গল্প ও প্রবাদের গল্প:
প্রবাদের গল্প: একটা কাঁচা ইটও রেখো পাতিলের পর
প্রিয় পাঠক-শ্রোতাবন্ধুরা! সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। ইরানের কালজয়ী গল্পের পসরা "গল্প ও প্রবাদের গল্পের" আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি প্রবাদের গল্প। প্রবাদটি হলো: 'একটা কাঁচা ইটও রেখো পাতিলের পর'।
গল্পটি এরকম: সবেমাত্র কণেকে বরণ করে নেয়া হয়েছে বরের ঘরে। নতুন বৌ। কী-ই বা আর জানে সংসার ধর্মের। ঘরকন্নার কাজ, রান্নাবান্না-এসব তো অভিজ্ঞতার ব্যাপার। স্বামীর ঘরে যাবার আগে কম মেয়েই এসব শিখে টিকে নেয়। কিন্তু সমাজে অনেক রীতিনীতি আছে। বৌ যতই নতুন হোক, যতই মেহেদির রঙ স্পষ্ট রঙিন দেখা যাক কিছু কিছু নিয়ম তাকে মানতেই হয়।
সেরকম রীতি অনুযায়ী বিয়ের পর সপ্তাখানেক স্বজনদের বাসায় বাসায় আপ্যায়ন আর বধুবরণের আনন্দে কাটলো। দ্বিতীয় সপ্তাও নববধূ এটা-সেটা বলে খাবার পাকানো থেকে বিরত থাকলো। স্বামি বেচারা বুঝতেই পারলো না কিছু। তৃতীয় সপ্তা এলো। জামাই বাবাজি এলো বাসায়। বললো: আগামিকাল রাতে আমার বাবা-মা, ভাই-বোন বাসায় আসবে। তুমি তাদের জন্য ভালো কিছু খাবার তৈরি করলে খুশি হবো। নববধূর অন্তর তো গলে পানি হয়ে যাবার উপক্রম, ইচ্ছে হচ্ছে মাটির নীচে আশ্রয় নিতে। আপন স্বামিকেও বলতে পারছে না যে রান্নাবান্না করতে জানে না সে কিংবা সেদিন পর্যন্ত পাকশাকের কোনো অভিজ্ঞতা নেই তার। বুঝতে পারছিলো না কী করবে এখন। অনেক ভাবলো নববধূ।
নববধূ ভাবলো: রান্নাবান্না কী এমন আর কাজ! প্রতিবেশি মহিলার কাছে গিয়ে জেনে নেবো। ভাবতেই কাজ শুরু হয়ে গেল। বধূ সোজা চলে গেল প্রতিবেশি ভাবির কাছে। নববধূকে দেখে প্রতিবেশি মহিলা ভীষণ খুশি হয়ে গেল। বললো: স্বাগতম! তোমার জন্য যে-কোনো রকমের সহযোগিতা করতে আমি সদাপ্রস্তুত। নববধূ বললো: রান্নাবান্না আমার খুব একটা ভালো না হলেও মন্দ বলা যাবে না। তবে সাত আটজনের জন্য আমি কখনও রান্না করি নি ভাবি। সেজন্য এসেছি তোমার কাছে জানতে যে আট জনের জন্য "চেলু খোরেশ" মানে ভাতের সঙ্গে ডাল-মাংসের তরকারি পাকাতে কী পরিমাণ মাংস-ডাল ইত্যাদি দিতে হবে। কতটুকু চাল লাগবে।
প্রতিবেশি ভাবী বুঝে ফেললো যে নববধূ রান্নাবান্নাই জানে না। সেটাকে এড়িয়ে গিয়ে বললো: আট জনের জন্য চাল লাগবে এক কেজির মতো। চালগুলোকে আগে একটা পাতিলে ভিজিয়ে রাখতে হবে পানিতে যেন ভালো করে ভেজে। নববধূ সঙ্গে সঙ্গেই বললো: হ্যাঁ, এটা তো আমি মোটামুটি জানতাম। প্রতিবেশি ভাবী বললো: গোশতকে ছোটো ছোটো করে কেটে নিতে হবে। সেগুলোকে ভালো করে ধুয়ে আলাদা একটা পাতিলে রান্না করতে হবে। তারপর … ইত্যাদি বর্ণনা দিচ্ছিলো। কিন্তু বর্ণনা শেষ না হতেই নববধূ চলে যেতে চাইলো। বললো: জি, এগুলো তো আমি নিজেই জানি।
নববধূর জবাবে প্রতিবেশি ভাবীর ভালো লাগলো না। তার চীৎকার করে বধূকে বলতে ইচ্ছে করছিলো: সবই যদি জানো তাহলে আমার কাছে এলে কেন? আর যদি না-ই জানো তাহলে কেন আমার কথা মাটিতে না পড়তেই বলো জানি, জানি? কিন্তু বধূকে সে কিছুই বললো না। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো এমন শিক্ষা দেবে যাতে আজীবন সে না ভোলে। বধূকে শুনিয়ে শুনিয়ে জোরে জোরে বললো: মাথাগুণে জনপ্রতি এক মুষ্টি ভাঙা মটরশুটির ডাল তরকারিতে দেবে। নববধূ যেতে যেতে বললো: জি, জি! এটাও জানি আমি। সবশেষে প্রতিবেশি ভাবী বললো: পোলাওকে যখন পাতিলে ঢালবে একটা বড় কাঁচা ইট দিয়ে চাপা দিয়ে রাখবে যাতে ভালো করে সিদ্ধ হয়।
নববধূ বললো: হুমম জানি! আমাদের বাসায় কয়েকটা কাঁচা ইটও আছে। ভাবীর দিক-নির্দেশনা আর নববধূর সবজান্তা ভাবের আদান-প্রদান শেষ হলো। পরস্পরে খোদা হাফেজি করলো। বধূ বাসায় ফিরতে ফিরতে মনে মনে হাসলো আর বললো: বুঝতেই পারে নি যে আমি রান্নাবান্না জানি না! রান্নাও শেখা হলো আবার এমনভাবে কথা বলেছি যেন কাল কেউ বলে বেড়াতে না পারে যে আমাদের পাড়ার নববধূ রান্না জানে না। বাসায় ফিরে বধূ দ্রুত কাজে লেগে গেল। ভাবীর নির্দেশনা মেনে তরকারি আর ভাত চড়ালো চুলায়। সবকিছু ঠিকঠাকমতো বসিয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি বাসা থেকে একটা বড় কাঁচা ইট এনে পোলাওর পাতিলের ওপর চাপা দিলো। কাঁচা ইট ভাতের পাতিলের ভাঁপে আস্তে আস্তে গলতে শুরু করলো। স্বাভাবিকভাবেই ওই ইট কাদায় পরিণত হয়ে ভাতের পাতিলের ভেতর পড়লো এবং যা হবার তাই হলো-ভাতগুলো কাদাময় হয়ে গেল। রাতে যথারীতি নববধূর প্রিয় অতিথিবৃন্দ পৌঁছে গেল। বধূয়া তাঁদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক কূশল বিনিময় করে বললো: আপনারা বসুন! আমি একটু রান্নাঘরে যাবো, ডিনারের ব্যবস্থা করবো। স্বামিকে বললো দস্তরখান বিছাও! আমি পোলাও আর চেলো খোরেশ নিয়ে আসছি। দস্তরখান বিছাতে বিছাতে স্বামি রান্নাঘরে নববধূর চীৎকার শুনতে পেলো। স্বামি এবং অতিথিরা সবাই গেল রান্নাঘরে। বধূর মুখ বন্ধ। ইঙ্গিতে ভাতের পাতিল দেখালো রান্নাঘরের ফ্লোরে।
কী আর করা। সে রাতে অতিথিরা শুধু মটরশুটি মাংসের তরকারিই খেলো। নববধূ শেষ পর্যন্ত সব স্বীকার করতে বাধ্য হলো এবং বলতে হলো যে তার রান্না করার অভিজ্ঞতা নেই। এই ঘটনার পর থেকে যখনই কেউ নববধূর মতো না জেনেও জানার ভান করতো তখনই এই প্রবাদটি বলতে শুরু করলো: একটা কাঁচা ইটও রেখো পাতিলের পর।#
মূল ফার্সি থেকে রূপান্তর: নাসির মাহমুদ
পার্সটুডে/এনএম/২৯