গল্প ও প্রবাদের গল্প (পর্ব ৩২)
আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি প্রবাদের গল্প। প্রবাদটি হলো: 'আমার জন্য পানি না থাক তোমার তো রুটি ঠিকই আছে'। একটু জটিল মনে হচ্ছে গল্পটি তাই না? না, শুনলেই সহজ হয়ে যাবে। তাহলে চলুন আমরা কথা না বাড়িয়ে বরং সরাসরি প্রবাদের গল্পটি শুরু করে দিই। প্রাচীনকালের ইরানের কথা।
সে সময় ইরানের ক্ষেত খামারে কৃষিকাজ করার জন্য পানির প্রয়োজন হতো। খাবারের জন্যও বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন হতো। উভয় রকমের পানির প্রয়োজনীয়তাই মেটানো হতো খাল বা ক্যানেলের মাধ্যমে। সুতরাং খাল খনন করা, পুকুর বা কূপ খনন করা ইত্যাদি কাজগুলো সে সময় ছিল খুবই ভালো এবং সেবামূলক কাজের অন্তর্ভুক্ত। কেননা এসবের মাধ্যমে জনগণের পানির চাহিদা মেটানোর সুযোগ হয়।
এরকমই একজন সমাজসেবক একদিন সিদ্ধান্ত নিলো কয়েকটি কূপ খনন করে একটা খাল তৈরি করবে এবং ওই খালের মাধ্যমে জনগণকে পানি পৌঁছিয়ে দেবে। যথারীতি সে একজন দক্ষ খাল খননকারীকে নিয়োগ দিলো এ কাজের জন্য। সেইসঙ্গে একটি টিলা তার এখতিয়ারে দিয়ে দিলো যাতে তার কাজ সহজতরো হয়। খাল খননবিদ তার কাজের সুবিধার্থে কয়েকজন শ্রমিককে কাজে লাগালো। সুতরাং খাল খননের কাজ শুরু হয়ে গেল। তারা দিনের পর দিন, সপ্তার পর সপ্তা ধরে খাল খনন করলো কিন্তু পানির নাগাল পেল না। সমাজসেবক ভদ্রলোক যিনি নিজের খরচে এই কূপ ও খাল খনন করাচ্ছেন তিনি প্রতিদিনই বিকেল বেলায় একবার খননকাজে ব্যস্ত সবার সাথে দেখা করেন এবং তাদের দৈনিক মজুরি দিয়ে দেন। শ্রমিকেরা পানির নাগাল পাক বা না পাক তিনি তাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতেন ঠিকঠাকমতো।
খননকাজ যখন শুরু হয়েছিল তখন কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বিজ্ঞ খননবিদ সমাজসেবক জ্ঞানী ভদ্রলোককে ইতিবাচক জবাব দিয়ে যাচ্ছিলো। বলতো: ইনশাআল্লাহ দ্রুতই পানির নাগাল পেয়ে যাবো, চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু দিন যেতে যেতে খননবিদের আশা ধীরে ধীরে নিরাশায় পরিণত হতে লাগলো। যতই হতাশা গ্রাস করতে লাগলো ততই পানির জন্য খননবিদের অন্তরাত্মা হাত পা সবই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে লাগলো। কতগুলো কূপ খনন করা হলো কিন্তু একটি কূপেও পানির কোনো নাগাল পাওয়ার সম্ভাবনাও দেখা গেল না। কত খালই খনন করেছে কত কূপই খনন করেছে এই খননবিদ, বলা হয়েছে এখানকার কূপগুলোর চেয়ে অন্যান্য কূপের গভীরতা অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও পানির নাগাল মিলেছে। কিন্তু এখানে একটি কূপেও মাটির নীচের পানির স্বাদু পরিবেশনার কোনো সম্ভাবনা দেখা গেল না।
স্বাভাবিকভাবেই একটু একটু করে কূপ খননকারীদের মাঝে এক ধরনের হাহাকার, এক ধরনের আশা ছেড়ে দিয়ে অনেকটা নিঃস্পৃহ হয়ে যেতে লাগলো। সেই নিঃস্পৃহ নিরুদ্যম অবস্থার প্রকাশ তাদের কথাবার্তার মাঝেও ফুটে উঠতে লাগলো। তারা বলাবলি করতে লাগলো: এই টিলায় আসলে পানির সম্ভাবনা খুবই কম। ভদ্রলোক কূপ আর খাল খননের জন্য এই জায়গাটি নির্বাচন করে ঠিক করেন নি-এ ধরনের কথাবার্তা তাদের মাঝে বলাবলি হতে লাগলো। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো যে ভদ্রলোক কূপ খনন করার লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন তার তো অনেক আগেই হতাশ হয়ে যাবার কথা, অথচ তিনি হতাশ না হয়ে বরং লক্ষ্যে পৌঁছার চেষ্টায় নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যেতে একটুও পিছপা হচ্ছেন না। তিনি প্রতিদিনই কাজের শেষে শ্রমিকদের মজুরি দিয়ে সবাইকে বলতেন: আল্লাহর ওপর ভরসা করো এবং তোমাদের কাজ চালিয়ে যাও। অবশ্যই এক সময় তোমরা পানির নাগাল পেয়ে যাবে।
কূপ খননকারীর আশাবাদী কথায় শ্রমিকেরা আশ্বস্ত হলো এবং আগের মতোই তারা তাদের খননকাজে মনোযোগ দিলো। খননকাজের চুক্তি নিয়েছিল যে খননবিদ সে আবারও একদিন ভদ্রলোককে বললো: আমার মনে হয় না এই কূপগুলো পানির নাগাল পাবে। আমরা একদিকে যেন কাঁচা লোহা কেটে কেটে বৃথাই মাথার ঘাম পায়ে ফেলছি অপরদিকে আপনিও আপনার মূল্যবান অর্থ দেদারসে খরচ করে যাচ্ছেন। কোনো ফায়দা নেই। আরও বেশি বেহুদা খরচ করার চেয়ে আমার মনে হয় এখানে কূপ খননের কাজটা বন্ধ করে দিয়ে ভালো কোনো জায়গা বেছে নিয়ে আমরা খননকাজ চালাতে পারি। ভদ্রলোক বললো: এই টিলাটা খুবই ভালো। টিলার আশেপাশে তাই গড়ে উঠেছে বসতি। এখানে যারা বসবাস করছে তাদের জন্য পানি খুবই প্রয়োজন।সুতরাং আমাদের কাজ বন্ধ না করে চালিয়ে যাওয়াই হবে যুক্তিযুক্ত। সেইসঙ্গে আল্লাহর দয়া ও রহমতের ব্যাপারে আশাবাদী হওয়া ভালো। হতাশ নয়।
কূপ খননকারী বললো: আমি এ পর্যন্ত অন্তত দশটি খাল খনন করেছি। কোনো খালই এতো বেশি খনন করতে হয় নি এবং পানির নাগাল পেতে এতো সময় ব্যয় করতে হয় নি। আমার তো এই খাল খনন থেকে মন উঠে গেছে। ভদ্রলোক বললো: যে কূপে পানি পেতে অনেক গভীরে যেতে হয় সেই কূপের পানি অনেক বেশি নীল এবং মিষ্টি হয়। অতএব হতাশ হবার কিছু নেই, তোমরা তোমাদের খননকাজ চালিয়ে যাও! খননবিদ বললো: জনাব! আমার কাজই কূপ খনন করা। আমি জানি এই টিলার ওপর খননকাজ করে কোনোভাবেই পানির দেখা মেলবে না। এ কাজ বন্ধ করে দেয়াই উত্তম,আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। ভদ্রলোক বললো: আমি তো প্রতিদিনই তোমাদের মজুরি দিয়ে যাচ্ছি। "পানির নাগাল না মিললে তো হতাশ হবো আমি, তোমাদের তো হতাশার কোনো কারণ নেই"।
বললো: কূপে পানি আসুক কিংবা নাই আসুক তোমাদের তো ভাববার প্রয়োজন নেই। তোমরা কাজ করতে থাকো এবং তোমাদের মজুরি নিয়ে যাও! তোমাদের তো পীড়াপীড়ি করার কিংবা নিষ্ক্রিয় হবার কোনো দরকার নেই। কূপ থেকে যদি পানি নাই আসে তোমাদের রুটিরুজির ব্যবস্থা তো হচ্ছে, নাকি! সুতরাং তোমাদের কাজে মনোযোগ দাও, হতাশামূলক কথাবার্তা বলার দরকার নেই। নিরুপায় হয়ে কাজ শুরু করে দিল খননকারীরা। ভদ্রলোক তো ঠিকই বলেছে। কাজ করে মজুরি পাচ্ছে। খনন কাজ করতে করতে এতোই খনন করলো যে শেষ পর্যন্ত পানির নাগাল পাওয়া গেল। সে কি পানি! স্বচ্ছ এবং মিষ্টি।
এরপর থেকেই কেউ যদি তার কোনো কাজকে লাভজনক মনে করতো অথচ সেই কাজের জন্যই বাহানা করতো তখনই এ কথা বলা হতো: এ কাজ কেন করছো না? "আমার জন্য পানি না থাক তোমার তো রুটি ঠিকই আছে"।#
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ০২
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।