নভেম্বর ১১, ২০১৬ ১৫:০৯ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই হযরত সুলাইমান (আ.)-এর নাম শুনেছ। তিনি ছিলেন দাউদ (আ.)-এর সুযোগ্য সন্তান। জ্বীন-পরী, দেও-দানব, পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, পানি, বায়ু- বলতে গেলে প্রায় সব সৃষ্টিই ছিল তার হুকুমের অনুগত। হযরত সুলায়মান (আ.)-এর বিশাল সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস।

মহান রাব্বুল আলামীন আল-কুরআনে বলেছেন, "আমি দাউদ ও সুলাইমানকে জ্ঞান দান করলাম এবং তারা বলল, সেই আল্লাহর শোকর যিনি তাঁর বহু মু'মিন বান্দার ওপর আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। আর দাউদের উত্তরাধিকারী হলো সুলাইমান এবং সে বলল, লোকেরা আমাকে শেখানো হয়েছে পাখিদের ভাষা এবং আমাকে দেয়া হয়েছে সব রকমের জিনিস। অবশ্যই এটি আল্লাহর সুস্পষ্ট অনুগ্রহ। সুলাইমানের জন্য জিন মানুষ ও পাখিদের সৈন্য সমবেত করা হয়েছিল এবং তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা হতো।"

বন্ধুরা, হযরত সুলাইমান (আ.)-এর মর্যাদা ও ক্ষমতা সম্পর্কে কিছু কথা জানা হল। আজকের আসরে আমরা তাঁর জীবন থেকে নেয়া একটি গল্প শোনাব। গল্প শেষে থাকবে হযরত সুলাইমান (আ.)-এর স্মৃতি বিজড়িত মসজিদুল আকসা বা আল আকসা মসজিদ সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য। আর সবশেষে থাকবে কোলকাতার এক নতুন বন্ধুর সাক্ষাৎকার। অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। উপস্থাপনায় রয়েছেন গাজী আবদুর রশিদ ও আকতার জাহান।

মৃত্যু থেকে পালানোর বৃথা চেষ্টা

বহুদিন আগের কথা। একদিন দুপুরে হযরত সুলাইমান (আ.) তার শাহী দরবারে বসে আছেন। এমন সময় এক লোক হন্তদন্ত হয়ে সেখানে ছুটে এল। লোকটি আল্লাহর নবীকে দেখেই হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। হযরত সুলাইমান তার এরকম অবস্থা দেখে খানিকটা অবাক হয়ে গেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "কী হয়েছে তোমরা? এমন করছ কেন? কী চাও তুমি?"

লোকটি বহু কষ্টে নিজেকে সামনে নিয়ে বলল: "হে আল্লাহর নবী! হে মহান বাদশাহ!! আমাকে আজরাইলের হাত থেকে বাঁচান। আমি আজ আজরাইলকে দেখেছি। আমার দিকে ভীষণ ক্রোধের সঙ্গে তাকিয়ে ছিল। আমাকে ভয় দেখিয়ে পাশ কেটে চলে গেল। আমার ভয় হচ্ছে আজরাইল আবার ফিরে আসব এবং আমার জান কবজ করে নেবে।"

হযরত সুলাইমান নবী লোকটিকে অভয় দিয়ে বললেন, "এতে ভয়ের কী আছে! আজরাইল হচ্ছেন আল্লাহর মহান ফেরেশতা। তিনি কেবল আল্লাহর হুকুমেই জান কবজ করেন। আমি তো প্রায় প্রতিদিনই আজরাইলকে দেখি কিন্তু কই আমি তো ভয় পাই না। যাইহোক, এখন বলো, তোমার জন্য আমি কী করতে পারি, তুমিইবা কী চাও?"

লোকটি বলল: "আপনি ভয় না পেলে কী হবে, আমি আজরাইলকে ভীষণ ডরাই। কিন্তু আজ তার রাগ দেখে আরও ভয় করছে। তার কাছ থেকে আমি বাঁচতে চাই। লোকেরা বলে থাকে বায়ু সুলায়মান নবীর হুকুম পালন করে। এখন আপনি বায়ুকে হুকুম করুন আমাকে এ দেশ থেকে দূরে নিয়ে যাক। মানুষ একথাও বলে থাকে যে, সুলাইমান বাদশাহ মানুষের চাওয়া-পাওয়া পূরণ করে থাকেন। এখন আমার দাবি হল- বাতাসকে এক্ষুণি হুকুম দিন আমাকে হিন্দুস্তান নামক দেশে নিয়ে যাক। আমি চাই আজরাইল যেহেতু এদেশে আমার ঠিকানা জেনে গেছে সেহেতু এদেশে আর থাকব না। আপনি দয়া করে আমাকে হিন্দুস্তানে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।"

হযরত সুলাইমান (আ.) বেচারার কাকুতি-মিনতি ও কান্নাকাটি দেখে বললেন, "বেশ ভালো কথা। জীবন-মরণের ভার আমার হাতে নেই। তবে বায়ু আমার কথা শুনে থাকে। যাও তোমার দাবি আমি পূরণ করব। এক্ষুণি বায়ুকে বলছি তোমাকে হিন্দুস্তানে নিয়ে যাক।"

হুকুম পেয়ে বাতাস লোকটিকে হযরত সুলাইমানের গালিচায় বসিয়ে কয়েক মুহূর্তেই বনবাদাড়, মরু সাহারা, নদ-নদী ও সাগর-দরিয়া পার হয়ে হিন্দুস্তানের এক শহরে পৌঁছে দিল।

সেদিন পার হল। পরের দিন হযরত সুলাইমান তার দরবারে বসে আছেন। এমন সময় হযরত আজরাইল (আ.) সেখানে উপস্থিত হলেন। তাকে দেখেই সুলাইমান নবী জিজ্ঞেস করলেন, "হে আজরাইল! গতকাল এক লোক ভীত অবস্থায় আমার দরবারে এসেছিল এবং তোমার বিরুদ্ধে নালিশ করেছে। সে বলেছে, তুমি নাকি তার দিকে মারাত্মক ক্রোধের দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল! লোকটি আমার কাছে অনুরোধ জানাল আমি যেন বাতাসকে নির্দেশ দেন যাতে তাকে ওই মুহূর্তেই এই শহর থেকে হিন্দুস্তানে পৌঁছে দেয়। আমি তাকে হতাশ করতে চাইনি। বাতাসকে তার ইচ্ছেমতো হিন্দুস্তানে পৌঁছে দিতে হুকুম করলাম। এখন সে হয়ত হিন্দুস্তানেই আছে। কিন্তু আমি খুব তাজ্জব হয়েছি যে, আল্লাহর এত বড় একজন ফেরেশতা হয়ে তুমি কেন তাকে ভয় দেখালে। বেচারা তোমার ভয়েই আজ ঘরবাড়ি ও দেশছাড়া হল।"

হযরত সুলাইমানের কথা শুনে আজরাইল (আ.) বললেন, "আমি আল্লাহর হুকুম পালন ও তার আদেশ মানা ছাড়া আর কিছুই করি না। ওই লোকটির প্রতি আমি রাগ করে কিংবা ক্রোধের দৃষ্টিতে মোটেই তাকাইনি। সে ঠিকই বলেছে, আমি তাকে গতকাল এই বায়তুল মুকাদ্দাস শহরে দেখেছি। তার প্রতি আমি যে দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম তা আসলে বিস্ময়ের দৃষ্টি ছিল। কারণ আল্লাহর নির্দেশ ছিল গতকালই যেন হিন্দুস্তানে তার জান কবজ করি। তাই তাকে তার মৃত্যুর মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে বায়তুল মুকাদ্দাসে দেখে ভীষণ আশ্চর্য হয়ে যাই যে, কী করে সে এখন এই এলাকায় ঘোরাফেরা করছে! তাকে দেখে আমি মনে মনে ভাবলাম, তার যদি শত শত পাখাও গজায় তাহলেও সে আছরের আগে হিন্দুস্তান পৌঁছুতে পারবে না। যাইহোক, যেহেতু তখনো তার মরণের সময় উপস্থিত হয়নি সেহেতু খুব আশ্চর্য হয়েই তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম এবং পাশ কেটে হিন্দুস্তানে চলে গেছি। কিন্তু সময়মতো হিন্দুস্তানে পৌঁছেই দেখি সেখানে নির্ধারিত স্থানে হাজির! এরপর আর দেরি না করে তার জান কবজ করে নেই।"

সব শুনে হযরত সুলাইমান (আ.) বললেন, একদম ঠিক কথা। সব কিছু থেকে পালানো সম্ভব কিন্তু মৃত্যুর হাত থেকে পালানো সম্ভব নয়। তার সেই মুহূর্তে অবশ্যই হিন্দুস্তানে থাকা দরকার ছিল। কিন্তু বায়ু ছাড়া তাকে সেই মুহূর্তে সেখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। সে নিজেই নিজ ইচ্ছায় আমার কাছে ছুটে এল এবং নিজের মুখেই কাকুতি-মিনতি করে নিশ্চিত পরিণতির দিকে ছুটে গেল।

বন্ধুরা, এ ঘটনাটি থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, মৃত্যু থেকে পালানো সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন, 'কুল্লু নাফসিন জায়িকাতুল মাউত অর্থাৎ 'প্রত্যেক প্রাণিকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে।' (সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ১৮৫) 

মহান আল্লাহ আরও বলেছেন, "তোমরা যেখানেই থাক না কেন; মৃত্যু কিন্তু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই। যদি তোমরা সুদৃঢ় দূর্গের ভেতরেও অবস্থান কর, তবুও।" (সূরা নিসা, আয়াত নং ৭৮) 

আল আকসা মসজিদ সম্পর্কে কিছু তথ্য

বন্ধুরা, মৃত্যু যেহেতু অনিবার্য তাই আমরা সবাই মৃত্যুর যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর নির্দেশগুলো আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করব-কেমন? তো অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে আমরা আল আকসা মসজিদ সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরব

আল আকসা হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম মসজিদ। মুসলমানদের প্রথম কেবলা হিসেবে পরিচিত এ মসজিদটি পূর্ব জেরুজালেমে বা বায়তুল মোকাদ্দাসে অবস্থিত। বর্তমানে ইহুদিবাদী ইসরাইল এ ঐতিহাসিক মসজিদটি দখল করে রেখেছে। ১৯৬৯ সালে তারা একবার আল আকসা মসজিদে অগ্নিসংযোগও করেছিল।

আল আকসা মসজিদের অর্থ হচ্ছে ‘দূরবর্তী মসজিদ’। এ পবিত্র মসজিদ থেকেই রাসূল (সা.) উর্ধাকাশে তথা মেরাজ গমন করেছিলেন। মহান আল্লাহ এ সম্পর্কে বলেছেন, "সকল মহীমা তাঁর যিনি তাঁর বান্দাকে এক রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছিলেন,যার চতুর্পার্শ্বকে আমি বরকতময় করেছি। (আর এই ভ্রমণ করানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে) যাতে আমি আমার নিদর্শন তাকে প্রদর্শন করি।" (সুরা বনী ইসরাইল: আয়াত ১)

হযরত ইবরাহিম (আ) কর্তৃক কাবা গৃহ নির্মাণের ৪০ বছর পর হযরত ইয়াকুব (আ.) আল আকসা মসজিদ নির্মাণ করেন। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ১০০৪ সালে হযরত সুলাইমান (আ.) এই মসজিদটির পূণর্নির্মাণ করেন। ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে সমগ্র বায়তুল মোকাদ্দাস এলাকা মুসলমানদের দখলে আসার পর  মুসলমান শাসকরা  কয়েকবার এ মসজিদের সংস্কার করেন। কিন্তু ১০৯৬ সালে খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা ফিলিস্তিন দখল করে নেয়ার পর আল আকসা মসজিদের ব্যাপক পরিবর্তন করে একে গীর্জায় পরিণত করে। তারা মসজিদের গম্বুজের উপরে ক্রুশ স্থাপন করে এর নাম রাখে 'সুলাইমানি উপাসনালয়'। এরপর ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম সেনাপতি গাজী সালাহউদ্দিন আইয়ুবী জেরুজালেম অধিকার করার পর পূর্বের নকশা অনুযায়ী আল আকসা মসজিদের পুণর্নির্মাণ করেন। ঐতিহাসিক এ মসজিদটির আয়তন সাড়ে তিন হাজার বর্গমিটার। আর এ মসজিদে পাঁচ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারেন। #

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১২