ফিরে দেখা: ওকিনাওয়ায় জাপানি নারীদের ওপর মার্কিন সেনাদের ব্যাপক ধর্ষণ
https://parstoday.ir/bn/news/world-i157282-ফিরে_দেখা_ওকিনাওয়ায়_জাপানি_নারীদের_ওপর_মার্কিন_সেনাদের_ব্যাপক_ধর্ষণ
পার্সটুডে – ওকিনাওয়ায় জাপানি নারীদের ওপর মার্কিন সেনাদের ব্যাপক নির্যাতন ও ধর্ষণ যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধযজ্ঞের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।
(last modified 2026-02-24T04:27:56+00:00 )
ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬ ১৬:২৪ Asia/Dhaka
  • মার্কিন সেনাদের হাত থেকে পালিয়ে যাচ্ছে ওকিনাওয়ার নারী ও শিশুরা
    মার্কিন সেনাদের হাত থেকে পালিয়ে যাচ্ছে ওকিনাওয়ার নারী ও শিশুরা

পার্সটুডে – ওকিনাওয়ায় জাপানি নারীদের ওপর মার্কিন সেনাদের ব্যাপক নির্যাতন ও ধর্ষণ যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধযজ্ঞের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।

পার্সটুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে ১৯৪৫ সালের বসন্তে সংঘটিত ওকিনাওয়ার যুদ্ধ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও নির্মম যুদ্ধগুলোর একটি। এই যুদ্ধে দ্বীপটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেসামরিক জনগণ প্রাণ হারায়। তবে সহিংসতা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না; মার্কিন বাহিনীর আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ওকিনাওয়ার নারীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার এক অন্ধকার অধ্যায় শুরু হয়।

এই আচরণের ধারা কেবল যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০০০ সালে মার্কিন পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত বিস্তৃত সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে জানা যায়, ওকিনাওয়ার একটি গ্রামের প্রবীণরা জানান যে, ওকিনাওয়ার যুদ্ধে মার্কিন বিজয়ের পর প্রতি সপ্তাহে তিনজন সশস্ত্র মার্কিন মেরিন গ্রামে আসত এবং গ্রামবাসীদের বাধ্য করত এলাকার সব নারীকে জড়ো করতে। এরপর তারা নারীদের পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করত।

শিক্ষাবিদদের অনুমান অনুযায়ী, হয়তো দশ হাজার ওকিনাওয়ান নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সালে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী অধিকাংশ ওকিনাওয়ান হয় এমন কোনো নারীকে চিনতেন যিনি যুদ্ধের পরিণতিতে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন, অথবা অন্তত এমন কারও সম্পর্কে শুনেছিলেন।

এই অপরাধগুলোর প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন স্তরে দেখা গেলেও, তা মূলত লজ্জা ও ভয়ের নীরবতায় আবৃত ছিল। অভিযোগ দায়ের না করার প্রধান কারণ ছিল ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রবল “লজ্জা ও কলঙ্কবোধ”। ওকিনাওয়া ও জাপানি সংস্কৃতিতে এ ধরনের বিষয় নিয়ে কথা বলা কঠোর সামাজিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়ত। এ বিষয়ে স্থানীয় পুলিশের এক মুখপাত্র বলেন, “ভুক্তভোগী নারীরা এতটাই লজ্জিত যে তারা বিষয়টি প্রকাশ করতে পারেন না।” এছাড়া প্রতিশোধের আশঙ্কা এবং মার্কিন বাহিনী বিজয়ী ও দখলদার হওয়ায় নারী ও তাদের পরিবার নীরব থাকত। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষও ব্যাপক ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করত। এই বহুস্তরীয় নীরবতার ফলে বহু অপরাধ অপ্রকাশিত থেকে যায় এবং “অভিযানের আরেকটি নোংরা গোপন রহস্যে” পরিণত হয়।

অনেক নারী অপরাধের অভিযোগ না করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। বহু বর্ণনায় রয়েছে, মার্কিন সেনাদের আগমনের আগে জাপানি সেনাবাহিনীর নির্দেশে বা নিজের সিদ্ধান্তে অনেক তরুণী গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মহত্যা করেন, যাতে তাদের “সম্মান” রক্ষা পায়। লেখক জর্জ ফাইফার তাঁর “টেননোজান: দ্য ব্যাটল অব ওকিনাওয়া অ্যান্ড দ্য অ্যাটমিক বোমা” বইয়ে বলেন, ভুক্তভোগীদের নীরবতা ধর্ষণকে “অভিযানের আরেকটি নোংরা গোপন বিষয়”-এ পরিণত করে।

এই ধর্ষণের সবচেয়ে করুণ পরিণতিগুলোর একটি ছিল এসব সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া শিশুদের ভাগ্য। গবেষণায় দেখা যায়, ধর্ষণের শিকার বহু ওকিনাওয়ান নারী গর্ভবতী হয়ে পড়েন। তবে অতি অল্পসংখ্যক দ্বিজাতি শিশু বড় হতে পেরেছিল। স্থানীয় প্রবীণ ও ইতিহাসবিদদের মতে, লজ্জা, ঘৃণা বা মানসিক আঘাতের কারণে জন্মের পরপরই বহু নবজাতককে হত্যা করা হয় বা পরিত্যক্ত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে গ্রামীণ ধাত্রীদের সহায়তায় গোপনে গর্ভপাত করা হতো। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ওকিনাওয়ার হাজার হাজার দ্বিজাতি শিশুর মধ্যে প্রায় অর্ধেককে তাদের মা বা আত্মীয়রা লালন-পালন করতেন, পিতাদের কাছ থেকে ন্যূনতম আর্থিক সহায়তা নিয়ে।

ওকিনাওয়ায় জাপানি নারীদের ওপর ব্যাপক ধর্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি ছিল পরবর্তী বছরগুলোতে দমিত ক্ষোভ ও গণবিক্ষোভের উত্থান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাদের কঠোর সেন্সরশিপের কারণে এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত না হলেও, এর স্মৃতি ওকিনাওয়ার জনগণের সমষ্টিগত চেতনায় থেকে যায়।

১৯৯৫ সালে ওকিনাওয়ায় মার্কিন সেনাদের লজ্জাজনক আচরণের বিরুদ্ধে হাজারো জাপানির বিক্ষোভ

কয়েক দশক পর এসব সহিংসতা মার্কিন বাহিনীর নিপীড়নমূলক আচরণের প্রতীকে পরিণত হয় এবং ওকিনাওয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৫ সালে তিন মার্কিন সেনা ১২ বছর বয়সী এক জাপানি শিশু ধর্ষণ করে। এই ঘটনা যুদ্ধের তিক্ত স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত করে এবং ৯০ হাজার মানুষের বিক্ষোভ ও দ্বীপ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবির জন্ম দেয়। এই প্রতিবাদ আজও অব্যাহত রয়েছে এবং ২০২৫ সালেও হাজারো মানুষ ওকিনাওয়ায় সমবেত হয়ে মার্কিন ঘাঁটি বন্ধের দাবি জানিয়ে “বেরিয়ে যাও” স্লোগান দিয়েছে।  #

পার্স টুডে/এমএএইচ/২৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।