চীন কেন ট্রাম্পের অবস্থানের বিপরীতে জাতিসংঘকে সমর্থন দিচ্ছে?
https://parstoday.ir/bn/news/world-i156398-চীন_কেন_ট্রাম্পের_অবস্থানের_বিপরীতে_জাতিসংঘকে_সমর্থন_দিচ্ছে
পার্সটুডে: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর চীন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা জাতিসংঘকেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে দেখতে চায় এবং এই সংস্থার প্রতি তাদের সমর্থন অবিচল।
(last modified 2026-01-24T13:11:39+00:00 )
জানুয়ারি ২৪, ২০২৬ ১৯:০৯ Asia/Dhaka
  • গাও জিয়াকুন
    গাও জিয়াকুন

পার্সটুডে: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর চীন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা জাতিসংঘকেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে দেখতে চায় এবং এই সংস্থার প্রতি তাদের সমর্থন অবিচল।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র 'গাও জিয়াকুন' বুধবার (২১ জানুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চীন সব সময় প্রকৃত বহুপাক্ষিকতায় বিশ্বাস করে এবং জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে আসছে।

তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যেভাবেই বদলাক না কেন, চীন আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বব্যবস্থা রক্ষায় অটল থাকবে। এই নীতিগুলো জাতিসংঘ সনদের লক্ষ্য ও আদর্শের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।”

এর আগে, ২০ জানুয়ারি মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন যে, জাতিসংঘের "সক্ষমতা এবং সম্ভাবনার" কারণে এটি অব্যাহত থাকা উচিত, কিন্তু তার প্রস্তাবিত 'পিস প্যানেল' এই সংস্থার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে।

চীনের মুখপাত্র এ বিষয়ে জোর দিয়ে বলেন, চীন বহুপাক্ষিক সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে জাতিসংঘের ভূমিকা যাতে অক্ষুণ্ন থাকে, সে জন্য কাজ করবে।

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প একাধিকবার জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি সংস্থাটির কিছু প্রতিষ্ঠান সংস্কারের কথা বলেছেন এবং কখনো কখনো বিকল্প কাঠামো তৈরির ইঙ্গিতও দিয়েছেন।  তার  এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

অনেক দেশ ও বিশ্লেষক আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এ ধরনের উদ্যোগ বৈশ্বিক বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর প্রস্তাবিত পরিষদ বৈশ্বিক সংকট সমাধানে একটি “নতুন ও সাহসী পদ্ধতি” গ্রহণ করবে।

তবে সমালোচকদের মতে, এই উদ্যোগ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা ক্ষুণ্ন করতে পারে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রধান দায়িত্ব এই নিরাপত্তা পরিষদের ওপরই ন্যস্ত।

বিশেষ করে ট্রাম্প যে তথাকথিত “গাজা শান্তি পরিষদ”-এর কথা বলেছেন, সেটিকে অনেক দেশ ও বিশ্লেষক জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। কারণ, শুরুতে গাজাকেন্দ্রিক উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হলেও, এই পরিষদ ধীরে ধীরে এমন এক কাঠামোতে রূপ নিচ্ছে, যার ক্ষমতা জাতিসংঘের এখতিয়ারভুক্ত বহু ক্ষেত্রকে স্পর্শ করছে।

এই পরিষদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, এটি “প্রায় যেকোনো কিছু করতে পারবে” এবং এর কার্যক্রম গাজার বাইরেও অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটে বিস্তৃত হতে পারে। অথচ এসব দায়িত্ব ঐতিহ্যগতভাবে জাতিসংঘের অধীনেই পড়ে।

এর আগেও নিজের প্রেসিডেন্সির সময় ট্রাম্প জাতিসংঘের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বাজেট কমানোর হুমকি দিয়েছেন এবং স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সব সময় নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। এই অবস্থান ইউরোপীয় মিত্রদের পাশাপাশি কিছু এশীয় দেশের বিরোধিতার মুখে পড়ে।

তবে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বারবার জানিয়ে দিয়েছেন, এই সংস্থার বিকল্প হিসেবে কোনো নতুন কাঠামো গ্রহণযোগ্য নয় এবং জাতিসংঘ তার ভূমিকা ও অবস্থান বজায় রাখবে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্পের এই উদ্যোগ একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা তৈরি করে বিদ্যমান বহুপাক্ষিক কাঠামোকে দুর্বল করতে পারে। ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ জাতিসংঘের নীতি ও কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় এই শান্তি পরিষদে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

জার্মানি থেকেও এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, দেশটির কর্মকর্তারা মনে করছেন—এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক আইন ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারে। তাদের আশঙ্কা, জাতিসংঘের প্রক্রিয়া এড়িয়ে গিয়ে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত কাঠামোর হাতে চলে যেতে পারে।

আরও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এই বিষয়টি যে, ট্রাম্প নিজেকে এই পরিষদের আজীবন প্রধান হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং স্থায়ী সদস্যপদের জন্য এক বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক—যে নীতির ওপর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত।

এছাড়া স্থায়ী সদস্যপদের জন্য এত বড় অঙ্কের অর্থ নির্ধারণ কূটনৈতিক অঙ্গনে দুর্নীতির আশঙ্কাও বাড়িয়েছে। ফলে এই শান্তি পরিষদ একটি বৈশ্বিক বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের বদলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল কাঠামোতে পরিণত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, শান্তি পরিষদের পরিধি বৃদ্ধি, ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ এবং জাতিসংঘের ঐতিহ্যগত ভূমিকার ওপর হস্তক্ষেপ—এই সবকিছু মিলেই অনেকের কাছে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, এই উদ্যোগ শান্তি প্রতিষ্ঠার চেয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানো এবং জাতিসংঘের ভূমিকা কমিয়ে আনার একটি প্রচেষ্টা।

এই প্রেক্ষাপটেই ট্রাম্পের উদ্যোগ নিয়ে চীনের উদ্বেগ এবং জাতিসংঘের প্রতি তাদের দৃঢ় সমর্থনকে দেখা হচ্ছে—যা জাতিসংঘকেন্দ্রিক বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার পক্ষে বেইজিংয়ের অবস্থানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।#

পার্সটুডে/এমএআর/২৪