ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২২ ১৮:৪৬ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি প্রাচীন গল্প। গল্পটি হলো এক বৃদ্ধ কুস্তিগিরকে নিয়ে। প্রাচীনকালে এক কুস্তিগির ছিল বেশ বৃদ্ধ। কুস্তি খেলাটা একটা বিশ্বজনীন শিল্প।

এই ক্রীড়াশিল্পে সেই বৃদ্ধ কুস্তিগির ছিল ভীষণরকম অভিজ্ঞ ও পটু। সে কারণে তার নামডাক ছড়িয়ে গিয়েছিল সর্বত্র। সুতরাং তার সাথে কুস্তিতে লড়বার মতো দু:সাহস কেউ দেখাতো না। কেননা তার কাছে বহু পালোয়ানই ধরাশায়ী হয়েছিল। আর বৃদ্ধ কুস্তিগির হয়ে উঠেছিল মস্ত বড় ক্রীড়াবিদ। কুস্তি খেলার অন্তত তিন শ ষাটটি ক্রীড়া-কৌশল রপ্ত করেছিল এই কুস্তিবিদ। তার শাগরেদদেরকে সে এগুলোর কিছু কিছু শিক্ষাও দিয়েছিল বা দিতো।

বৃদ্ধ কুস্তিগির শান্ত সুনিবিড় পরিবেশে তরুণ কুস্তিগিরদের প্রশিক্ষণ দিতো। খুবই সুশৃঙ্খল ছিল তার ক্রীড়া প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা। বৃদ্ধ হয়ে যাবার কারণে অভিজ্ঞতার আলোকে এই প্রশিক্ষণ কর্মশালাই চালিয়ে যাচ্ছিলো, তখন আর কুস্তি খেলায় সরাসরি অংশগ্রহণ করতো না। সকল কুস্তি খেলোয়াড়ই এই বৃদ্ধকে সম্মান করতো এবং ওস্তাদ হিসেবে সবাই বৃদ্ধকে যথাযথ শ্রদ্ধা ও মর্যাদার আসনে রাখতো। বৃদ্ধ কুস্তিগিরের যেসব ছাত্র ও প্রশিক্ষণার্থী ছিল তারা ছিল তরুণ এবং শক্তিশালী। তাদের ভেতর থেকে শক্তিমান এক তরুণের প্রতি ওস্তাদের আগ্রহ একটু বেশি ছিল। ওই তরুণকে বৃদ্ধ তার নিজস্ব কৌশলগুলো ভালোভাবে

বৃদ্ধ জানতো ওই তরুণ শাগরেদ অদূর ভবিষ্যতে কুস্তি খেলায় সুনাম সুখ্যাতি অর্জন করবে। তরুণও কুস্তি ভালোই উন্নতি করে যাচ্ছিলো। প্রতিপক্ষকে হারিয়ে শিরোপার পর শিরোপা জিতে নিচ্ছিলো সে। ওস্তাদ তার শাগরেদের বিজয়ে খুবই আনন্দিত হচ্ছিল এবং সিদ্ধান্ত নিলো যত রকমের কৌশল তার জানা আছে সব কৌশলই ওই তরুণ শাগরেদকে শিখিয়ে দেবে। তরুণ ক্রীড়াবিদ এ কথা জানতে পেরে ভীষণ খুশি হলো। কারণ হলো ওস্তাদ খুব কমই কাউকে তার সকল কৌশল শিক্ষা দিতো। সকল কৌশল একে একে শেখা হয়ে গেল তরুণের। শেখার পর তরুণ এই পালোয়ান যখন বুঝতে পারলো যে ওস্তাদের কাছ থেকে সব শেখা শেষ তখন শয়তান এসে তার ভেতর অহংকার জাগিয়ে দিলো।

কারও অস্তিত্বে যখন অহমবোধ জেগে ওঠে তখন তার আর পা মাটিতে পড়তে চায় না। নিজেকে এখন সে পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শক্তিশালী, শিল্পনিপুণ, বিদগ্ধ এবং প্রাজ্ঞ ক্রীড়াবিদ ভাবতে শুরু করে দিলো। এই লাগাতার বিজয় তার ওই অহংবোধকে এতো বেশি চাঙ্গা করে দিলো যে সে তার ওস্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা ভুলে গেল। বলে বেড়াতো: আমি আমার ওস্তাদের চেয়েও বেশি কৌশল জানি। তাকে যদি আমার শ্রদ্ধা করতেই হয় সেটা কেবল এ কারণে যে সে আমার ওস্তাদ ছিল। তা না হলে কুস্তিতে সে আমার পায়ের সমতুল্যও নয়। তরুণ এই পালোয়ান একদিন এরকমভাবেই কথা বলছিল বাদশার সামনে। বাদশাহ তার এই অহংকারী কথাবার্তা শুনে বিরক্ত হলো। আদেশ দিলো ওস্তাদের সঙ্গে তার কুস্তি খেলার আয়োজন করতে। বাদশাহ খুবই বুদ্ধিমান ও সচেতন ছিলেন। তিনি জানতেন এই প্রতিযোগিতায় যুবক তার ওস্তাদের কাছে হেরে যাবে এবং এভাবেই তার শাস্তির ব্যবস্থা হবে।

তো কুস্তি খেলার আয়োজন হয়ে গেল। খেলা উপভোগ করার জন্য মাঠ লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। বাদশাহ নিজেও খেলা দেখতে গেলেন এবং তাঁর জন্য নির্দিষ্ট বিশেষ আসনে গিয়ে বসলেন। অপরাপর কুস্তি খেলোয়াড়রাও এই প্রতিযোগিতা দেখতে সমবেত হলো মাঠে। সমকালীন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কুস্তিবিদ তরুণ তার ওস্তাদের সঙ্গে খেলবে-দারুণ উত্তেজনা সৃষ্টি হলো ক্রীড়া ভুবনে। ধীরে ধীরে প্রতিযোগীরা আসতে শুরু করলো মঞ্চে। প্রথমেই সুঠামদেহি তরুণ কুস্তিবিদ অহংকারী পদভারে মঞ্চে এলো। ওস্তাদের চোখ যখন তরুণের সুঠাম বাহুর ওপর পড়লো বুঝলো সত্যিই শক্তিতে তার শাগরেদ তারচেয়ে এগিয়ে আছে। তাই ভাবলো: যদি শুধুমাত্র শক্তির ওপর ভর করে প্রতিযোগিতায় লড়ে তাহলে শাগরেদের কাছে তার পরাজয় নিশ্চিত। সুতরাং বুদ্ধি খাটিয়ে কৌশল প্রয়োগ করে যুবকের পিঠ মাটিতে ঠেকাতে হবে।

ভাবাভাবির পালা শেষ। খেলা শুরু হয়ে গেল। দর্শকদের মাঝে তো ব্যাপক উত্তেজনা-আজ কে হারে কে জেতে ইত্যাদি। কত রকমের মন্তব্য দর্শক সারিতে। টান টান উত্তেজনা নিয়ে সবাই অপেক্ষা করছে খেলার পরিণতি দেখার জন্য। দর্শকদের ভেতরে কেউ কেউ বাজি ধরলো। দেখা গেল বেশিরভাগই তরুণের বিজয় হবে বলে মনে করে। তবে মনেপ্রাণে তারা সেটা চায় না। তারা চায় ওস্তাদের সম্মান সুরক্ষিত থাকুক, ওস্তাদই জিতুক। ওস্তাদ যুবকের সাথে খেলা শুরু করে দিলো। যুবক যোদ্ধা ওস্তাদের প্রথম আক্রমণই প্রতিহত করতে পারলো না। অমনি পুরো মাঠ জুড়ে আনন্দের শোরগোল উঠলো। বৃদ্ধ ওস্তাদের মনোবল দ্বিগুণ বেড়ে গেল। তরুণ শাগরেদকে তার দুই হাত দিয়ে উপরে তুলে মাটিতে আছড়ে ফেলে দিল। খেলার মাঠজুড়ে দর্শকদের মাঝে আনন্দের চীৎকার আবারও শোনা গেল। জিতে গেল ওস্তাদ। হাত তালিতে মুখরিত হয়ে উঠলো চারদিক। বাদশাহ এবার আসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং বৃদ্ধ ওস্তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অভিনন্দন জানালেন। আদেশ দিলেন ওস্তাদকে যেন একটি উপযুক্ত বীরত্বের পোশাক দেওয়া হয়। অপরদিকে তরুণ শাগরেদকে ভর্ৎসনা করলেন তার ওস্তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা, বেয়াদবি করার জন্য।

তরুণ ক্রীড়াবিদ বাদশাহকে বললো: এই বৃদ্ধ কুস্তিগির শক্তিতে আমার সঙ্গে জিততে পারে নি। ওস্তাদ জিতেছে এমন এক কৌশল ব্যবহার করে যে কৌশলটি আমার জানা ছিল না, কেননা আমাকে তা শেখানো হয় নি। ওস্তাদ জানতো এরকম একটি দিন আসবে। যেদিন তরুণ শাগরেদ কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে ওস্তাদের চেয়েও নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করবে। সে কারণে ওস্তাদ যে তিন শ ষাট টি কৌশল জানতো তার মধ্য থেকে একটি কৌশল শেখায় নি। ওই কৌশলটি এই দিনের জন্য রেখে দিয়েছিল। ওস্তাদ এবার বাদশাহর পাশে দাঁড়িয়ে তরুণ শাগরেদকে বললো: এখন বুঝলে তো কেন সর্বশেষ কৌশলটি শেখাই নি? মুরব্বিদের বলতে শোনো নি: বন্ধুকে এতোটা শক্তি দিও না যাতে কখনো সে শত্রুতে পরিণত হলে তোমাকে পরাজিত করে বসে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ২০

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।