মার্চ ১৭, ২০২২ ২২:০৫ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো মজার একটি প্রবাদের গল্প। প্রবাদটি হলো: ‘ইঁদুর-বেড়ালের সখ্যতা মুদির বাজলো বারোটা’। মুদি মানে ব্যবসায়ী-মুদি দোকানদার।

এক মুদির দোকানে দুষ্ট ইঁদুরেরা বাসা বেঁধেছিল। রাতে মুদি বাড়িতে গেলে ইঁদুরেরা দোকানে আনন্দ উৎসব শুরু করে দিতো। চাল, ডাল, গম, আটা ইত্যাদি হেন কোনো জিনিস বাকি থাকতো না যেখানে ইঁদুরেরা হামলা করতো না।

বেচারা মুদি ইঁদুর মারার যত ফাঁদই পাতলো কাজ হলো না। এক দুটি ইঁদুর মরে তো এক ডজন নতুন জন্ম নেয়। অবশেষে বন্ধুদের পরামর্শে মুদি একটা মোটা তাজা বেড়াল নিয়ে এলো দোকানে। দিনের বেলা বেড়ালকে ভালো করে মাংস,পনির,তেলে ভাজা রুটি ইত্যাদি খেতে দিতো। আর রাতে সে তার তীক্ষ্ণ চোখ দিয়ে চারপাশে তাকাতো। ইঁদুরের মাথা দেখামাত্রই বেড়াল আক্রমণ করে কাজ সারা করে ফেলতো। সুতরাং বেড়ালের উপস্থিতিতে ইঁদুরেরা আর আগের মতো দোকানের ভেতর ভোজন উৎসব করার সুযোগ পেলো না। এই পরিস্থিতিতে মুদি খুব খুশি হলো। কিন্তু ইঁদুরেরা পড়ে গেল বিপাকে।

বেড়াল মুদির ওপর সন্তুষ্ট কারণ সে তাকে দিনের বেলা দারুণ খাওয়া-দাওয়াকরায়। তাকে ভালভাবে বিশ্রাম নিতে দেয়। সেও রাতের বেলা ইঁদুর মেরে দোকানদারকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করছে। এভাবে যাচ্ছিলো দিন। কিন্তু একটি চতুর ইঁদুর বেড়ালের ঘুমানোর সুযোগ কাজে লাগাতো। সে নিজে যেমন খাবার খেতো, অন্যদের জন্যও খাবার চুরি করে নিয়ে যেতো। মুদি বেড়ালের কাজে সন্তুষ্ট হলেও ব্যাপারটা টের পেলো। মনে মনে ভাবলো দিনের বেলা বিড়ালকে কম খাবার দেবে যাতে সে রাতে ক্ষুধার্ত থাকে। তাহলে ক্ষুধা মেটানোর জন্য বেড়াল আরও বেশি ইঁদুর শিকার করবে। মুদির এই পরিকল্পনা এক বা দুই সপ্তাহ ভালোই কাজে দিলো।

নাদুসনুদুস বেড়ালটি ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে যেতে লাগলো। ক্ষুধা মেটাতে তাই বেড়াল রাতে আরও ইঁদুর শিকার করতে লাগলো। ইঁদুরের আক্রমণ স্বাভাবিকভাবেই কমে গেল। মুদি তার বুদ্ধি কাজে দিয়েছে ভেবে খুব খুশি হলো। কিন্তু বেড়াল আর আগের মত খুশি না। মুদির ওপরও সন্তুষ্ট না। বিড়াল তেলযুক্ত খাবার দাবার এবং মাংস খেতে চাইতো। কিন্তু তা এখন আর সে পাচ্ছে না। সে ভাবলো  মুদি তাকে এখন আর আগের মতো মোটেও পাত্তা দিচ্ছে না। এদিকে ইঁদুরেরা মুদি এবং বেড়ালের গতিবিধি সব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। মাঝেমাঝে তারা পরামর্শ করে। এভাবে পরামর্শের ভিত্তিতে তারা একটা পরিকল্পনা আঁটলো।  

ইঁদুরেরা পরিকল্পনা গ্রহল করলো ঠিকই কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা যায় কীভাবে সে ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করতে লাগলো। অবশেষে একটি চতুর ইঁদুরকে তারা বেছে নিলো। চালাক ইঁদুরটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে চাল,মটরশুটি ইত্যাদির থলে থেকে মাথা বের করে বিড়ালকে বললো: "আমাকে আক্রমণ করার আগে এক মিনিটের জন্য আমার কথাটি শোনো।" আমি আমার পালানোর পথ ঠিক করেই রেখেছি। সুতরাং আপনি চাইলেই হুট করে আমাকে শিকার করতে পারবেন না। আপনি যদি আমার কথাটা শোনেন, তাহলে তা আপনার জন্যও মঙ্গল বয়ে আনবে।

বেড়াল শুরুতে ইঁদুরকে আক্রমণ করারই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু তার কথা শোনার পর সামান্য ভাবলো এবং মনে মনে বললো: দেখি না কী বলে ইঁদুর। ইঁদুরকে বললো: কী বলতে চাও, বলো! ইঁদুর বলল: "আপনি এই দোকানে আসার পর থেকে আমরা না খেয়ে মরতে বসেছি।" বেড়াল বললো:  তোমরা কি অন্য কিছু আশা করেছিলে? আমি বেড়াল আর তোমরা ইঁদুর। ইঁদুর বললো: "তা ঠিক! কিন্তু একটু ভেবে দেখুন! মুদি একজন মানুষ আর আমরা পশু। আমরা সুখে দুখে একসাথে থাকতে পারি। বেড়াল ভাবলো: ইঁদুর তাকে অপমান করছে,তার ব্যক্তিত্বে আঘাত করছে। সুতরাং সে ইঁদুরটিকে ধরতে উদ্যত হলো। অমনি ইঁদুর ব্যাগের কাছে পালিয়ে গিয়ে বললঃ  চিন্তা করে দেখুন! মুদি আপনাকে এত কম খাবার দিচ্ছে যে কদিন পর আপনি ইঁদুর শিকার করার শক্তিও হারাবেন।

ইঁদুরের কথাটা বেড়ালের মনে ধরলো। একটু নরম হয়ে তাই বললো: কী বলতে চাস খুলে বল! ইঁদুর এবার খানিক এগিয়ে এসে বললো: "নিশ্চয়ই আপনারও ইচ্ছে করে মুদিখানার মজার মজার জিনিসগুলোতে আঁচড় বসাতে! বহুদিন আপনি পনির, তেল এসব খান নি। তাই বলছিলাম কী! আপনি যদি প্রতি রাতে আধা ঘণ্টার জন্য ঘুমাতে যান তাহলে আমরা আমাদের কাজ সেরে ফেলতে পারি এবং আপনার পছন্দমতো খাবারগুলো আপনাকে সরবরাহ করতে পারি। ইঁদুর ছাড়া অন্যান্য মজাদার খাবার খেতে মন চাচ্ছিলো বেড়ালের। তাই মনে মনে বললো: ঠিক আছে! আজ রাতে পরীক্ষা হয়ে যাক! এই বলে বেড়াল বললো: আমি আজ রাতে এমনিতেও খুব ক্লান্ত। আমি রেস্ট নিচ্ছি। তোমরা যা খুশি করো!

ইঁদুর বুঝে ফেললো বেড়াল পটে গেছে। তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেছে। সে গর্তে ফিরে গিয়ে সবাইকে জানালো বিষয়টা।  সেই রাতে ইঁদুরেরা সতর্কতার সাথে তাদের অভিযান চালালো এবং তাদের চাহিদা মিটিয়ে বেড়ালের জন্য কিছু রেখে গেলো। ইঁদুরেরা  চলে যাবার পর বেড়াল তার জন্য ইঁদুরদের রেখে যাওয়া খাবার মজা করে খেলো। তারপর মাথার নীচে হাত রেখে আরামে ঘুমিয়ে পড়লো। ইঁদুর এবং বিড়াল উভয়ই তাদের সখ্যতায় এবং পারস্পরিক সহযোগিতায় ব্যাপক খুশি হলো। কিন্তু বেচারা মুদি বুঝতেই পারলো না তার বেড়াই ক্ষেত খাচ্ছে। ইঁদুর বেড়ালের এই সখ্যতার গল্প সবার মুখে মুখে চর্বিত হতে লাগলো। তারপর থেকে যখনই কোথাও দুই শত্রুর সংহতিতে তৃতীয় পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হতো তখনই মানুষ বলতো: ‘ইঁদুর-বেড়ালের সখ্যতা মুদির বাজলো বারোটা’।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১৭

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।