মে ১৫, ২০২২ ১৯:১৫ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি গল্প। গল্পটি এরকম: এক ভদ্রলোকের বাগান করার শখ ছিল। খুব ভালোবাসতো বাগানে বিচিত্র ফুল দেখতে। তাই খুব পরিপাটি করে, সুন্দর করে বাগান করলো। বাগানে লাগালো বিভিন্ন ধরণের সুন্দর ও সুগন্ধি ফুলের গাছ।

ভদ্রলোক প্রতিদিন সকালে সূর্যোদয়ের আগেভাগে বাগানে হাঁটতো এবং সকালের তরতাজা বাতাস উপভোগ করতো। ভোরবেলা সবুজ ঘাস আর গাছপালা এবং ফুলের দিকে তাকাতো। ফুলের সুগন্ধি নিয়ে হাসিখুশি ও প্রফুল্ল থাকতো।

সে মনে করতো প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফুল এবং গাছপালাময় পরিবেশে কয়েক মিনিট হাঁটলে মানুষ কখনো বৃদ্ধ হবে না, সর্বদা সুখী এবং প্রাণবন্ত থাকবে। এই বাগান প্রেমিক বা মালী বাগানে বহু ধরণের ফুলগাছ লাগিয়েছিল। সেগুলোর মধ্য থেকে গোলাপ ফুলের প্রতি তার মুগ্ধতা বেশি ছিল। কারণ অন্যান্য ফুলের চেয়ে গোলাপ দেখেতও সুন্দর, সুগন্ধিও মিষ্টি। সে প্রতিদিন গোলাপের দিকে তাকাতেন এবং একে একে সেগুলোর গন্ধ নিতেন। মনে মনে বলতেন: বুলবুলির গোলাপের প্রেমে পড়ার অধিকার আছে। লাল ফুল অন্তরাত্মার আনন্দ এবং প্রশান্তির কারণ। একদিন সকালে সূর্যোদয়ের আগে ওই মালী বাগানে পায়চারী করতে গিয়ে দেখতে পেলো বুলবুল গোলাপের পাপড়িগুলো একটি একটি করে ছিঁড়ছে আর পাপড়িতে মাথা ডুবিয়ে গান গেয়ে যাচ্ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছিলো সে ফুলের পাশে থেকে ভীষণ খুশি।

গান গাইতে গাইতে বুলবুলি পাপড়িগুলি এক এক করে ছিঁড়তে ছিড়তে পুরো ফুলটাকেই নষ্ট করে ফেললো। রসিক মালির তো খারাপ লাগারই কথা। বুড়ো মালী কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে বুলবুলির গান শুনলো। বুলবুলিকে ফুলের পাশে আনন্দিত দেখে খুশি হলো। কিন্তু তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফুলের পাপড়ি দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর, পাখিটি বুঝতে পারল যে মালী তাকে দেখছে, উড়ে গেল। পরদিন মালী আবার একই জিনিস দেখল। সে দেখল যে কোকিল ফুলে ভরতে গিয়ে গান গাইছে, বুড়োকে দেখে সে উড়ে গেল। কিছুক্ষণ পর বুলবুলি বুঝতে পারলো যে মালি তাকে দেখছে। তাই সে উড়ে চলে গেল। পরদিনও মালি একই দৃশ্য দেখতে পেলো এবং পাখি মালিকে দেখে উড়ে চলে গেল। মালি তার অত্যন্ত প্রিয় ফুলগুলোর পাপড়ি ছেঁড়া দেখে কষ্টই পেলো।

মনে মনে বললো লাল গোলাপের প্রেমে পড়ার অধিকার বুলবুলির আছে কিন্তু ফুল হলো দেখা এবং শুঁকে গন্ধ নেয়ার বিষয়, ছিঁড়ে তছনছ করার জিনিস নয়। এটা তো ইনসাফ হতে পারে না। এই ফুল গাছগুলো কতো কষ্ট করে পালন করেছি, বুলবুলি কেন সেই ফুল নষ্ট করবে? তৃতীয় দিনও বাগান প্রেমিক লোকটি একই দৃশ্য দেখতে পেলো। ভীষণ রাগ হলো তার। বললো বুলবুলি! স্বাধীনতার অপব্যবহার করছো, নাহ? তোমার সাজা হলো খাঁচা, বুঝলে! ঠিকই সে লাল গোলাপ গাছে জাল পেতে বুলবুলিকে ধরে খাঁচায় পুরে রাখলো। বললো: তুই তোর স্বাধীনতার মূল্য বুঝিস নি। এখন এই খাঁচায় বন্দি থাক, তাহলেই বুঝতে পারবি ফুলের পাপড়ি ছেঁড়ার পরিণতি কীরকম!

বুলবুলি বললো: প্রিয় বন্ধু আমার! তুমি এবং আমি দুজনই লাল গোলাপের প্রেমিক। তুমি ওই গোলাপ চাষ করে আমাকে খুশি করছো। আবার আমার গান শুনে তুমি খুশি হচ্ছো। আমিও চাই তোমার মতো স্বাধীন থাকতে এবং বাগানে ঘুরে বেড়াতে। কিন্তু আমাকে খাঁচায় বন্দি করার কারণ কী? আমার গান যদি শুনতে চাও তাহলে তোমার বাগানই তো আমার বাসা। আমি দিনরাত ওই বাগানেই কিচির মিচির করে বেড়াবো। আমাকে বন্দি করার অন্য কোনো কারণ থাকলে বলো! মালি এ কথার জবাবে বললো: গান শোনাও, কিচির মিচির করো, তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু আমার প্রিয় ফুলগুলো নষ্ট করে আমাকে বিষিয়ে তুলেছো। যতক্ষণ তুমি স্বাধীন থাকো মনের সুখে গান গাও, তখন তোমার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

মালি আরও বললো: তুমি তখন আমার প্রিয় ফুলগুলোকে নষ্ট করে ফেলো। এটা হলো তোমার সেই অপকর্মের শাস্তি। তোমার শাস্তি থেকে অন্যরাও শিক্ষা নেবে। বুলবুলি বললো: হে অন্যায়কারী বে-ইনসাফ! তুমি আমাকে বন্দি করে আমার অন্তর চুরমার করে দিয়েছো! আমার আত্মাকেও কষ্ট দিচ্ছো! আবার শাস্তির কথা বলছো? তোমার কি মনে হয় না তোমার অন্যায় আমার চেয়ে বেশি? আমি তো একটা ফুল ছিঁড়েছি কিন্তু তুমি তো একটা হৃদয় ভেঙেছো। বুলবুলির কথাগুলো মালিকে ভাবিয়ে তুললো। তার কাছে কথাগুলো খুবই ভালো লেগেছে। সে খুশি হয়ে বুলবুলিকে ছেড়ে দিলো। ছাড়া পেয়ে বুলবুলি উড়াল দিয়ে গিয়ে বসলো লাল গোলাপের একটি শাখায়।

বৃদ্ধ মালিকে সে বললো: তুমি যেহেতু আমার উপকার করেছো আমিও তোমার উপকার করবো। তুমি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছো ঠিক সেখানটায় মাটির নীচে গুপ্তধন রাখা আছে। এক কলসি স্বর্ণমুদ্রা আছে ওখানে। সেগুলো নিয়ে খুশি হও। মালি মাটি খুঁড়ে সত্যি সত্যি গুপ্তধন পেলো। আশ্চর্য হয়ে সে পাখিকে বললো: তুই মাটির নীচে লুকানো গুপ্তধন দেখতে পেলি অথচ আমি যে তাকে আটকানোর জন্য ফাঁদ পেতে রাখলাম দেখলি না! বুলবুলি বললো: দুটি কারণ রয়েছে। এক, জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও বহু কারণে বিপদে পড়তে হয়, যাকে তাকদির বলা হয়। দুই, স্বর্ণের কোনো মূল্য আমার কাছে নেই। আমি লাল গোলাপের প্রেমিক। ওই লাল গোলাপ দেখে এতো বেশি মুগ্ধ হয়ে পড়েছিলাম যে আশেপাশের কোনো কিছুর প্রতি খেয়ালই করি নি। তাই তোমার পাতানো ফাঁদ নজরে পড়ে নি।

বুলবুলি আরও বললো: কোনো ব্যাপারেই আসলে সীমালঙ্ঘন করা ঠিক নয়। সীমালঙ্ঘন করলেই বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্টে পড়তে হয়। প্রেমের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। ভালোবাসায় বাড়াবাড়ি হয়ে যাবার ফলেই অন্ধ হয়ে পড়েছিলাম, ফাঁদ দেখতে পাই নি। এই বলেই বুলবুলি উড়াল দিয়ে গোলাপের কাছে একটি শাখায় গিয়ে বসে পড়লো।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/  ১৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।