নভেম্বর ২৩, ২০২২ ১৫:৫৬ Asia/Dhaka

প্রিয় পাঠক-শ্রোতা! সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। ইরানের কালজয়ী গল্পের পসরা "গল্প ও প্রবাদের গল্প" নিয়ে আজও হাজির হয়েছি। আজকের আসরে আমরা উপস্থাপন করবো চমৎকার একটি প্রাচীন গল্প।  গল্পে যাবার আগে ক'লাইন কবিতা শোনা যাক:

 

জীবনভরে লাগাম ধরে টানলে পেছন হেসে

অবশেষে বসালে ছাই-ভস্মে ভালোবেসে!

হৃদয়কাব্য কেড়ে নিয়ে তাও রেখেছো ফেলে

পড়ো নি তার পংক্তি কোনো মনের দু'চোখ মেলে

 

তোমার দয়ায় পুড়ে হলো যে হৃদয়ে ক্ষত

তার বিয়োগে অশ্রুও ঠিক ঝরিয়েছো দেখি!

সেসব দিলাম না হয় ছেড়ে, একবার বললে না তো

কোন সে আশায় রইলে পড়ে আমিহীন একাকী?

 

জীবনটা কি চাওয়া পাওয়ার হিসেবের হালখাতা

যাবার আগে আপন হাতে লেখা ঠিকানাটা?

                                - নাসির মাহমুদ

এবার গল্পের ভুবনে প্রবেশ করা যাক। আপনারা মাছ শিকারী পাখি তো চেনেন? মাছরাঙা এবং বক। আমরা বকের কথা বলছি। বক খুব চালাক পাখি। চোখ বুজে বসে থাকে আর মাছ সামনে এলেই তার বিশাল ঠোট দিয়ে শিকার করে খায়।

ফার্সি ভাষায় বক পাখিকে বলা হয় মাছ খেকো মুরগি। আমরা বকই বলবো। একটা বক বয়সের ভারে অনেকটা ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে। আগের মতো সাঁই করে উড়ে গিয়ে কোনো জলার খুঁটিতে বসে হুট করেই মাছ শিকার করে জীবনের ক্ষুধা মেটানোর অবস্থা আর নেই। তাই সে বসে থাকে পুকুরের পাড়ে কিংবা ডোবার তীরে। এরকমই একটি জলাশয়ের তীরে বসে ছিল সে। দেখছিলো জলের ভেতর ছোটো বড় মাছেরা দৌড়াদৌড়ি করছে। মাছগুলোকে দেখে বকের ভীষণ আফসোস হচ্ছিলো। আগের যৌবন তো নেই যে খপ করে ঠোঁট বসিয়ে দেবে। এখন তো ছোট্ট কোনো মাছও সে শিকার করতে পারে না। দু:খে-কষ্টে চোখ বুজে খালি আফসোস করতে লাগলো বক। ভাবলো: এভাবে চলতে থাকলে তো ক্ষুধায় মারা যেতে হবে।

পানির দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই মনে মনে একটা ফন্দি আঁটলো বক যাতে সে ক্ষুধা মেটাতে পারে। জলাশয়ের পাড়েই ছিল কাঁকড়ার গর্ত। গর্তের পাশে গিয়ে কান্নার সুর তললো বক। কাঁকড়া জিজ্ঞেস করলো: কী হয়েছে?

বক বললো: এই পৃথিবীতে আমার তো আর আনন্দ-খুশি বলতে কিছু থাকলো না। কতদিন হলো এই জলাশয়ের তীরে আছি। আজ দেখলাম দুই মাছ শিকারী এদিক দিয়ে যাচ্ছিলো। তারা যখন জলাশয়ে প্রচুর মাছ দেখলো বললো দুই তিন পর অন্য জলাশয়ে মাছ ধরা শেষ হলে এখানে আসবে মাছ ধরতে। কাঁকড়া খবরটা মাছগুলোর কানে পৌঁছালো। মাছেরা তো ভয়ে সবাই সমবেত হলো। একটি মাছ বললো: আমরা তাহলে কী করবো এখন! কীভাবে এখান থেকে পালাবো। একমাত্র কেউ যদি আমাদের সাহায্য করতে পারে সে হলো বক পাখি। তার কাছেই তাহলে যাওয়া যাক। কাঁকড়াকে নিয়ে মাছেরা গেল বকের কাছে পরামর্শ করতে। বক মাছগুলোকে দেখে খুশি হয়ে গেল এবং বুঝলো তার কৌশল কাজে লেগেছে। মাছেরা সরাসরি জানতে চাইলো: মাছ শিকারীরা কবে নাগাদ আসবে বলে মনে করো! বক তার পাখাগুলো গুটিয়ে নিয়ে বললো: সঠিক বলতে পারবো না তবে মনে হচ্ছে দু'একদিনের মধ্যেই আসবে। মাছেরা বললো: আমাদের তুমি সাহায্য করবে?

বক তো এই প্রস্তাবের জন্যই অপেক্ষা করছিলো, বললো: অবশ্যই সাহায্য করবো। এটা সত্য যে আমরা পরস্পরের শত্রু, তাই বলে কি বিপদের সময় একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসবো না? এখান থেকে একটু দূরেই আরেকটা জলাশয় আছে বেশ বড়। দুর্গম হবার কারণে কোনো মাছ শিকারীই ওখানে মাছ ধরতে যায় না। আমি তো এখন বুড়ো এবং দুর্বল হয়ে গেছি, তোমাদের সবাইকে একবারে নিয়ে যেতে পারবো না। সুতরাং কয়েকদিন সময় লাগবে। মাছেরা মেনে নিলো। বক এবার তার কাজ শুরু করে দিলো। প্রতিদিন দুইবার করে কিছু কিছু মাছ তার ঠোঁটে করে নিয়ে যেতে লাগলো। কয়েকদিন বক এ কাজ করলো। এভাবে কয়েকদিন যাবার পর কাঁকড়া বককে বললো: খুব ইচ্ছে করছে নতুন জলাশয় মানে হ্রদটা দেখবো। সেইসঙ্গে মাছগুলোর সুখী জীবনের খবর তাদের বন্ধুদের কাছে পৌঁছাবো।

কাঁকড়ার আগ্রহে বক উদ্বিগ্ন হলেও বললো: ভালোই তো! চলো, এক্ষুণি রওনা হই। আমার পিঠে বসো! এক ঘণ্টাও লাগবে না, ফিরে আসবো আমরা। কাঁকড়া রাজি হলো এবং বকের পিঠে চড়ে বসলো। উড়াল দিলো বক। বকের উদ্দেশ্য ছিল কাঁকড়াকে দূরে কোথাও নিয়ে রেখে আসবে যাতে ফিরে আসতে না পারে। কিন্তু কাঁকড়া টিলার ওপর মাছের কাঁটা দেখে বুঝে ফেললো বকের প্রতারণা। সে নিজেও যে নিরাপদ নয়-এটা বুঝে ফেললো কাঁকড়া এবং প্রতিশোধ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। কাঁকড়া বকের গলায় তার শক্ত দুই পাঞ্জা দিয়ে বৃত্ত রচনা করে ধরলো।

এরপর গলায় সজোরে চাপ দিলো। বকের দম বন্ধ হয়ে গেল এবং উভয়েই মাটিতে ধপাস করে পড়লো। বকের মৃত্যু নিশ্চিত হবার পর কাঁকড়া গলা ছেড়ে দিলো এবং দ্রুত মাছগুলোর কাছে গিয়ে বকের প্রতারণা আর বন্ধুদের মৃত্যুর খবর জানালো। মাছেরা খুব কষ্ট পেলো। তবে তাদের শিক্ষা হয়েছে: কখনোই শত্রুর কথা বিশ্বাস করতে নেই। শত্রুর কাছ থেকে কোনো কল্যাণ আশা করতে নেই।#

মূল ফার্সি থেকে রুপান্তর: নাসির মাহমুদ

পার্সটুডে/এনএম/২৩