গল্প ও প্রবাদের গল্প (পর্ব ৩০)
আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি প্রাচীন প্রবাদের গল্প। প্রবাদটি হলো: 'রুটি-রুজি নিয়ে ভাবো,তরমুজ তো পানি'।
হুট করেই এ কথার অর্থ বোঝা সহজ হবে না, যতক্ষণ না আমরা গল্পটি শুনবো। গল্পটি এরকম: প্রাচীনকালের কথা। তখনও ইটের ভাটা ছিল। তবে এখনকার মতো অত্যাধুনিক উপায়ে ইট পুড়িয়ে ব্যবহারের খুব বেশি প্রচলন ছিল না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোদে পোড়া ইটের ব্যবহার ছিল তখন। পুরোণো কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ দেখলে আজও সে কথার সত্যতা মেলে।
যাই হোক এরকমই ইটের ভাটায় কাজ করতো দুই বন্ধু। তাদের কাজ ছিল ইটের খামির তৈরি করে ছাঁচে ফেলে সেগুলোকে রোদে দেওয়া। এভাবে সেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দিনভর কাজ করে যে যৎসামান্য মজুরি পেত তা দিয়ে কোনোরকমে খেয়েপরে বাঁচার মতো জীবন চালানো যেত। তারা প্রতিদিনই প্রচুর মাটি গুড়িয়ে পানি মিশিয়ে মিশ্রণ বানিয়ে ইটের উপযোগী কাদা তৈরি করতো। তারপর কাঠের তৈরি আয়তাকার ছাঁচে কাদা ভরে ইটের আকৃতি বানাতো। এভাবে তারা দিনের পর কাজ করে যাচ্ছিলো। হঠাৎ একদিন দুপুরবেলা দুই বন্ধু ভীষণরকম ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লো। তাদের একজন বললো: যতোই কাজ করি কোনো লাভ নেই। আমাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন, উন্নয়ন কিচ্ছু নেই। এভাবে কাজ করে হবেটা কী! টাকাপয়সাও তেমন নেই যে খাবার-দাবার কিছু কিনে খাবো। যা টাকা আছে শুধুমাত্র রুটি কেনা যাবে বড়জোর।
টাকা পয়সা যা আছে কোনোরকমে রুটি কেনা যাবে হয়তো। এরকম পরিস্থিতিতে অপর বন্ধু বললো: তুই বরং বাইরে গিয়ে কিছু রুটিই কিনে নিয়ে আয়। আমিও হাত চালিয়ে আরও কটা ইট বেশি বানানোর চেষ্টা করি। বন্ধুর কথামতো পকেটে যে কয় পয়সা ছিল সেসব দিয়ে সামান্য রুটি কিনে নিয়ে আসতে গেলো বাজারের দিকে। বাজারে গিয়ে দেখলো এক দোকানে কাবাব বিক্রি করছে অপর দোকানে বিক্রি করছে 'অশ' বা ডাল-সব্জি স্যুপ। বিচিত্র স্বাদের রকমারি খাবার দেখে বেচারার মনটা ভেঙে গেল। কিন্তু কীইবা করার আছে তার! তারকাছে তো খুবই কম টাকা। মন চাচ্ছিলো না কাবাব আর অশের দোকান রেখে অন্যদিকে যেতে। কিন্তু নিরুপায়। যেতেই হলো তাকে রুটির দোকানের দিকে। রুটির দোকানের দিকে যেতেই পথে পড়লো একটা ফলের দোকান।
ওই দোকানে ছিল চোখ লেগে থাকার মতো রসালো সুন্দর সব তরমুজ সারিবদ্ধভাবে সুন্দর করে সাজানো। ওই দোকান পেরিয়ে যেতে মন চাচ্ছিল না বেচারার। কতদিন তরমুজ খায় নি। পা যেন আর চলতে চাচ্ছিল না তার। মনে মনে বললো: আরও কিছু টাকা যদি বেশি থাকতো তাহলে দুপুরের খাবারটা রুটি আর তরমুজ দিয়ে ভালোই জমতো। হায়রে কপাল! অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলো তরমুজের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেবে এবং রুটির দোকানের দিকে যাবে। কিন্তু না, পারলো না যেতে। ভাবলো রুটি না কিনে শুধু তরমুজ কিনে নিলে কেমন হয়। তরমুজ তো খারাপ না। ভালোভাবেই পেট ভর্তি হয়ে যাবে। মুখে তার মৃদু হাসি ফুটে উঠলো এবং যেটুকু টাকা তার কাছে ছিল পুরোটাই ফলের দোকানদারকে দিয়ে দিলো। দোকানদার তাকে একটা তরমুজ দিলো এবং সেই তরমুজ নিয়ে কর্মস্থলে ফিরে যেতে পা বাড়ালো ।
রুটির পরিবর্তে তরমুজ কিনে নিয়ে যে বন্ধু ইটের ভাটায় ফিরে যাবার পথে ভাবলো: তার বন্ধু কি রুটির পরিবর্তে তরমুজ কেনার কারণে তাকে ধন্যবাদ জানাবে? অবশ্যই জানাবে। মনে মনে ভাবছিল সে বিরাট একটা কাজ করে বসেছে-রুটির পরিবর্তে তরমুজ কিনে ফেলেছে,বাহ! এসব ভাবতে ভাবতে যখন ইটের ভাটায় গেল এবং বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো, সে অপেক্ষায় ছিল বন্ধুকে সারপ্রাইজ দেবে। কিন্তু বন্ধু কাজে এতো বেশি মনোযোগী ছিল যে বন্ধুর আগমনই টের পায় নি। তার মাথা থেকে ঘাম ঝরছিল। বোঝাই যাচ্ছিলো ক্ষিদেয় পেট চুঁই চুঁই করছে। এবার তরমুজটাকে পিঠে লুকিয়ে বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলো: বলতো দেখি কী কিনে এনেছি?
কর্মরত বন্ধু জবাব দিলো: ক্ষুধায় পেট জ্বলে যাচ্ছে, তাড়াতাড়ি রুটি দে, খাবো! তোর কাছে যে পরিমাণ টাকা ছিল ওই টাকা দিয়ে কি রুটি ছাড়া আর কিছু কেনা যেত? তাড়াতাড়ি কর! আমি হাত মুখ ধুয়ে প্রস্তুত হয়ে আসি। তুই একটু দস্তরখান বিছিয়ে নে। তরমুজ কিনে আনা বন্ধু এসব কথা শুনে চিন্তায় পড়ে গেল। মনে মনে বললো: তরমুজে আমাদের ক্ষুধা মিটবে তো! হাত মুখ ধুয়ে বন্ধু যখন ফিরলো, দেখলো তার রুটি কিনতে যাওয়া বন্ধু দুশ্চিন্তায় হাঁটু গেড়ে বসে আছে আর পাশে রুটির পরিবর্তে একটা তরমুজ। প্রথম দৃষ্টিতেই সে পুরো ঘটনা বুঝে ফেললো।
ঘটনা বুঝে ফেলার পর বন্ধুটি রাগ না করে বরং তরমুজ কিনে আনা বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বললো: তরমুজটা তো বেশ দারুণ, দেখে খুব খেতে ইচ্ছে করেছে, না? চিন্তার কিছু নেই। তুমি মনে করেছো তরমুজ খেয়ে দুই বন্ধু অবশ্যই সন্ধ্যা নাগাদ ইট তৈরির কাজ করে যেতে পারবো, তাই না? না প্রিয় বন্ধু আমার। রুটিতে অন্যরকম শক্তি পাওয়া যায়। তরমুজ যত মিষ্টিই হোক না কেন সবটাই পানি মাত্র। এই বলে দুই বন্ধু দুপুরের খাবারের পরিবর্তে তরমুজই খেলো এবং বিকেল পর্যন্ত পেটের ভেতর ক্ষুধার বিলাপ নিয়ে কাজ চালিয়ে গেল। এই ঘটনার পর থেকে যখনই কেউ গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ের পরিবর্তে গুরুত্বহীন কোনো প্রসঙ্গের অবতারণা করে তখনই বলা হয়: 'রুটির কথা ভাবো তরমুজ তো পানি'।#
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১৭
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।