ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০২২ ১৮:০৮ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো মজার একটি প্রবাদ এবং এই প্রবাদের নেপথ্য কাহিনী মানে কোত্থেকে কীভাবে এলো এই প্রবাদটি।প্রবাদটির বাংলা এরকম: "না উটের দুধ না আরবের সাক্ষাৎ"। একটু কেমন না?

একটা সময় এরকম ছোটো ছোটো গল্পের একটি ধারা ছিল। মা নানী দাদীরা বাচ্চাদেরকে এগুলো শোনাতেন। বাচ্চারাও বড় হয়ে তাদের উত্তর প্রজন্মকে শুনিয়ে গল্পগুলোকে জারি রেখে গেছে। এই গল্পগুলোর রচয়িতার একেবারেই হদিস মেলে না। মুখে মুখেই এগুলো বর্ণিত হয়েছে।

আরেক ধরনের গল্প ছিল মজার। এগুলো রাজা বাদশাদের বিনোদনের জন্যে বিখ্যাত ছিল। এই গল্পগুলোর দুটি শাখা রয়েছে। একটি একেবারেই কল্পনা প্রসূত। যাদু টোনা, দৈত্য দানব, জ্বীন পরী ইত্যাদি এসব গল্পে স্থান পেয়েছে বেশি। অপরটি মানুষের জীবন ঘনিষ্ঠ। সেজন্য বাস্তবতার একটি চিত্র সেগুলোতে পাওয়া যাবে। এই শ্রেণীর গল্পের চরিত্রগুলো সাধারণত মানুষ। এই মানুষের মধ্যে রাজা-বাদশা থেকে শুরু করে নিম্ন জাতের মানুষেরাও রয়েছে। তবে গল্পগুলোতে শিক্ষণীয় অনেক কিছু রয়েছে। আজকের গল্পটি এতোই প্রসিদ্ধি পেয়েছে একেবারে প্রবাদে পরিণত হয়েছে।

বর্ণিত আছে যে অনেক অনেক দিন আগে এক আরব ভদ্রলোক মরুভূমিতে জীবন যাপন করতো। আজও এরকম মরুবাসী বেদুঈন যে নেই তা নয়। শহর বা নগরবাসী মানুষেরা অনেক সময় প্রয়োজনের তাগিদে মরুভূমি পাড়ি দেয় বা দিতে হয়। সুতরাং শহরবাসীর সঙ্গে এরকম যাযাবর কিংবা মরুবাসী মানুষের দেখা-সাক্ষাৎও হয়ে যায়। এভাবেই এক আরব মরুবাসীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে এক শহুরে নাগরিকের। পরিচয় থেকে তাদের মাঝে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মরুবাসী আরব মাঝেমাঝেই শহরে যায় তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য। সে মরুর বুকে তাঁবু গেড়ে বাস করতো আর উট চরাতো। তাই যখনই সে শহরে যেতো তার শহুরে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যেত। কুশল বিনিময় করতো, ভালো-মন্দ খোজ খবর নিতো।

মরুবাসী এই আরব বন্ধু কিন্তু কখনই খালি হাতে যেত না। শহুরে বন্ধুর জন্য তার নিজের উটের দুধ নিয়ে যেত। নিজ হাতে দুধ দোহন করে মাটির পাত্রে ভরে নিয়ে যেত। শহুরে বন্ধু মরুবাসী বন্ধুর দেয়া দুধ খেয়ে মজাই পেয়ে গেল। বন্ধু এবং উটের দুধের প্রতি তার আগ্রহ জমে উঠলো। সুতরাং সে তার মরুবাসী বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করে দিলো। বেশিদিন তাকে না দেখলে তার ভালো লাগতো না। অপেক্ষার প্র্হর গুনতো: কখোন তার বন্ধু আসবে, তার জন্য উটের দুধ নিয়ে আসবে।মরুবাসী আরব বন্ধু মাসে অন্তত একবার শহরে আসতো এবং শহুরে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতো। কিন্তু ….

কিন্তু হঠাৎ করেই দুই তিন মাস বন্ধুর দেখা পেলো না শহুরে বন্ধু।শহুরে বন্ধুর মনটা কেমন কেমন করতে লাগলো। ভাবলো নিশ্চয়ই  মরুবাসী আরবের জীবনে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে থাকবে।এদিকে মরুবাসী আরব তার প্রতিবেশিদের অনুরোধ করতো শহরে গেলে তারা যেন তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এনে দেয়।শহুরে বন্ধুটি যখন দেখলো দুই তিন মাসেও মরুবাসী বন্ধুর কোনো খবর নেই। দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল সে। মনে মনে বললো: সকল যাওয়ারই তো প্রত্যাবর্তন থাকা উচিত। কিন্তু এই বন্ধুটির কী হলো যে এতো লম্বা সময় ধরে ফেরার কোনো খরবই নেই!

শহুরে বন্ধুটি আরও ভাবলো: এবার তো তাহলে আমাকেই যেতে হয় তার খোজ খবর নিতে।ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েই নিলো বন্ধুর খোঁজে মরু ভ্রমণে যাবে।বন্ধুকেও চমেকে দেওয়া যাবে আবার উটের দুধ খেয়ে পেটের দু:খ নিবারণ করা যাবে।যেই কথা সেই কাজ। ঘোড়ার আস্তাবল থেকে ঘোড়া বের করলো। পিঠে জিন পরানো হলো।বন্ধুর জন্য দারুণ কিছু উপহার সামগ্রী নিলো এবং মরুর উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল।শহর থেকে বের হতেই আবহাওয়া কেমন জানি পাল্টে গেল।চারদিকে একটু গুমোট ঘনঘটা দেখা দিলো।বাতাস হালকা হয়ে এলো। ঘোড়া তার দ্রুতই পথ চলতে লাগলো। যতোই এগিয়ে যেতে লাগলো ততোই বাতাস ভারি হয়ে আসতে লাগলো। ধীরে ধীরে বেগ বেড়ে গেল বাতাসের।কিন্তু বন্ধুর তাঁবুর দেখা এখনও মেলে নি। সুতরাং থেমে কাজ কি! যেতেই হবে।

যতোই এগুতে লাগলো ঘোড়া ঝোড়ো বাতাস ততই তুফানের গতি ধারণ করতে লাগলো। বন্ধুর তাঁবু খুঁজতে খুঁজতে শুরু হয়ে গেল মরুঝড় সাইমুম।আজব এক তুফানের মুখে পড়ে গেল শহুরে বন্ধু। মরুজীবনের ঘটনা দুর্ঘটনা তো তার অজানা।বুঝতে পারছিলো না কী করা উচিত। ফিরে না এসে সামনেই চললো সে বন্ধুর খোঁজে।মনে মনে বললো: আরেকটু গেলেই পেয়ে যাবো মরুবাসী বন্ধুকে। ব্যস! তার তাঁবুতে ঢুকে পড়লেই আর চিন্তা নেই।তাঁবুর ভেতর আরাম করতে করতে মরুঝড় উপভোগ করবো। বন্ধু গরম গরম উটের দুধ দেবে, খাবো আর হাঁটুর ওপর পা তুলে দুধ খেতে খেতে গল্প করবো।

কিন্তু ভাবনার পানসি নাও তরঙ্গে যুবে গেল। ঝড় এবং বালির পাহাড়ে পরিণত হলো।সামনে যাবার মতো অবস্থাই রইলো না।ঘোড়ার পিঠ নামলো এবং ঘোড়ার পেটের নীচে আশ্রয় নিলো। ধুলোবালি চোখে গিয়ে করুণ অবস্থা দাঁড়ালো।এর ভেতরে কজন কালো মানুষ দেখতে পেলো দূরে। তারা দ্রুতই কাছে এসে গেল এবং ঘোড়াসহ টাকা-পয়সা, উপহার যা কিছু তার সঙ্গে ছিল সবকিছু নিয়ে চলে গেল।অগত্যা সে পায়ে হেটে পথ চলতে শুরু করলো। এবার আর বন্ধুর খোঁজে মরুর দিকে নয়, শহরের দিকে। যেতে যেতে আনমনে বলতে লাগলো:"নাহ!আমি উটের দুধও চাইনি,আরবের সাথেও দেখা করতে চাইনি;আমি কিছুই চাইনি"। এই ঘটনার পর থেকেই যখনই কেউ তার লক্ষ্যে পৌঁছানোকে দুরূহ মনে করে মাঝপথে হাল ছেড়ে দিতো তখনই বলতো:'না উটের দুধ না আরবের সাক্ষাৎ"।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ০৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।