জুন ১৯, ২০১৬ ১৪:২৪ Asia/Dhaka

গত পর্বের আলোচনায় আমরা পবিত্র রমজান মাসে শ্রেষ্ঠ নৈতিক গুণ অর্জনের চেষ্টা সম্পর্কে কথা বলেছি। বিশ্বনবী (সাঃ) বলেছেন, মানুষের সেরা নৈতিক গুণগুলোকে পূর্ণতার শিখরে পৌঁছে দেয়াই ছিল তাঁর মিশন।

"শ্রেষ্ঠ নৈতিক গুণাবলী" বলতে কেবল উন্নত নৈতিক চরিত্র বা সৎ স্বভাবকেই বোঝায় না। তিনি এ ধরণের গুণের কিছু দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। যেমন, যে তোমাকে কষ্ট দিয়েছে তাকে ক্ষমা কর, যে তোমায় বঞ্চিত করেছে তাকে দান কর, যে তোমার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছে তাকে কাছে টান, তোমার অসুস্থতার সময় তোমাকে দেখতে আসেনি, তুমি তার অসুস্থতার সময় তাকে দেখতে যাও ইত্যাদি।

রোজার উদ্দেশ্য হচ্ছে খোদা-ভীতি অর্জন ও সংযম চর্চা করা। বিশ্বনবী (সা.)'র একটি হাদিস অনুযায়ী মানুষের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রোজা রয়েছে। যেমন, চোখের রোজা, হাতের রোজা, পায়ের রোজা, মুখের বা জিহ্বার রোজা ইত্যাদি। নিষিদ্ধ দৃশ্য দেখা থেকে দৃষ্টিকে বিরত রাখা চোখের রোজা, নিষিদ্ধ পথে চলা থেকে পাকে বিরত রাখা হচ্ছে পায়ের রোজা, হাত দিয়ে কোনো অবৈধ কাজ না করা হচ্ছে হাতের রোজা, নিষিদ্ধ কথা না বলা হচ্ছে মুখের রোজা।

পরকালের মুসাফিরের কাছে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করাই হয় একমাত্র ভাবনা। তার কাছে দুনিয়ার চাকচিক্য বা জাঁকজমকের কিছুই ভালো লাগে না। তেমনি প্রকৃত রোজাদারের কাছেও খোদার সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কিছুই ভালো লাগে না। বিনম্র ও ভগ্ন-হৃদয় খোদা-প্রেমিকের মতই প্রকৃত রোজাদারের কাছে আল্লাহর স্মরণ ছাড়া অন্য কিছুই প্রিয় নয়। আসলে অতি উচ্চ পর্যায়ের রোজাদাররা কেবল পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তিই বর্জন করেন না, তারা সেইসব বিষয়ও বর্জন করেন যা মনকে সামান্য সময়ের জন্যও আল্লাহর স্মরণ ও প্রেম থেকে মানুষকে উদাসীন করে দেয়।

রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস রমজানের প্রায় এক তৃতীয়াংশ আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে। এ সময়ে আমরা কতটা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জন করতে পেরেছি ? আমরা কি এখনও ইফতার ও সাহরির সময় রসনা-বিলাসে নিয়োজিত হচ্ছি না? অতি-ভোজন, অতিরিক্ত কথা বলা ও অতিরিক্ত ঘুমানো এবং অন্যান্য অপছন্দনীয় অভ্যাস থেকে আমরা নিজেকে কতটা মুক্ত করতে পেরেছি? কান ও চোখকে কতটা সংযত করতে পেরেছি? কাম, ক্রোধ, লোভ, ক্ষমতা-প্রেম, হিংসা- এইসব বিষয়কে কি আমরা আমাদের দাসে পরিণত করতে পেরেছি, না এখনও এইসব বিষয়ের দাস হয়ে আছি।

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.)-কে বলেছেন:হে আলী! তুমি কি ছয় লাখ ভেড়া চাও? ছয় লাখ দিনার চাও? না ছয় লাখ অমূল্য উপদেশ বাণীর বাক্য চাও? আলী (আ.) শেষোক্ত প্রস্তাবে সায় দিলেন। মহানবী (সা.) বললেন, যদি ছয় লাখ উপদেশের সারাংশ এই ছয়টি বাক্য:

১. যখন দেখবে যে লোকেরা নফল বা মুস্তাহাব ও নানা গুণ চর্চা নিয়ে ব্যস্ত তুমি তখন ফরজ বা ওয়াজিব কাজ বা দায়িত্বগুলোকে পরিপূর্ণ করা নিয়ে ব্যস্ত থাক।

২. যখন দেখবে যে লোকেরা দুনিয়া (যেমন, বাড়িঘর, বাহন ইত্যাদি) নিয়ে ব্যস্ত, তখন তুমি পরকাল নিয়ে ব্যস্ত হবে।

৩. যখন দেখবে যে লোকেরা অন্যের দোষ-ত্রুটি নিয়ে সমালোচনায় ব্যস্ত তখন তুমি তোমার নিজের দোষ-ত্রুটি (সংশোধন) সম্পর্কে সক্রিয় হবে।

৪.যখন দেখবে যে লোকেরা দুনিয়াকে (বাড়িঘর, বাহন. ঘরের আসবাবপত্র ইত্যাদিকে) সুসজ্জিত করছে (অপ্রয়োজনীয় বিলাস সামগ্রী কিনছে), তখন তুমি তোমার পরকালকে সুসজ্জিত করা নিয়ে ব্যস্ত হবে।

৫. যখন দেখবে যে লোকেরা বেশি বেশি ইবাদত করছে তখন তুমি তোমার ইবাদতকে খালেস বা একনিষ্ঠ করা নিয়ে সক্রিয় হবে।

৬. যখন দেখবে যে লোকেরা সৃষ্টির আশ্রয় নিচ্ছে, তখন তুমি স্রস্টার আশ্রয় নেবে।

প্রকৃত রোজাদার হতে হলে নফসের সঙ্গে সংগ্রামের অভ্যাস থাকতে হবে। এ অভ্যাস কেবল পবিত্র রমজানেই হঠাৎ করে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই এ জন্য সারা বছরই প্রস্তুতি নিতে হবে। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, নফসের সঙ্গে জিহাদ হচ্ছে শ্রেষ্ঠ জিহাদ।

পাশবিক স্তরে থেকে-যাওয়া আমাদের নফসের বস্তুগত চাওয়া-পাওয়ার যেন শেষ নেই। এর কারণ হল, আমাদের আত্মার ওপর এত বেশি ময়লা জমে গেছে যে আমরা শয়নে-স্বপনে কেবল সেসব নিয়েই ভাবি যেসবকে আপাত দৃষ্টিতে নগদ ও মধুর বলে মনে হয়। আমরা মনে করি যে কেবল বস্তুগত বিষয়ের মধ্যেই রয়েছে সুখ। কিন্তু প্রকৃত প্রশান্তি রয়েছে কেবল খোদার নৈকট্য অর্জন ও খোদা-প্রেমের মধ্যেই। কারণ, পৃথিবীর সব কিছুই ক্ষণস্থায়ী। পার্থিব সম্পদ, ক্ষমতা, চাকচিক্য-এসব দু'দিনের ভোগের সামগ্রী মাত্র। তা-ও এইসব বিষয়ও সবার ভাগ্যে জোটে না মানুষের নানা দুর্বলতার কারণে। তাই এই পার্থিব জগতের ক্ষণস্থায়ী সুখ ও সম্পদ লাভের আশায় পরকালকে বরবাদ করা হবে সবচেয়ে বড় বোকামি।

পার্থিব জীবনের সম্পদ যেটুকু না হলেই নয়, কেবল সেটুকু সংগ্রহের জন্য সচেষ্ট হলে তাতে দোষ নেই। কিন্তু প্রয়োজনের চেয়েও বেশি সম্পদ গড়ে তোলার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করা এমন এক স্বভাব যা মানুষের আত্মাকে কলুষিত করে ফেলে এবং এ ধরনের আত্মা মুক্তির পথ হারিয়ে ফেলে। অন্যদিকে মহামানবরা পার্থিব সম্পদ, সুখ, ক্ষমতা ও সম্মানের জন্য প্রতিযোগিতাকে শিশুসুলভ খেলার মতই হাস্যকর বা মূল্যহীন বলে মনে করেন।

এবারে পড়া যাক অর্থসহ রমজানের দশম রোজার দোয়া:

الیوم العاشر : اَللّـهُمَّ اجْعَلْنی فیهِ مِنَ الْمُتَوَکِّلینَ عَلَیْکَ، وَاجْعَلْنی فیهِ مِنَ الْفائِزینَ لَدَیْکَ، وَاجْعَلْنی فیهِ مِنَ الْمُقَرَّبینَ اِلَیْکَ، بِاِحْسانِکَ یا غایَةَ الطّالِبینَ .

হে আল্লাহ! তোমার প্রতি যারা ভরসা করেছে আমাকে সেই ভরসাকারীদের অন্তর্ভূক্ত কর । তোমার অনুগ্রহের মাধ্যমে আমাকে শামিল করো সফলকামদের মধ্যে এবং আমাকে তোমার নৈকট্যলাভকারী বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত করে নাও । হে অনুসন্ধানকারীদের শেষ গন্তব্য ।#