বিশ্লেষণ: ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্র থাকার দাবির পুরোটাই মিথ্যা
https://parstoday.ir/bn/news/world-i162844-বিশ্লেষণ_ইরানের_বিরুদ্ধে_যুদ্ধের_জন্য_পর্যাপ্ত_অস্ত্র_থাকার_দাবির_পুরোটাই_মিথ্যা
পার্সটুডে- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ রয়েছে।
(last modified 2026-09-07T06:48:42+00:00 )
সেপ্টেম্বর ০৬, ২০২৬ ১৯:৪৮ Asia/Dhaka
  • ট্রাম্প
    ট্রাম্প

পার্সটুডে- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ রয়েছে।

পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ এক কঠোর বার্তায় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের ঘাটতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন। তিনি সমালোচকদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ এবং ‘১০০ শতাংশ ভুল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে মাঝারি থেকে উচ্চমানের ‘প্রায় সীমাহীন পরিমাণ’ গোলাবারুদ রয়েছে, যা এই যুদ্ধ কিংবা ভবিষ্যতে সম্ভাব্য যেকোনো যুদ্ধের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি।

তবে ট্রাম্পের এসব দাবির সঙ্গে অসংখ্য নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণের স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। এসব প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।

ট্রাম্পের গোলাবারুদের প্রাচুর্যের দাবির বিপরীতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অস্ত্রের মজুত ব্যাপক ও উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের দীর্ঘপাল্লার ও নির্ভুলভাবে পরিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহার করেছে। এতে ভবিষ্যৎ সংঘাতের জন্য মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও সংকটজনক। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)-এর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় ২,৩৩০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। জুলাইয়ে এর সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৭৫৯টিতে। একই সময়ে থাড (THAAD) ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ৪৫২টি থেকে কমে ২৩৪টিতে নেমে আসে।

অন্য বিশ্লেষণগুলোতে বলা হয়েছে, থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রায় ৮০ শতাংশ এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রায় অর্ধেকে কমেছে। এসব পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায় যে ‘সীমাহীন গোলাবারুদ’-এর দাবি শুধু অতিরঞ্জিতই নয়, বরং এর কোনো শক্ত ভিত্তিও নেই।

এই পরিস্থিতির দায় এড়াতে ট্রাম্পের অন্যতম প্রচেষ্টা হলো সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনকে দায়ী করা। ট্রাম্প দাবি করেছেন, বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনকে বিনামূল্যে যে পরিমাণ গোলাবারুদ দিয়েছে, তা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে তার চেয়েও অনেক বেশি।

তবে বিশেষজ্ঞরা এই যুক্তিকে বিভ্রান্তিকর বলে মনে করেন।

উদাহরণ হিসেবে, CSIS-এর জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ মার্ক এফ. ক্যানশিয়ান বলেছেন, ইউক্রেনে পাঠানো সামরিক সরঞ্জামের বেশিরভাগই স্থলযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহৃত আকাশ প্রতিরক্ষা ও বিমানযুদ্ধের অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইউক্রেনকে দেওয়া সহায়তার ভূমিকা ছিল সীমিত।

অর্থাৎ, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ—বিশেষ করে বিমান অভিযান এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে—নির্দিষ্ট কিছু মার্কিন সামরিক ব্যবস্থার ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করেছে। ইউক্রেনকে দেওয়া সামরিক সহায়তা এসব ব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে তেমন বড় ভূমিকা রাখেনি।

তবে এই সংকটের শিকড় বর্তমান যুদ্ধের চেয়েও গভীরে এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পের কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্প বহু বছর ধরে শান্তিকালীন চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে পরিচালিত হয়েছে। সমপর্যায়ের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও বিপুল অস্ত্র-ব্যয়সাপেক্ষ যুদ্ধের জন্য এর উৎপাদন ব্যবস্থা প্রস্তুত ছিল না।

ইউক্রেন যুদ্ধ এই দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তুলেছিল। আর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এমন একটি ব্যবস্থাকে পূর্ণাঙ্গ সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা আগে থেকেই চাপে ছিল।

CSIS-এর হিসাব অনুযায়ী, উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো হলেও যুদ্ধের আগের পর্যায়ে প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফিরিয়ে নিতে ২০২৯ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

সুতরাং, ট্রাম্পের ‘সীমাহীন গোলাবারুদ’ এবং ‘নজিরবিহীন উৎপাদন’-এর দাবি শুধু পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনগুলোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার একটি গভীর কাঠামোগত সংকট অস্বীকারের প্রচেষ্টা বলেও প্রতীয়মান হয়।

একই সঙ্গে প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ক্ষয় এবং সেই ঘাটতি পূরণ করতে বছরের পর বছর সময় লাগার বিষয়টি ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে গুরুতর সতর্কসংকেত সৃষ্টি করেছে—বিশেষ করে তাইওয়ানের মতো অঞ্চলে।

এমন পরিস্থিতিতে সমালোচকদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দেওয়া তাদের বৈধ উদ্বেগের কোনো উত্তর নয়; বরং এটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোকে অস্বীকার ও বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের একটি প্রচেষ্টা।#

পার্সটুডে/এসএ/৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।