জুলাই ০৩, ২০২২ ১৮:৪২ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি গল্প। গল্পটি এরকম: প্রাচীনকালে এক দরিদ্র যুবক ছিল। সে যেমন ছিল অলস তেমনি ছিল বেকার। অলসতার কারণেই সে কাজকর্ম করতো না। ঘরে শুয়ে বসেই দিনরাত কাটিয়ে দিতো আর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতো: 'হে আল্লাহ! আমাকে কষ্ট-ক্লেশ ছাড়া প্রচুর রিজিক দাও'!

এভাবে দিন, সপ্তাহ, মাস এমনকি বছরের পর বছর কেটে গেল। ওই অলস যুবককে আল্লাহ কোনো সম্পদ দিলেন না। যখনই তার খুব ক্ষুধা লাগত, ঘর থেকে বের হয়ে খাবার ভিক্ষা করতো। কিন্তু হঠাৎ একদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। এক রাতে যুবক যথারীতি প্রার্থনা করলো এবং যথারীতি আল্লাহর কাছে প্রচুর সম্পদ চেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। স্বপ্নে সে দেখলো এক লোক তাকে বলছে: "হে অলস যুবক! আমি তোমাকে একটা গুপ্তধনের ঠিকানা দেব, কিন্তু ওই গুপ্তধন পেতে হলে তোমাকে একটু চেষ্টা-তদবির করতে হবে, অলস থাকা যাবে না।" অলস যুবক জিজ্ঞেস করলো: কী সেই গুপ্তধন? কোথায় সেটা

তোমার প্রতিবেশীর দোকানে ছেঁড়া-খোঁড়া বর্জ্য কাগজের মধ্যে একটি টুকরো কাগজ আছে। ওই কাগজটি খুঁজে বের করতে হবে। সেই কাগজটিতে গুপ্তধনের মানচিত্র আঁকা আছে। তুমি যখন সেই মানচিত্রটি পাবে তখন গুপ্তধনের অবস্থান এবং কীভাবে তা বের করতে হবে সমস্ত নির্দেশনা সেখানে পেয়ে যাবে। মনে রেখো এই ধন কেবলমাত্র তোমারই জন্য। গুপ্তধনের চিঠি যদি অন্য কারও হাতে পড়ে তবে সে তা ব্যবহার করতে পারবে না। যাই হোক, এমন গোপনে কাজটি করার চেষ্টা করবে যেন কেউ জানতে না পারে। কাগজের টুকরাটি খুঁজে পেলে একটি নির্জন কোণে গিয়ে পড়ো! কাউকে দেখাবে না। যুবক ঘুম থেকে জেগে ভীষণ খুশি হয়ে গেল। পরের রাতেই সে প্রতিবেশীর দোকানে গেল। স্বপ্নে দেখা ম্যাপ অনুসরণ করে দোকানের বর্জ্য কাগজের কাছেও গেল।

দোকানদারের সঙ্গে খোশগল্প জমিয়ে গুপ্তধনের চিঠি উদ্ধার করে জামার পকেটে লুকিয়ে রাখলো এবং পড়ার জন্য শহরের বাইরে চলে গেল। গাঞ্জনামা মানে গুপ্তধনের ম্যাপে লেখা ছিল:  শহরের বাইরে একটি পুরোনো, অর্ধ-ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি দুর্গ আছে। ওই দূর্গের পেছনে আছে একটি গম্বুজ। ওই গম্বুজের পেছনে কেবলামুখি হয়ে দাঁড়িয়ে একটি তীর ছুঁড়বে। সেই তীর যেখানে পড়বে, সেখানে খুঁড়লেই গুপ্তধন খুঁজে পাবে। অলস যুবক ঠিকঠাকমতো তাই করল কিন্তু কিছুই খুঁজে পেল না। অলস যুবক মনে মনে বলল: হয়তো আমি ভুলভাবে তীর ছুঁড়েছি। আবার চেষ্টা করা যাক। তাই করলো যুবক। তীরটি যেখানে পড়লো সেখানে মাটি খুঁড়লো কিন্তু এবারও কোনো গুপ্তধন খুঁজে পেলো না।

যুবকটি প্রায়ই এভাবে তীর ছোঁড়ে এবং গুপ্তধনের সন্ধান করে। কিন্তু সফল হয় না। তবে সে হতাশও হয় না। সে ভাবে হয়তো তার তীর নিক্ষেপে ভুল হচ্ছে।  তাই সে প্রতিদিনই এ কাজ করতে লাগলো। এদিকে যুবককে এ কাজ করতে দেখে লোকজনের মাঝে কৌতূহল তৈরি হলো। তারা তাকে অনুসরণ করে জেনে গেল যে সে একটি গুরুত্বপূর্ণ গুপ্তধনের চিঠি পেয়েছে। এক কান দু'কান হতে হতে এ খবর পৌঁছে গেল সুলতানের কাছে। তিনি আদেশ দিলেন যুবকটিকে ধরে তার কাছে নিয়ে আসতে। পেয়াদারা যুবককে নিয়ে গেল সুলতানের কাছে। সুলতান তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ ব্যাপারটা কি? গুপ্তধনের চিঠি পেয়েছো শুনলাম। চিঠিটা কই? মাটি খুঁড়ে যতো সোনা- গয়না পেয়েছো সেগুলো দাও! তাহলে তোমাকে মুক্তির আদেশ দিতে পারি।

অলস যুবক ভয়ে ভয়ে সুলতান মানে রাজাকে পুরো ঘটনা খুলে বলল। রাজার হাতে গুপ্তধনের চিঠিটি দিয়ে শপথ ​​করে বললো যে সে একটি কালো মুদ্রাও খুঁজে পায় নি। গুপ্তধনের চিঠিটি আসলে ভুয়া। সুলতান হুট করেই যুবককে বিশ্বাস না করে আদেশ দিলেন যেন যুবকের বাড়িটি তল্লাশি করা হয়। গুপ্তধন খুঁজে পেলে তা যেন তার কাছে আনা হয়। পাইক-পেয়াদারা যুবকের বাড়ি তল্লাশি করে কিছুই পেলো না। রাজা এবার যুবককে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর রাজা নিজেই সর্বোত্তম তীর-ধনুকসহ একটি দল নিয়ে গেলেন সেখানে।  তিনি একটি তীর নিক্ষেপ করে মাটি খোঁড়ার নির্দেশ দিলেন কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না। লোভী রাজা ছয় মাস চেষ্টা চালিয়েও কাজ হয় নি। পুরো এলাকা ছোট-বড় গর্তে ভরে গেল। হতাশ রাজা গর্তগুলি ভরাট করার নির্দেশ দিলেন এবং যুবকটিকে নিয়ে আসতে বললেন।

যুবকটির চোখের দিকে তাকিয়ে গুপ্তধন পত্রটি তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন: "নাও! তুমি আমার মূল্যবান ছয়টি মাস নষ্ট করেছো! যুবক বললো: রাজা মশাই, আমি তো আগেই বলেছিলাম এই পত্রটি ভুয়া, আমিও প্রতারিত হয়েছি। রাজা বললেন: তোমার গুপ্তধন পত্র নিয়ে যাও। গুপ্তধন খুঁজে পেলে সেটা তোমার, আমি আর চাই না। আর খুঁজে না পেলেও দু:খ করো না বরং এমন গুপ্তধন সন্ধান করো যা কষ্ট ও পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত হয়। যুবকটি হতাশ হলো না। আবারও চেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল। পরের দিন সে আবার সেখানে গিয়ে বার কয়েক তীর ছুঁড়ে সফল না হয়ে বাড়ি ফিরে গেল। রাতের বেলা যুবক আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে তার মনের কথা খুলে বলে মুনাজাত করলো। বললো: আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দাও! আমি অলস এবং লোভী হয়ে তোমার কাছে পরিশ্রমহীন ধনভাণ্ডার চেয়েছিলাম। এখন তোমার কাছে তওবা করছি। আমার তওবা কবুল করো, আমাকে ক্ষমা করে দাও!

এরপর কেটে গেল বেশ কিছুদিন। একরাতে যথারীতি যুবক ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুমের ভেতর সে আগের লোকটিকে আবারও স্বপ্নে দেখলো। লোকটি যুবককে গুপ্তধন না পাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে বললো: তুমি গুপ্তধন পত্রের নির্দেশিকা বুঝতে ভুল করেছো। গুপ্তধন পত্রে লেখা ছিল 'তীরটা ধনুকে লাগিয়ে ফেলে দাও। এটুকুই। তোমাকে তো সর্বশক্তি দিয়ে ধনুক থেকে তীর ছুঁড়তে বলা হয় নি। তুমি গুপ্তধনের চিঠিটি মনোযোগ সহকারে পড়ো নি। গুপ্তধন পেতে তাড়াহুড়া করার কারণে বিষয়টি বুঝতে পারো নি। তুমি ধনুকে তীরটা লাগিয়ে ছেড়ে দাও! তীর যেখানে পড়বে সেখানেই মাটি খুঁড়লে গুপ্তধন পেয়ে পাবে। ঘুম থেকে জেগে উঠে যুবক আবারও গুপ্তধন পত্রে দৃষ্টি দিয়ে দেখলো স্বপ্নে দেখা লোকের কথাই ঠিক। তীর ছুঁড়তে বলা হয় নি। তাড়াড়াড়ি ছুটে গেল স্বপ্নে পাওয়া গুপ্তধন পত্রের ম্যাপ ধরে। ধনুকে তীর লাগিয়ে ছেড়ে দিলো। তীর তার পায়ের সামনেই পড়লো। সেখানে মাটি খুঁড়ে পেয়ে গেল স্বপ্নের গুপ্তধন।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ৩

মূল ফার্সি গল্পের রূপান্তর: নাসির মাহমুদ