নভেম্বর ৩০, ২০২২ ১৫:০৩ Asia/Dhaka

সুপ্রিয় পাঠক- শ্রোতা! সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। ইরানের কালজয়ী গল্পের পসরা "গল্প ও প্রবাদের গল্পের" আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি হাসির গল্প। গল্পটিকে ঘিরে একটি প্রবাদের জন্ম হয়েছে।

প্রবাদটি হলো: 'ওর মুরগির পা একটা'। বিখ্যাত কৌতুকবিদ মোল্লা নাসরুদ্দিন হোজ্জার জীবনের একটি কাহিনী অবলম্বনে তৈরি হয়েছে প্রবাদটি। নাসরুদ্দিন হোজ্জার কথা তো জানা আছে নিশ্চয়ই। বেশ প্রাচীনকালে এই নামের এক বৃদ্ধ ছিলেন। উপস্থিত বুদ্ধি আর কৌতুকপূর্ণ কথাবার্তার জন্য তিনি ছিলেন বেশ খ্যাতিমান এবং সর্বমহলে সমাদৃত। তো তিনি যে শহরে বসবাস করতেন সেই শহরে নতুন একজন গভর্নর এলো।

নতুন গভর্নরকে স্বাগত জানানো সে সময়কার একটা সাধারণ ভদ্রতা ছিল। ওই সৌজন্য দেখাতে শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সকলেই গেল গভর্নরের প্রাসাদে। খালি হাতে তো আর যাওয়া যায় না। সকলেই কিছু না কিছু হাদিয়া নিয়ে গেল গভর্নরের সঙ্গে পরিচিত হতে। মোল্লা নাসরুদ্দিন অবশ্য এই সৌজন্যের ব্যাপারটা তেমন পছন্দ করতো না। কিন্তু তার পছন্দে কী আসে যায়। মোল্লাও তো সেই সমাজের একজন অভিজাত লোক হিসেবে পরিচিত, তাই তাকেও যেতেই হবে গভর্নরের সাক্ষাতে। এর কোনো বিকল্প নেই। সুতরাং সে তার স্ত্রীকে বললো: মুরগির পাল থেকে একটা মুরগি ধরে সুন্দর করে পাকাও! নতুন গভর্নর এসেছে, তার জন্য হাদিয়া হিসেবে নিয়ে যাবো। তার স্ত্রী যথাযথ যত্নের সঙ্গে একটা মুরগি পাক করে দিলো। বড় একটা ট্রে-তে মুরগিটাকে রেখে তার চারপাশে সবজি, সালাদ ইত্যাদি দিয়ে গার্নিশ করে দিলো। সবশেষে তার উপরে সরপোষ দিয়ে সুন্দর, পরিষ্কার একটা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলো। সুসজ্জিত ট্রে টা এবার মোল্লা নাসরুদ্দিনের হাতে দিলো। মুরগির তরতাজা মশলা আর জাফরানের গরম গরম সুবাস মোল্লার নাক ভেদ করে বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে দিয়ে একেবারে পেটের মাঝখানে পৌঁছে গেল। মনে মনে বললো: আহা রে! যদি ওই নয়া গভর্নর না আসতো! তাহলে তো তার জন্য এই মজাদার সুস্বাদু পেট মোচড়ানো আজব ঘ্রাণময় মুরগির খাবারটা নিয়ে যেতে হতো না। বৌয়ের সঙ্গে খোশ গল্প করতে করতে পেট ভরে খেতে পারতাম আর দু'জনে খুনসুটি করে কাটাতে পারতাম। কিন্তু এসব ভেবে আর কী হবে। উপায় তো নেই। যেতেই হবে।

বেচারা অবশেষে পাকানো মুরগির ট্রে টি হাতে নিয়ে রওনা হলো গভর্নরের বাসভবনের উদ্দেশে। পথে যেতে যেতে বেচারা বেশ কয়েকবার সরপোশটা তুলে বৌয়ের নিজ হাতে পাকানো মুরগির দিকে তাকিয়ে দেখলো। পথে হাঁটতে হাঁটতে মোল্লা মারাত্মক ক্ষুধার্তও হয়ে পড়লো। ক্ষুধা না লাগলেও ওই মুরগির ঘ্রাণ মোল্লার রসনায় সুড়সুড়ি দিয়ে যাচ্ছিলো। ইসসস কেমন জানি মজা হয়েছে। একটু চেখে দেখলে তো মন্দ হয় না। মুরগির ঘ্রাণ মোল্লাকে এমনভাবে প্ররোচিত করলো যে বেচারা আর টিকে থাকতে পারলো না। কাজটা করেই বসলো। সরপোশটা সরিয়ে মুরগির একটা রান ছিঁড়ে মজা করে খেয়ে ফেললো। খেয়েদেয়ে মুখ-ঠোঁট পরিস্কার করতে করতে আপনমনে বললো: হায় হায়! আমি কী করলাম এটা? গভর্নর যদি দেখে মুরগির পা একটা নেই, যদি জিজ্ঞেস করে আমাকে … জবাবে কী বলবো? নাকি বাসায় ফিরে যাবো? পরদিন আরেকটা আস্ত মুরগি পাক করে নিয়ে দেখা করতে যাবো গভর্নরের সাথে? 

কিছুক্ষণ ভাবলো মোল্লা। তারপর সিদ্ধান্ত নিলো এক পা বিহীন মুরগিটা হাদিয়া হিসেবে নিয়েই দেখা করতে যাবে গভর্নরের সঙ্গে। ছেঁড়া পা-টাকে গার্নিশের সব্জি দিয়ে ঢেকে দিয়ে আবারও হাঁটতে লাগলো গভর্নরের বাসভবনের দিকে। একটা সময় পৌঁছে গেল মোল্লা গভর্নরের বাসায়। মোল্লা তার শহরে গভর্নরের শুভাগমনকে স্বাগত জানালো এবং তার মঙ্গল কামনা করলো। তারপর বললো: আমার স্ত্রী খুব ভালো রাঁধুনী। তাকে বলেছিলাম আপনার জন্য যত্ন সহকারে মজাদা করে একটা মুরগি পাকিয়ে দিতে। গভর্নর মোল্লার স্ত্রী ও মোল্লার দেয়া উপহার সাদরে গ্রহণ করলো এবং ধন্যবাদ জানালো। ট্রে থেকে সরপোশটা সরিয়ে পাশে রাখলো এবং সংক্ষিপ্ত নজর বুলিয়েই গভর্নর বুঝতে পারলো: ট্রে-তে সাজানো মুরগির পা একটা।

গভর্নর হালকা মুচকি হেসে বললো: তোমার স্ত্রী সম্ভবত মুরগির একটা রান খেয়ে দেখেছে নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে সত্যি খাবারটা মজা হয়েছে কিনা! মোল্লা নাসরুদ্দিন বুঝে উঠতে পারছিলো না কী জবাব দেবে! হঠাৎ তার চোখ পড়লো গভর্নরের বাসার জানালা দিয়ে ভেতরের সুইমিং-পুলের দিকে। সেখানে কটা রাজহাঁস এক পায়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মোল্লা এবার পরিপূর্ণ আস্থা নিয়ে হেসে হেসে বললো: না জনাব! ও খুব ভালো রাঁধুনী। খাবার চেখে দেখার প্রয়োজন পড়ে না তার। গভর্নর বললো: তাহলে আমার জন্য আনা মুরগির পা একটা কেন? মোল্লা হাসি দিয়ে বললো: আমাদের শহরের সকল মুরগিরই পা একটা। আপনি কষ্ট করে আপনার ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখুন! সবাই এক পায়ে দাঁড়ানো। গভর্নর রাজহাঁসের দিকে তাকালো। রাজহাঁসের দিকে তাকাতেই কর্মীরা লাঠি দিয়ে হাসগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে গেল খোঁয়াড়ের দিকে। মোল্লাকে তখন গভর্নর বললো: হাঁসগুলো দু'পায়ে দৌড়ে যাচ্ছে, দেখলেন তো! মোল্লা বললো: প্রথমত ওই রকম একটা লাঠি দিয়ে আপনাকে কেউ যদি তাড়াতো তাহলে আপনি দুই পা থাকা সত্ত্বেও আরও দুই পা ধার করতেন। দ্বিতীয়ত আমি এই মুরগিটিকে তখনই ধরেছি যখন সে এ পায়ে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলো। গভর্নর বুঝতে পারলো যে মোল্লার সঙ্গে কথা বলে পার পাওয়া সহজ হবে না। কর্মচারীদের ডেকে বললো: এই এক পায়ের মুরগিটা বাসার ভেতরে নিয়ে যাও! বৌ-ছেলে-মেয়েদের নিয়ে আমরা খাবো।

এরপর থেকে কেউ যখন অযৌক্তিক ও অসঙলগ্ন কথাবার্তা বলে এবং তার কথার যথার্থতা প্রমাণ করতে কিংবা প্রতিষ্ঠিত পীড়াপীড়ি করে তখনই বলতে শোনা যায় এই প্রবাদটি: ওর মুরগির পা একটা।#

মূল ফার্সি গল্পের রূপান্তর: নাসির মাহমুদ

পার্সটুডে/এনএম/৩০