মার্চ ২৩, ২০২২ ২১:০৮ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি প্রাচীন গল্প। গল্পটি হিংসুকের মনকষ্ট নিয়ে। যারা বিনা কারণে অন্য কোনো ভালো মানুষের উন্নতিতে হিংসা করে, তারা হিংসা করে ওই লোকের উন্নতিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে চায়।

অথচ যাকে হিংসা করা হয় সে কোনো কষ্ট ভোগ করে না যতোটা কষ্ট হিংসুকেরা ভোগ করে। গল্পটি এরকম: প্রাচীনকালে একজন সুচতুর এবং জ্ঞানী যুবক ছিলো। সে ছিলো উচ্চ পদস্থ এক সামরিক কর্মকর্তার ফ্যামিলির সদস্য। সে একদিকে যেমন ছিলো বেশ চৌকস তেমনি ছিলো একজন শিল্পবোধ সম্পন্ন ব্যক্তিত্বও। বাদশাহ অবশ্য তার এই চাতুর্য এবং সর্ববিষয়ে সচেতনতার  ব্যাপারে জানতেন। এরকম সর্বগুণে গুণান্বিত হবার কারণে তাকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। যুবকের কাঙ্ক্ষিত মানের সকল গুণ ছিল বলে কিংবা বলা চলে তার প্রচণ্ড মেধা ও বুদ্ধিমত্তা থাকায় সে মোটামুটি সবকিছুতেই সফল হতো।

বাদশাহ এবং তার পারিষদ তাই তার এইসব সাফল্য দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করে বলতো: একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এই যুবকের জন্য অপেক্ষা করছে। এই যুবকের একটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিলো সে সবার সাথে সদয় ও শ্রদ্ধা সম্মানের সাথে আচরণ করতো এবং সবাইকেই সে ভালোবাসতো। তাই তার আশেপাশের লোকেরাও তাকে ভালবাসতো এবং শ্রদ্ধা করতো। কিন্তু সব মানুষ তো আর এক রকম নয়। এদের ভেতর ঈর্ষাপরায়ণ লোকও ছিল যারা তাকে পছন্দ করতো না কিংবা তাকে হিংসা করতো। এই ঈর্ষাকাতর লোকগুলো সবসময় তার উন্নতি অগ্রগতি রুখে দিতে বাধা দেওয়ার সুযোগ খুঁজে বেড়াতো। কী করতো তারা সেই গল্পই আমরা আজ শুনবো।

তারা সবাই মিলে চিন্তাভাবনা করতো, পরামর্শ করতো কী করে তাকে বাদশাহর সুনজর থেকে দূরে সরানো যায় এবং সবার কাছে তাকে ঘৃণিত ও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে তোলা যায়। হিংসুক শত্রুরা তাদের অন্তরে এমনকি যুবকের মৃত্যু পর্যন্ত কামনা করতো। এক সময় তারা তার বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ উত্থাপন করলো। অভিযোগটা ছিল সে নাকি ভয়ংকর রকমের খেয়ানত মানে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারা ভাবতে পারে নি যে এইসব অপবাদে কোনো কাজ হবে না। বরং তারাই উল্টো অপদস্থ হবে। কেননা বাদশাহর কাছে এই যুবকের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল আকাশচুম্বী। বাদশাহ তাই যুবকের ব্যাপারে কোনো অভিযোগ বা অপবাদ এলে আমলেই নিতেন না। হিংসুক শত্রুরা বেশ কয়েকবার বাদশাহর কাছে গিয়ে তার ব্যাপারে ব্যাপক অপবাদ করেছে বদনাম গেয়েছে ঠিকই কিন্তু বাদশাহ কিছুই কানে তোলেন নি।

এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। বাদশাহ দেখলো যে মেধাবী যুবকের বিরুদ্ধে এই শত্রুতার যেন শেষ নেই। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন তাকে ডেকে পাঠাবেন। তার বিরুদ্ধে শত্রুরা কেন এরকম অভিযোগ দিচ্ছে তার কারণ জানাই যুবককে ডাকার উদ্দেশ্য। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে শত্রুরা যে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ উত্থাপন করেছে সে ব্যাপারেও জিজ্ঞাসা করবে বলে বাদশাহ চিন্তা করলেন। যেমন চিন্তা তেমন কাজ। একদিন যুবককে বাদশাহ ডাকলেন। তিনি যুবককে জিজ্ঞেস করলেন: তোমার বিরুদ্ধে এদের শত্রুতার কারণ কী? যুবক কিছুক্ষণ চিন্তা করলো। তারপর দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বললো: আমি যাদের সাথে কাজ করি তাদের সবার সাথে আমি ভালো ব্যবহার করি। এমনকি আশেপাশের সবার সঙ্গেও সন্তোষজনক আচরণ করি। এভাবে সবাইকে আমার প্রতি কোনো না কোনোভাবে তুষ্ট রাখার চেষ্টা করি। যার ভেতর বিন্দুমাত্র ন্যায় ও ইনসাফ আছে সে কিছুতেই আমার ওপর আরোপিত এইসব অভিযোগ কিছুতেই মেনে নেবে না কারণ তারা জানে এই অভিযোগের সঙ্গে আমার দূরতম সম্পর্কও নেই। আমি আমার জ্ঞান বুদ্ধি ও বিবেচনা দিয়ে সবাইকে আমার বন্ধুত্বের ডোরে বাঁধার চেষ্টা করেছি। তবে যারা হিংসুক ও দুষ্ট তাদেরকে পারি নি। তারা আমাকে নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত শান্ত হবে না।

বাদশাহর জিজ্ঞাসার জবাবে যুবক বলেছিল: আমি আমার জ্ঞান বুদ্ধি ও বিবেচনা দিয়ে সবাইকে আমার বন্ধুত্বের ডোরে বাঁধার চেষ্টা করেছি। তবে যারা হিংসুক ও দুষ্ট তাদেরকে ছাড়া। তারা আমাকে নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত শান্তি পাবে না। কেননা তারা দেখতে পাচ্ছে আমি ধীরে ধীরে উন্নতি ও অগ্রগতির সিঁড়ি বেয়ে শিখরে আরোহণ করছি। অনেক উচ্চ পদ-মর্যাদায় অভিষিক্ত হচ্ছি। আমার এই সম্মান ও মর্যাদা তাদের সহ্য হচ্ছে না। সে কারণে তারা চেষ্টা করছে আমার উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করতে। আমার বিরুদ্ধে হিংসুক শত্রুরা দুই শ্রেণীর রয়েছে। এক শ্রেণী চায় আমি যেন আমার পদমর্যাদা হারাই, মান-সম্মান ও অবস্থান হারাই। এইসব পদমর্যাদার কারণে তারা আমাকে হিংসা করে। আবার আরেক শ্রেণীর হিংসুক আছে তারা একটু বিপজ্জনক ও পাষাণ। তারা হিংসার সীমা ছেড়ে শত্রুতার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তারা আমার পদমর্যাদাই কেবল কেড়ে নিতে চায় না বরং তারা চায় আমার মৃত্যু। এই শ্রেণীর সঙ্গে আমি কীভাবে কী করবো জানি না। আমার যেটুকু বিদ্যা বুদ্ধি আছে তা দিয়ে সব কাজই মোটামুটি করতে পারি। কিন্তু হিংসুকদেরকে সুপথে আনা কিংবা তাদের মন থেকে হিংসার কালো ছায়া সরানোর মতো জ্ঞান প্রজ্ঞা আমার নেই।

বাদশাহ জ্ঞানী যুবকের সকল কথা শোনার পর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন: হ্যাঁ! ঠিকই বলেছো! হিংসুক লোকের জন্য আসলে করার কিছুই নেই। ইচ্ছে থাকলেও তাদের মানসিক দৈন্যতার কারণে কিছুই করার থাকে না। শোনো নি! মুরব্বিরা বলে গেছেন: হিংসুকেরা অন্যদেরকে যতটুকু কষ্ট দেয় তারচেয়ে অনেক বেশি যন্ত্রণা নিজেই ভোগ করে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ২৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।