ক্ষেপণাস্ত্র ও নানা বিষয়ে ইরান-বিদ্বেষী নয়া মার্কিন প্রোপাগান্ডার রহস্য
ইরান বিষয়ে মার্কিন সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি ব্রায়ান হুক গতকাল (বৃহস্পতিবার) বলেছেন, পরমাণু বোমা বহন করতে সক্ষম এমন কিছু ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বা উৎক্ষেপণ করেছে তেহরান।
ইসলামী ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অন্যায্য চাপ বা নিষেধাজ্ঞাগুলোর পক্ষে সাফাই দেয়ার জন্য মার্কিন সরকার প্রায়ই ইসলামী এই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে ও সেসবের পুনরাবৃত্তি করছে। ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু বোমা-বহনের যোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার অভিযোগ এরই অংশ।
বিশ্বের মোড়ল হওয়ার দাবিদার মার্কিন সরকারের ইরান-বিদ্বেষী নানা ধরনের একঘেয়ে মিথ্যা প্রচারণা বা পুনরাবৃত্তিমূলক দাবি গত প্রায় ৪০ বছর ধরে চলতে থাকায় সেসব অনেকাংশেই আকার্যকর হয়ে পড়েছে। তাই বিশ্ব-জনমতকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানোর জন্য মার্কিন-সৌদি-ইহুদিবাদী চক্র ইদানীং নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে। যেমন, কিছু দিন আগে ইরান ইয়েমেনকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েছে বলে দাবি করে কথিত ঐ ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু অংশ বা ধ্বংসাবশেষের টুকরো দেখিয়েছিলেন একজন মার্কিন কর্মকর্তা।
ব্রায়ান হুকও একইভাবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরা দেখিয়েছেন যা ইরান নাকি ইয়েমেনের বিপ্লবী সরকারের সশস্ত্র বাহিনীকে দিয়েছে! ওই টুকরো দেখিয়ে হুক আরও বলেছেন, ইয়েমেনে মানবিক সংকটের জন্য ইরানই দায়ী। ইরানের 'আচরণে পরিবর্তন' আনার জন্য দেশটির ওপর চাপ বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
ইরান সম্পর্কে এই সর্ব-সাম্প্রতিক মার্কিন মিথ্যাচারের আরেকটি পুরনো লক্ষ্য হল ইরানি জুজুর ভয় দেখিয়ে বা তেহরানকে বিশ্ব-শান্তির বিরোধী এক দানবীয় শক্তি হিসেবে তুলে ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রি জোরদার করা।
এমন সময় ইরান-বিদ্বেষী প্রচারণা জোরদার করা হচ্ছে যখন ইউরোপ ইরানের পরমাণু সমঝোতা রক্ষার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ভিন্ন মতাবলম্বী সৌদি সাংবাদিক খাশোগি হত্যা নিয়ে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমানের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
পরমাণু বোমা তৈরি, সংরক্ষণ ও ব্যবহার যে হারাম তা ফতোয়া দিয়ে ঘোষণা করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি বেশ কয়েক বছর আগে। তাই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোও পরমাণু বোমা বহনের উপযুক্ত করে তৈরি করা হয় না। ইরানের সঙ্গে যে পরমাণু সমঝোতা হয়েছিল ৬ বৃহৎ শক্তির সেই সমঝোতা অনুযায়ী ইরান এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে না। ইরান সব সময় এই সমঝোতার সব শর্ত ও দিক পুরোপুরি মেনে চলছে বলে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ'র বিগত ১৪টি রিপোর্টেও বলা হয়েছে যদিও এই সমঝোতা বা চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেছে মার্কিন সরকার।
ইয়েমেন বিষয়ে ইরানের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের দাবিও ভিত্তিহীন। বরং ইয়েমেনে মানবিক সংকটের জন্য সৌদির কাছে অস্ত্র বিক্রেতা মার্কিন সরকারসহ পশ্চিমা সরকারগুলোই দায়ী। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও তা বলে আসছে। ব্রিটেনের দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্টও (গতকাল বৃহস্পতিবার) লিখেছে, মার্কিন সরকারসহ পশ্চিমা সরকারগুলো ইয়েমেনের ভয়াবহ যুদ্ধে সৌদিদেরকে সামরিক ও লজিস্টিক সহায়তা দিয়ে আসলেও দোষ দিচ্ছে ইরানকে!
ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদিকে সহায়তা দেয়া বন্ধ করার জন্য বিল পাস করেছে মার্কিন সিনেট। সিনেটর মাইক লি বলেছেন, ইয়েমেনের রক্তাক্ত যুদ্ধে মার্কিন সরকারের অংশগ্রহণ থাকা উচিত নয় অথচ মার্কিন সম্মতিতেই সেখানে হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত রয়েছে। এ যুদ্ধে বিশ হাজারেরও বেশি নিরপরাধ ইয়েমেনি প্রাণ হারিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। লি আরও বলেছেন, ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদির প্রতি মার্কিন সহায়তা ও হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করেছে।
আসলে ইরানকে একঘরে বা কোণঠাসা করার মার্কিন নীতি বরাবরের মতই ব্যর্থ হচ্ছে। তাই মাঝে মধ্যেই ইরান-বিদ্বেষী প্রচারণা জোরদার করে মার্কিন সরকার ও তার মিত্ররা ইরান-আতঙ্ক ছড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। ইতিহাস ইরান-বিদ্বেষী মার্কিন প্রচারণার অকার্যকারিতা বার বার তুলে ধরেছে। #
পার্সটুডে/এমএএইচ/৩০