল ওয়াশিংটনকে তার লক্ষ্য অর্জনে বাধা দেবে তাই নয় একইসাথে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী এবং শত্রুদের আরও তথাকথিত শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করবে। অতএব, বিশেষ করে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে, তিনি এমন একটি নীতি অনুসরণ করেছেন যেখানে কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, নতুন বাণিজ্য শুল্ক আরোপ সহ এবং সামরিক হাতিয়ারগুলিকে আমেরিকান শক্তির প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এই নীতির অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। পশ্চিম এশিয়ায়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার প্রথম মেয়াদে, ট্রাম্প ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে এবং সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তেহরানের আচরণ পরিবর্তন করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিলেন। এই পদক্ষেপ কেবল অর্থনৈতিক শক্তির ব্যবহারই প্রদর্শন করেনি বরং অন্যান্য দেশগুলিকে একটি স্পষ্ট বার্তাও দিয়েছিল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলিকে অপর্যাপ্ত বা হুমকিস্বরূপ মনে করলে তা ত্যাগ করতে প্রস্তুত। তার দ্বিতীয় মেয়াদে, ট্রাম্প ইহুদিবাদী ইসরায়েলের সাথে যোগসাজশে ইরানকে আক্রমণ করেন যাতে আবারও আমেরিকান লক্ষ্য অর্জনের জন্য শক্তি প্রয়োগের প্রদর্শন করা যায়।

ল্যাটিন আমেরিকায়, ভেনেজুয়েলা সরকারের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চাপ এবং নিকোলাস মাদুরোর বিরোধীদের প্রতি সমর্থনের নীতি ছিল এই পদ্ধতির আরেকটি উদাহরণ। সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি এবং কারাকাসের উপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে দেখা গেছে যে ট্রাম্প প্রশাসন তার বিরোধী শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য শক্তি প্রয়োগ করতে ইচ্ছুক ছিল। এই নীতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছে এবং অনেকেই এটিকে আমেরিকার আগ্রাসনের লক্ষণ বলে মনে করেন। তবে, ট্রাম্প এবং তার মিত্ররা "শক্তির মাধ্যমে শান্তি"-এর প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপগুলিকে ন্যায্যতা দিয়েছেন এবং দাবি করেছেন যে আমেরিকার শত্রুদের প্রভাব বিস্তার রোধ করার একমাত্র উপায় হল নিরলস চাপ প্রয়োগ করা।

অবশেষে, ক্যারিবিয়ান সাগরে প্রায় তিন মাস ধরে বাহিনী মোতায়েন এবং মাদক পাচারের সাথে জড়িত বলে দাবি করা জাহাজগুলিতে আক্রমণ করার পর, ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট এবং তার স্ত্রীকে অপহরণ করার জন্য কারাকাসে বিমান হামলা চালান এবং তাদের স্থানান্তর করে তিনি মাদুরোকে বিচারের মুখোমুখি করতে চান। তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য, ট্রাম্প প্রথমে তার শত্রুদের উপর বিভিন্ন লেবেল প্রয়োগ করেন এবং তারপর একই দাবির ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। ট্রাম্প পূর্বে দাবি করেছিলেন যে ভেনেজুয়েলার তেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, এইভাবে ভেনেজুয়েলা আক্রমণ করার তার আসল উদ্দেশ্য প্রকাশ করে।

পূর্ব এশিয়ায়, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে নীতি ছিল সামরিক হুমকির পাশাপাশি কূটনৈতিক পন্থা চালিয়ে যাওয়া যা তাদের কৌশলের আরেকটি দৃষ্টান্ত। তিনি প্রথমে "আগুন ও ক্রোধের" হুমকি দিয়ে পিয়ংইয়ংকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং তারপর উত্তর কোরিয়ার নেতার সাথে সরাসরি আলোচনায় প্রবেশ করেছিলেন। এই কৌশল থেকে বোঝা যায় যে ট্রাম্পের দৃষ্টিতে, ক্ষমতা এবং বল প্রয়োগ যেকোনো আলোচনা এবং চুক্তির পূর্বশর্ত। অন্য কথায়, তিনি বিশ্বাস করতেন যে শান্তি তখনই অর্জন করা সম্ভব যদি অন্য পক্ষ প্রথমে আমেরিকান শক্তিকে স্বীকৃতি দেয় এবং তার ভয়ে আলোচনার টেবিলে বসে।

যাইহোক, এই আলোচনাগুলি কোনও কাজে আসেনি, এবং উত্তর কোরিয়া, তার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ অর্জন করেছে; এমনভাবে যে ট্রাম্পের আর পিয়ংইয়ংয়ের সাথে কোনও সম্পর্ক নেই।

ট্রাম্পের "শক্তির মাধ্যমে শান্তি" নীতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরস্পরবিরোধীতা লক্ষ্য করা গেছে।  যদিও কিছু ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির ফলে কিছু দেশ পিছু হটতে বা আলোচনা করতে বাধ্য হয়েছে, এবং ওয়াশিংটন দাবি করছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও তার ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে সক্ষম। অন্যদিকে, ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ এবং নিষেধাজ্ঞার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বব্যাপী অবিশ্বাস বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক দেশ আমেরিকান চাপ থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য আরও স্বাধীন নীতি গ্রহণ করেছে অথবা জোট গঠনের দিকে এগিয়ে গেছে।

পরিশেষে, স্থায়ী শান্তি আনার পরিবর্তে, এই নীতি তীব্র প্রতিযোগিতা, বিশ্বের বিভিন্ন অংশে উত্তেজনা এবং অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করেছে এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

সাধারণভাবে, ট্রাম্পের শক্তির মাধ্যমে শান্তির নীতিকে আমেরিকার আধিপত্য পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা হিসাবে দেখা যেতে পারে; এমন একটি আধিপত্য যার সাথে সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক চাপ এবং বলপ্রয়োগের হুমকির প্রদর্শন থাকে। রুবিও এবং ট্রাম্প মনে হয় ভুলে গেছেন যে বলপ্রয়োগের উপর নির্মিত শান্তি সর্বদা ভঙ্গুর এবং অস্থিতিশীল হবে, কারণ আস্থা এবং সহযোগিতা তৈরির পরিবর্তে, এটি ভয় দেখানো এবং বলপ্রয়োগের উপর ভিত্তি করে তৈরি যা অবশ্যই সর্বদা ভেঙে পড়বে।#

পার্সটুডে/এমআরএইচ/৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন