ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২২ ১৫:৩১ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি প্রাচীন প্রবাদের গল্প। প্রবাদটি হলো: শেয়ালের লেজ ফাঁদে পড়ে চালাকির জেরে।

গল্পটি এরকম: প্রাচীনকালে এক কৃষিবিদের চমৎকার একটি আঙুর বাগান ছিল। তখনকার দিনে তো আর কৃষিবিদ বলা হতো না, কৃষক কিংবা চাষী বলা হতো। তো তার আঙুর বাগানে যেন ফলন ভালো হয় সে জন্য বাগানে বেশ পরিশ্রম করতো। রাতের পর রাত সে জেগে থেকে কাজ করতো এবং বাগানে পানি দিতো। চমৎকারভাবে পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে কাজ করতো ওই কৃষক।

কিন্তু বড় রকমের একটা সমস্যা ছিল ওই বাগানে। সমস্যাটা হলো একটা ধূর্ত শেয়াল রাতের বেলা যখন তখন আঙুর বাগানে ঢুকে টসটসে রসালো আঙুর তো খেতোই সেইসঙ্গে বাগানটাকে তছনছ করে মাড়িয়ে রেখে যেত। আঙুর লতাগুলোকে নষ্ট করে দিতো। কৃষক যে চেষ্টা করে নি তা নয়, কিন্তু যতই চেষ্টা করুক না কেন দুষ্ট শেয়ালটাকে ধরতে, কাজ হয় নি। ভীষণ চালাক ওই শেয়াল। ফাঁদ দেখলেই বুঝে ফেলে এবং সচেতনভাবে এড়িয়ে যায়। সুতরাং ধরা যেত না তাকে। কৃষকও নাছোড়বান্দা। কষ্টের আঙুর বাগান একটা শেয়াল ধ্বংস করে দেবে আর সে চুপচাপ বসে থাকবে, তা তো হয় না। সেও তার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলো। কৃষক কয়েক রাত একটানা খাটলো। না খেয়েদেয়ে না ঘুমিয়ে বাগানের পাশে ফাঁদ পেতে অপেক্ষা করতে লাগলো। কিন্তু না, কোনোভাবেই শেয়ালটাকে ফাঁদে আটকানো গেল না। অবশেষে তার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। কী বুদ্ধি এলো তা শুনবো মিউজিকের পর। আপনারা সঙ্গেই আছেন যথারীতি এ প্রত্যাশা রইলো।                   

বুদ্ধিটা হলো, শেয়াল যে পথ দিয়ে বাগানে ঢোকে সেই পথের মাঝে একটা গর্ত খুঁড়লো। ওই গর্তের ওপরটা মিষ্টি মিষ্টি টসটসে রসালো আঙুর আর লতাপাতা দিয়ে ঢেকে দিলো। ভেবেছিলো শেয়াল রসে টৈটুম্বুর পাকা আঙুরগুলো খেতে আসবে এবং ফাঁদে আটকা পড়বে। কিন্তু এই বুদ্ধিও কোনো কাজে দিলো না। শেয়াল ওই ফাঁদ দেখে বিপদ টের পেয়ে গেল এবং ভিন্ন পথে সে আঙুর বাগানে ঢুকলো। ঢুকেই বাগানটা তছনছ করে দিলো। কৃষক বেচারা নিরুপায় হয়ে গেল। বুঝে উঠতে পারছিল না কীভাবে এই দুষ্ট শেয়ালটার অত্যাচার থেকে রেহাই পাবে। এরকম পরিস্থিতিতে এক বৃদ্ধের সাক্ষাৎ পেয়ে গেল কৃষক। অভিজ্ঞ বৃদ্ধ কৃষকের আহাজারিতে সাড়া দিয়ে বললো: এক কাজ করো! শেয়ালের আসার পথে একটা ফাঁদ পাতো। সেখানে এক টুকরো গোশত দিয়ে রাখো! শেয়াল ওই গোশত খেতে আসবে এবং ফাঁদে আটকা পড়বে।                                                                  

বৃদ্ধের কথামতো আঙুর চাষী ফাঁদ পেতে সেখানে গোশতের টুকরো দিয়ে রাখলো। তবে গোশত খেয়ে যাতে শেয়াল মারা পড়ে সেই লক্ষ্যে চাষী গোশতে বিষ মাখিয়ে দিলো। ফাঁদ পেতে নিশ্চিন্তমনে বাড়ি ফিরে গেল চাষী। মনে মনে ভাবলো এইবার আর রক্ষা পাবে না শেয়াল। পরদিন ঠিকই আনন্দিত মনে কৃষক আঙুর বাগানে গেল এবং দেখলো তার আঙুর বাগান যথারীতি তছনছ করে রেখেছে দুষ্ট শেয়াল। ফাঁদে রেখে দেওয়া গোশতের টুকরো যেভাবে ছিল সেভাবেই পড়ে আছে। হতাশ হয়ে গেল চাষী। সে এবার সোজা চলে গেল বৃদ্ধের কাছে। পুরো ঘটনা খুলে বললো। বৃদ্ধ চাষীকে বললো: তুমি শেয়ালের সঙ্গে বেশি চালাকি করে ফেলেছো। গোশতে বিষ মাখানোটা ঠিক হয় নি। গোশতের গন্ধ পেয়ে শেয়াল অবশ্যই গোশতের কাছে গেছে তবে বিষের গন্ধ টের পেয়ে আর খাওয়ার চেষ্টা করে নি। এবার বৃদ্ধ কৃষককে বললো: কী বললো তা শুনবো খানিক মিউজিক বিরতির পর। সঙ্গেই থাকুন।

বৃদ্ধ কৃষককে বললো: আবারও ওই ফাঁদ পাতো তবে এবার গোশতে বিষ মাখাবে না। তাই করলো কৃষক তবে কোনো কাজ হবে বলে মনে করলো না সে। যথারীতি ঘনিয়ে এলো রাত এবং শেয়ালও যথারীতি বাগানের পথে পা বাড়ালো। আঙুর মুখ দেওয়ার আগেই সে তাজা মাংসের ঘ্রাণ পেলো এবং শুঁকতে শুঁকতে ফাঁদের কাছে গেল।শেয়াল মাংস দেখেই মনে মনে বললো: নিশ্চয়ই এটা বাগানের মালিকের পাতা ফাঁদ। আমি যেন ওই বিষমাখা মাংস খাই এবং মরে যাই। শেয়াল খুব সতর্কতার সঙ্গে মাংসের কাছে গেল এবং শুঁকে দেখলো বিষ নেই। তবু সে কাছে গেল না। ফিরে যেতে মনস্থ করলো আঙুর বাগানের দিকে কিন্তু তাজা মাংসের ঘ্রাণ তাকে যেতে দিলো না। কোথায় আঙর আর কোথায় তাজা মাংস। কিন্তু এটা কোনো ফাঁদ নয় তো! শেয়াল এবার বুদ্ধি আঁটলো।

গোশতে মুখ না দিয়ে লেজ কিংবা হাত পা দিয়ে টুকরোটাকে দূরে ছুঁড়ে মারতে চাইলো। মনে মনে ভাবলো পরদিন কৃষক এসে দেখবে শেয়ালও আটকা পড়ে নি আবার মাংসের টুকরোও নেই। বাহ, দারুণ হবে। এই ভেবে শেয়াল আস্তে আস্তে মাংসের টুকরোর কাছে গেল। মুখ না দিয়ে লেজ দিয়ে গোশতের টুকরোটাকে সরানোর জন্য নাড়া দিলো। ব্যাস, প্রথম নাড়াতেই ফাঁদের স্প্রিংয়ে আটকে গেল লেজ। যত্ চেষ্টা করলো ছোটাতে কিছুতেই পারলো না। পরদিন সকালে আঙুর বাগানের মালিক আশাহীন মন নিয়ে বাগানে গিয়ে তো অবাক হয়ে গেল। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না সে। ভীষণ আনন্দিত হলো আঙুর চাষী। আস্তে আস্তে শেয়ালের কাছে গেল এবং শেয়ালের হাত-পা বেঁধে বস্তায় ঢুকিয়ে রওনা হলো নিজের গ্রামের দিকে। 

শেয়ালকে বস্তায় ঢুকাতে ঢুকাতে আঙুর চাষী আনমনে ভাবলো: শেয়ালের গলা না আটকে কেন লেজ আটকালো! ভাবতে ভাবতে বুঝে ফেললো এবং শেয়ালকে শুনিয়ে বললো: শেয়ালমশাই! বুঝতে পেরেছি তোমার চালাকি। গোশতে মুখ না দিয়ে লেজ দিয়ে সরিয়ে পরে খেতে চেয়েছো, না? ভাবতে পারো নি যে অতি চালাকিতে শেয়ালের লেজ ফাঁদে পড়ে।

এই ঘটনার পর থেকে দুষ্টজনের চালাকি ধরা পড়তে দেখলেই মানুষ বলতে শুরু করে: শেয়ালের লেজ ফাঁদে পড়ে চালাকির জেরে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১০

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।