গল্প ও প্রবাদের গল্প (পর্ব ২৯)
আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি প্রাচীন গল্প। গল্পটি হলো: ক্ষুদ্র খরগোশের বুদ্ধির কাছে বিশালকায় হাতী কুপোকাত। প্রাচীন আমলের কথা।
একটা জঙ্গলের ভেতর ছিল চমৎকার একটি ডোবা। ওই ডোবার পানি দেখতে যেমন পরিস্কার তেমনি ঠাণ্ডা এবং উপাদেয়। ডোবার চারপাশে বাস করতো বেশ কিছু খরগোশ। তারা যখনই তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়তো ওই ডোবার পানি খেয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করতো। মোটামুটি খরগোশদের জীবন ভালোই কাটছিল ওই জঙ্গলে।
একদিন কথা নেই বার্তা নেই খরগোশদের ভুবনে একদল হাতী এসে হাজির হলো। হাতীগুলো প্রতিদিন পানি খাবার জন্য ওই ডোবায় আসতো এবং ডোবায় নেমে পানি খেতো। স্বাভাবিকভাবেই খরগোশেরা মনোক্ষুন্ন হলো। তাদের জীবনের শান্তি সুখ সবই যেন শেষ হয়ে গেল। তারা এখন আর স্বাধীনভাবে ওই ডোবায় যেতে পারছে না। যখনই তারা যেতে চাইতো দেখতে পেতো কয়েকটি হাতী ডোবার আশেপাশে রয়েছে। ভয়ে আর খরগোশেরা ডোবার কাছেও যেত না। তাছাড়া হাতীগুলো ডোবায় নেমে পানিকে ঘোলা করে ফেলতো। খরগোশেরা নিরুপায় হয়ে এই আপদ থেকে উদ্ধার পাবার পথ বের করতে পরামর্শ বৈঠক ডাকলো।
খরগোশদের পরামর্শ বৈঠকে একটি বৃদ্ধ খরগোশ ছিল। সে ছিল যথেষ্ট বুদ্ধিমান এবং সচেতন। সবাই তাকে তার বিচক্ষণতার জন্য একনামে চিনতো। সেই বৃদ্ধ খরগোশ বললো: আমি এই সমস্যা সমাধানের একটা উপায় খুঁজে বের করবো, চিন্তা করো না তোমরা। খুব দ্রুতই এমন এক কাজ করবো যে হাতীগুলো আর এই ডোবার ধারেকাছেও ভিড়বে না। খরগোশেরা অবাক হয়ে গেল, তবে বৃদ্ধের ওপর সবার আস্থা ছিল। তারা জানতে চাইলো: তোমার মতো এক দুর্বল ছোট্ট খরগোশ এমন কী কাজ করবে হাতীর পালের সঙ্গে! তুমি কি হাতীদের সঙ্গে যুদ্ধ করে পারবে? পারবে তাদেরকে ডোবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে? বৃদ্ধ খরগোশ বললো: আমার একটা প্ল্যান আছে। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে। আজ রাতে আমি পাহাড়ে যাবো এবং হাতীর পালের সঙ্গে কথা বলবো। আশা করি তারা আমার কথা আমলে নেবে এবং এখান থেকে চলে যাবে।
খরগোশেরা বৃদ্ধের বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারে আস্থাশীল ছিল। জানতো যে বৃদ্ধ ফালতু কথা বলে না। নিশ্চয়ই এমন চিন্তা করেছে যাতে আমরা এই দুরবস্থা থেকে মুক্তি পাই। যাই হোক। ওই রাত ছিল পূর্ণিমার রাত মানে চাঁদের চতুর্দশীর রাত। পরিপূর্ণ চাঁদ রূপার থালার মতো আকাশে জ্বলজ্বল করছিল। বৃদ্ধ খরগোশ পাহাড়ে গেল এবং চীৎকার করে হাতীদের ডাকলো। হাতীদের কানে খরগোশের আওয়াজ যেতেই খরগোশের দিকে তাকালো তারা। খরগোশ হাতীদের মনোযোগ দেখে বললো: হে হস্তিকুল! মনোযোগ দিয়ে শোনো! আমি হলাম চাঁদের প্রতিনিধি। চাঁদের পক্ষ থেকেই আমি তোমাদের সঙ্গে কথা বলছি। চাঁদ বলেছে কোনো হাতীর অধিকার নেই ডোবার ধারেকাছে যাবার। কারণ ওই ডোবাটি খরগোশদের।
খরগোশ হাতীদের সঙ্গে চাঁদের পক্ষ থেকে কথা বলছিল যে চাঁদ আমাদের খরগোশদের আত্মীয়। আমাকে চাঁদই পাঠিয়েছে তোমাদের কাছে। তার পয়গাম আমি তোমাদের কাছে পৌঁছালাম। ওই ডোবা চাঁদের আর চাঁদ তা খরগোশদের দিয়েছে। সুতরাং তোমরা আমাদের ডোবার আশপাশ থেকে চলে যাও। হে হস্তিকুল! মনোযোগ দিয়ে শোনো! যদি ওই ডোবার কাছে তোমরা যাও চাঁদ কিন্তু তোমাদের অন্ধ করে দেবে। তোমরা যদি আমার কথা না শোনো কিংবা মনে করে থাকো খামোখা এসব বলছি, তাহলে পরীক্ষা করে দেখতে পারো। আজ রাতে পানি খেতে ডোবায় গিয়ে দেখো তাহলেই চাঁদের রাগ টের পাবে। এরপর খরগোশ হাতীদের সম্বোধন করে বললো: আমি তোমাদের ভালোর জন্যই বলছি। যত দ্রুত সম্ভব সবকিছু গুছিয়ে নাও এবং এখান থেকে চলে যাও।
যদি তোমরা না যাও তাহলে তোমাদের পরিণতি তোমরা নিজেরাই দেখতে পাবে। তখন হয়তো বলতে পারো কেন আমরা তোমাদেরকে আগে জানাই নি। সে কারণেই তোমাদের জানিয়ে গেলাম। খরগোশ কথা শেষ করে পাহাড় থেকে নেমে এলো এবং তার বন্ধুদের কাছে ফিরে গেল। সবাই তো হুমড়ি খেয়ে পড়লো: কী হলো, হাতীরা চলে যাবে তো ইত্যাদি! বৃদ্ধ খরগোশ বললো: দেখো কী হয়! দোয়া করো যাতে হাতীরা আমার কথা বিশ্বাস করে। হাতীরা সাধারণত দিনের বেলায় পানি খেতে ডোবায় যেত। রাতে কখনোই তাদের যাওয়া হয় নি। খরগোশেরাও রাতে যায় নি কখনো। হাতীরা খরগোশের কথাগুলো নিয়ে ভাবলো। এক হাতী বললো: বৃদ্ধ এই খরগোশ কীসব আবোল-তাবোল বকে গেল। অন্য হাতী বললো: নাহ! কী করে জানো যে সে সত্য বলে নি? হাতীদের নেতা বললো: হুমম! হতেও তো পারে চাঁদই বলেছে কথাগুলো। আমরা বরং পরীক্ষা করে দেখি। ডোবার কিনারে যাই। তাহলেই সত্য-মিথ্যা বোঝা যাবে।
হাতীর পাল ডোবার দিকে রওনা দিলো। নেতা হাতী বললো: তোমরা দাঁড়াও আমি অবস্থা দেখে আসি। নেতা হাতী ডোবার কাছে যেতেই তার নজরে পড়লো ডোবার পানিতে সত্যি সত্যিই পূর্ণ চাঁদ। হাতীর জানা ছিল না এটা চাঁদের প্রতিচ্ছবি। মনে মনে বললো খরগোশের কথা সত্য। তারপরও ডোবায় শুঁড় দিয়ে পানি খেয়ে দেখতে চাইলো। অমনি দেখলো পানির ঢেউয়ে চাঁদ দুলে উঠছে এবং অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে চাঁদ। হাতী ভাবলো চাঁদ রেগেমেগে কাঁপছে। দ্রুত ডোবা থেকে চলে গেল এবং পুরো ঘটনা সঙ্গীদের খুলে বললো। সবশেষে বললো: তাড়াতাড়ি এই এলাকা ছেড়ে চলে গেলেই ভালো। আমরা বরং আরেকটা ডোবা খুঁজে বের করবো।#
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।